যশোরবাসীর প্রাণের দাবি ভৈরবপাড়ের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান শুরু

এবিসি বাংলা ডেস্কএবিসি বাংলা ডেস্ক
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  12:55 PM, 28 March 2019

সুনীল ঘোষ: বহু জল্পনা কল্পনার পর যশোরে ভৈরবপাড়ের শহর অংশের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়েছে। আজ ২৮ মার্চ বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে স্কেভেটর ও বুলডোজার দড়াটানা ব্রিজের দক্ষিণ-উত্তর অংশ থেকে গরীব শাহ দরগাহ পর্যন্ত পুস্তক ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গুড়িয়ে দেয়ার কাজ শুরু করে। গতকালই তাদের বিদ্যুৎ সংযোগ বিছিন্ন করে দেয়া হয়। কার্যত তখন থেকেই এসব অবৈধ স্থাপনা থেকে মালামাল সরিয়ে নেয়ার কাজ শুরু করে ভৈরবের বুকে চেপে বসা অবৈধ স্থাপনার মালিকরা।পড়ুন>>>বহু কাঠখড় পুড়িয়েও পার পাচ্ছেন না যশোরে ভৈরবপাড়ের দখলবাজরা

সকালে ভৈরব চত্বরে কয়েকটি স্কেভেটর, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি, এম্বুলেন্স ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের গাড়ি অবস্থান নেয়। এ সময় অবৈধ স্থাপনার মালিক-কর্মচারীদের দোকান খুলে মালামাল সরাতে দেখা যায়। মুহুর্তের মধ্যে উৎসুক জনতার ভীঁড় জমে ওঠে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ মুজিব সড়ক ও গাড়ীখানা রোডে জনসাধারণের চলাচল বন্ধ করে দেয়।

কিছু সময়ের মধ্যে ভাংচুর ও গুড়িয়ে দিতে বুলডোজার ও কয়েকটি স্কেভেটর কাজ শুরু করে। বেলা ১১টার ভেতর অধিকাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মাটিতে মিশিয়ে দেয়া হয়। এ সময় গরীব শাহ দরগাহ’র পশ্চিমাংশের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে উৎকন্ঠা নেমে আসে।

ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট সেখানে গিয়ে অনেকের কাগজপত্র দেখতে চান। এ সময় দৈনিক ভোরের ডাক পত্রিকার সিনিয়র সাংবাদিক গোলাম মোর্তজা মনিসহ আরও অনেকে দলিলপত্র দেখান।তবে এসব কাগজপত্র দেখে নিশ্চিত হতে পারেননি ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট। তিনি ২৭ সালের কাগজপত্র যাচাই বাছাই করে পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত জানাবেন বলে উৎকণ্ঠিত বাড়ি মালিক ও ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করেন।

এদিকে ২৭ মার্চ প্রশাসনের চূড়ান্ত তৎপরতা দেখে সকালে যশোর পুস্তক ব্যবসায়ী সমিতি ও গরীব শাহ ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা প্রেসক্লাব যশোরে সংবাদ সম্মেলন করে এসব স্থাপনা বৈধ দাবি করে পুন:বিবেচনার দাবি করেন। একই সাথে এসব স্থাপনা উচ্ছেদ না করার দাবিতে তারা প্রেসক্লাব যশোরের সামনে ও শহরের দড়াটানা মানববন্ধন করেন।

জানা যায়, যশোর জেলা প্রশাসকের দপ্তর দড়াটানা ভৈরব চত্বর থেকে শুরু করে গরীব শাহ সড়কের পাশের জমি এসব ব্যবসায়ীদের কাছে ইজারা দেয়া হয়। ইজারা গ্রহিতারা সড়কের পাশে ভৈরবের জায়গা দখলে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করে আসছিলেন। একই সাথে আন্ডারগ্রান্ড ফ্লোরে অনেকে বসবাস করছিলেন।

এনিয়ে যশোরবাসীর মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছিল। বিভিন্ন সময় এসব ইজারা বাতিল করে ভৈরব নদকে রক্ষার দাবি ছিল সচেতন মহলের।

যশোরবাসীর এই প্রাণের দাবি বাস্তবায়নে স্থানীয় প্রশাসনও নড়েচড়ে বসেন। ভৈরব নদকে পুনরুজ্জীবনের উদ্দেশ্যে দোকান সরিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়ি একাধিকবার। ঢাক ঢোল পিটিয়ে উচ্ছেদ অভিযানের প্রস্তুতিও নেয়া হয়। কিন্তু প্রত্যেকবারই এসব অবৈধ স্থাপনার মালিকরা উচ্চ আদালতে রীট করে সেসব উদ্যোগ ভুন্ডুল করে দেন।

তবে উচ্ছেদ অভিযান ব্যর্থ হলেও প্রশাসন ২০০৫ সালের পর থেকে ইজারা গ্রহিতাদের নতুন করে বরাদ্দ নবায়ন করেনি।

