গোপালগঞ্জের রুপকার সেন্ট মথুরনাথ বসুর ১২০ তম মহাপ্রয়াণ দিবস আজ

RanaRana
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  04:36 PM, 02 September 2021

 

জেমস আব্দুর রহিম রানা : 

আজ ২রা সেপ্টেম্বর। গোপালগঞ্জের অন্যতম রূপকার মথুরানাথ বসুর ১২০ তম মহাপ্রয়াণ দিবস।
মথুরানাথ বসু ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দের ৫ই ডিসেম্বর বৃহত্তর  যশোর জেলার ( বর্তমানে ঝিনাইদহের ) কোটচাঁদপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সদানন্দ বসু এবং তাঁর মাতার নাম সুলোচনা দেবী। কৃষ্ণের লীলাভূমি মথুরার নামানুসারে তাঁর নাম রাখা হয় মথুরানাথ।
চার বছর বয়স থেকেই তিনি গৃহ শিক্ষকের কাছে বিদ্যাভাস শুরু করেন। পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত গৃহ শিক্ষকের কাছে পড়াশুনা সমাপ্ত করে ষষ্ঠ শ্রেণীতে যশোর জিলা স্কুলে ভর্তি হন। ১৮৫৭ সালে তিনি যশোর জিলা স্কুল থেকে এন্ট্রাস পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করে স্বর্ণপদক লাভ করেন। ১৮৫৭ সালে তিনি কলকাতার ডাফ কলেজে ভর্তি হন এবং এখান থেকেই তিনি আই.এ পাস করেন। আই.এ পরীক্ষায় তিনি প্রথম বিশ জনের মধ্যে চতুর্থ হন এবং ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে স্বর্ণপদক লাভ করেন। মথুরানাথ ১৮৬০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং এখান থেকেই তিনি প্রথম বিভাগে বি.এ পাশ করে স্বর্ণপদক লাভ করেন।
মথুরানাথ বসু ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় ব্যাচের ছাত্র। তৎকালীন সময়ে তিনি ছিলেন উচ্চ শিক্ষিত বাঙালিদের একজন।
পরবর্তীকালে তিনি আইন কলেজে ভর্তি হন এবং ১৮৬২ সালে বিএ.এল.এল.বি পাশ করেন।
মথুরানাথ ৪ বছর আইন ব্যবসা করেন। পরে আইন ব্যবসা ছেড়ে কিছুদিন সরকারী চাকুরী করেন। সরকারী চাকুরী ছেড়ে দিয়ে তিনি ব্যবসা শুরু করেন, এখানে তিনি সফল হলেও পরবর্তীতে তিনি ব্যবসা ছেড়ে দেন। ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে তিনি ৯ বছর ভবানীপুরে শিক্ষকতা করেন।
ডাফ কলেজে পড়াকালীন সময়ে তিনি খ্রিস্টধর্মের সংস্পর্শে আসেন এবং ১৮৬৫ সালে তিনি স্বধর্ম ত্যাগ করে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন।
মথুরানাথ বসু ১৮৭৪ সালে তিনি ফরিদপুর জেলা ম্যাজিস্টেট মিঃ ওয়েলেসের আমন্ত্রণে মিশনারী হিসাবে তৎকালীন রাজগঞ্জ বর্তমানে গোপালগঞ্জে আসেন। তৎকালীন রাজগঞ্জ ছিল সম্পূর্ণ একটি জলাভূমি। মধুমতী তীরের ছোট্ট একটি হাট ছিল রাজগঞ্জ হাট।
নিরক্ষরতার অন্ধকারে ডুবে ছিল এ অঞ্চল। কথিত আছে তৎকালীন সময়ে দশ গ্রাম ঘুরেও একটি কলম খুঁজে পাওয়া যায় নি। গোপালগঞ্জে এসেই তিনি প্রথমে এ অঞ্চলের নিরক্ষরতা দূর করতে একটি স্কুল নির্মান করেন। পাঁচটি ছেলে ও দুটি মেয়ে নিয়ে তিনি শুরু করেন তাঁর মিশন স্কুল। এই স্কুল ছিল অবৈতনিক, এখান থেকে বিনামূল্যে বই পেতো ছাত্র-ছাত্রীরা। পরবর্তীকালে তিনি এই স্কুলকে হাই স্কুলে উন্নীত করেন। মৃত্যুর পূর্বে তাঁর স্কুলের ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ছিলো প্রথম শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত এক হাজারেরও বেশী। পরবর্তীতে মথুরানাথ ইন্সিটিউট মিশন স্কুল নামে হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এই প্রতিষ্ঠানেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন।
এছাড়া মথুরানাথ বসু বিভিন্ন গ্রামে পাঠশালা স্কুল স্থাপন করেন। বেঙ্গল মিশন সোসাইটির অধীন তিনি স্কুল, চিকিৎসা, ধর্ম প্রচারমূলক কাজ করতেন। তাঁর একক প্রচেষ্ঠায় গোপালগঞ্জে কোর্ট স্থাপিত হয় এবং আনাবারি ম্যাজিস্টেট তাঁকে করা হয়। বৃটিশ সরকারের কাছে লেখালেখি করে এই অঞ্চলে পুলিশি নির্যাতন বন্ধ করেন। তিনি এ অঞ্চলে কৃষি ব্যাংক ও পোস্ট অফিস স্থাপন করেন।
এছাড়া তিনি ছিলেন অধ্যাত্মিক গুণসম্পন্ন মানুষ। তাঁর অধ্যাত্মিক প্রার্থনার ফলে মধুমতি নদীর ভাঙন বন্ধ হয়। এছাড়াও তিনি বহুবিধ আধ্যাত্মিক কার্য সম্পন্ন করেছিলেন। ১৮৮৭-৮৮ খ্রিস্টাব্দে স্কটল্যান্ড থেকে ‘সেইন্ট’ উপাধি লাভ করেন।
তিনি দারিদ্র পীড়িত মানুষদের সেবায় নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। গোপালগঞ্জের মানুষকে তিনি প্রাণ দিয়ে ভালবাসতেন। সুদীর্ঘ ২৭ বছর তিনি গোপালগঞ্জে বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজ করেছিলেন।

এই মহানপুরুষ ১৯০১ সালের ২রা সেপ্টেম্বর ৫৮ বছর বয়সে পরলোকে গমন করেন।

অন্যান্য

আপনার মতামত লিখুন :