তবে এবার অবৈধ এসব স্থাপনার মালিকরা উচ্ছেদ অভিযানে বাধা হয়ে টিকে থাকতে পারেনি।

যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যশোরে এসে ভৈরব খনন কাজ উদ্বোধন করার পর অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে স্থানীয় প্রশাসন তৎপরতা শুরু করে। ওই বছরের ২৮ জানুয়ারি স্থাপনা সরিয়ে নিতে ২৯৬ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ দেয় জেলা প্রশাসন। যার মধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন ভৈরবগর্ভে রয়েছে ৮৬টি প্রতিষ্ঠান। তবে নোটিশের পরপরই অবৈধ সম্পদ রক্ষায় দৌড়-ঝাপ শুরু হয়। তারই অংশ হিসেবে সংঘবন্ধভাবে তারা উচ্চ আদালতে যান।

যশোর জেলা প্রশাসন দপ্তর সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুত ভৈরব নদ খননে একনেকে অর্থ বরাদ্দ হওয়ার পর অবৈধ দখলদারদের চিহ্নিতকরণের কাজ শুরু হয়। ভৈরব নদের সীমানা নির্ধারণের সময় পানি উন্নয়ন বোর্ড অবৈধ স্থাপনার একটি তালিকা তৈরি করে। এছাড়া নদের দুই ধারে যশোর জেলা প্রশাসন এবং সড়ক ও জনপদ বিভাগের জমিতে গড়ে তোলা অবৈধ স্থাপনার তালিকা তৈরি করে প্রশাসন। সবমিলে ভৈরবগর্ভে ও তার পাড়ে সরকারি জমিতে গড়ে তোলা ২৯৬টি অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করে ২০১৮ সালের ২৮ জানুয়ারি উচ্ছেদের চূড়ান্ত নোটিশ দেয়া হয়। নোটিশে এক সপ্তাহের মধ্যে সব অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নিতে বলা হয়। নোটিশ পাওয়ার পর দিনই বেশ কয়েকজন নিজেদের বৈধ মালিক দাবি করে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করেন। পরে তারা উচ্ছেদ বন্ধে উচ্চ আদালতে যান। ফলে থমকে যায় যশোর অঞ্চলের মানুষের প্রাণের দাবি ভৈরব পাড়ের অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ অভিযান।

এনিয়ে গত কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন মহলে যেমন নানা জল্পনা কল্পনা শুরু হয়,তেমনি গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমগুলোতে উচ্ছেদের পক্ষে প্রচুর লেখালেখি হয়। অনেকেই দাবি করেন, ভৈরব নদকে বাঁচাতে ২৭ সালের রেকর্ড কার্যকর রেখে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করতে হবে। তাদের দাবি, ৬২ সালের রেকর্ডের সময় অনেকে সুকৌশলে প্রশাসনের অসাধু চক্রের মাধ্যমে নদীর জমি ব্যক্তি নামে রেকর্ড করে নিয়েছেন। অনেক জায়গার হাত বদল হয়েছে কয়েক দফা।

নদী রক্ষার আন্দোলনে সম্পৃক্ত অনেকেই দাবি করেন, ভৈরব কোন খাল না।৬২ সালের রেকর্ডে নয়-ছয় করে নদীর জমি ব্যক্তি নামে করে নদীর বুকে চেপে বসে আছে প্রভাবশালী অনেকে। ভৈরব নদের উৎপত্তিস্থল ভারত থেকে। প্রকৃত ম্যাপ দেখলে এসব অভিযোগের সত্যতা মিলবে।

বিভিন্ন সময়ে এসব দাবি নিয়ে মিছিল মিটিং সভা সমাবেশ ও লেখালেখির এক পর্যায়ে খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নদীকে পুনজীবীত করতে নির্দেশনা দেন। তিনি ভৈরব খনন কাজের উদ্বোধন ও একনেকে অর্থ বরাদ্দ দিয়েছেন।

যার ফলশ্রুতিতে স্থানীয় প্রশাসন নিয়মতান্ত্রিক পথে এগুয়েছেন। সূত্রমতে, ২০১০ সালের ২৭ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস উদ্বোধন করতে এসে ভৈরব নদ খননের প্রতিশ্রুতি দেন। পরের বছর ১৯ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ভৈরব নদ খননের জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়া হয়। সেই চিঠির পর ভৈরব নদ খননে সমীক্ষার কাজ শুরু হয়। পরে ভৈরব নদের রিভার বেসিন এলাকার পানিবদ্ধতা দূরীকরণ ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ভৈরব নদের এই প্রকল্পটি গ্রহণ করে। এজন্য একনেকে ২৭২ কোটি ৮১ লাখ ৫৪ হাজার টাকা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এরপর তিনটি দরপত্রের মাধ্যমে খনন কাজের দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয়। ইতিমধ্যে ভৈরব খননের কাজ বেশ এগিয়ে গেছে। কিন্তু শহর অংশের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে না পারার কারণে খনন কাজ নিয়ে জঠিলতা তৈরি হয়।

আজ সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটলো অর্ধশতাধিক অবৈধ স্থাপনা গুড়িয়ে দেয়ার মধ্যদিয়ে। বুধবারই বিদ্যৎ সংযোগ বিছিন্ন করা হয়। আজ বৃহস্পতিবার গুড়িয়ে দেয়ার কাজ শুরু করে।

এ সময় প্রশাসনকে মাইকিং করে পথচারী ও উৎসুক জনতাকে বিকল্প সড়ক দিয়ে চলাচল করতে অনুরোধ করা হয়।

খুলনা বিভাগ

আপনার মতামত লিখুন :