ভারতীয় আদানি কোম্পানী মিয়ানমার সেনাদের সঙ্গে ব্যবসা করছে

28

মিয়ানমারে বিদেশি বিনিয়োগে বিপুল অবকাঠামো নির্মাণের কাজ চলছে ৷ মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর মালিকানাধীন একাধিক সংস্থা জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনের রিপোর্টে অভিযুক্ত হওয়ার পরও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও ভারতীয় কোম্পানী তাদের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

মিয়ানমারের ওপর চীনের প্রভাব ঠেকানোর পরিকল্পনা থেকেই সাবমেরিন দেওয়াসহ প্রতিরক্ষা খাতে সম্পর্ক জোরদারে নজর দিয়েছে ভারত।

ভারতের সঙ্গে মিয়ানমারের ১ হাজার ৬৪০ কিলোমিটার স্থলসীমান্ত রয়েছে। নাগাল্যান্ড ও মণিপুর সীমান্তে কয়েকটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী মিয়ানমারকে আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। ভারতের এনএসসিএন, উলফা, এনডিএফবির সদস্য ও মিয়ানমারের আরাকান আর্মি, কাচিনের স্বাধীনতাকামীদের দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী একসঙ্গে কাজ করছে, অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে।

ভারত সমুদ্রপথে মিজোরাম ও উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলোতে পণ্য পৌঁছানোর জন্য কালাদান মাল্টিমোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্টে মিয়ানমারের সহযোগিতা চেয়েছে। এটি ভারতের কলকাতা বন্দরকে মিয়ানমারের রাখাইন (আরাকান) রাজ্যের সিটওয়ে (আকিয়াব) বন্দরের সঙ্গে সংযুক্ত করবে।

কালাদান মাল্টিমোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্টের আওতায় মিয়ানমারের সহযোগিতায় রেল যোগাযোগ, সিটওয়ে বিশেষ শিল্পাঞ্চল, সিটওয়ে-গয়া গ্যাস পাইপলাইন, চুং জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড ত্রিদেশীয় সড়ক পরিবহন ছাড়াও ইন্ডিয়া-মিয়ানমার-জোকাথার-রি হাইওয়ে, প্লাটওয়া-চিক্কা-ইন্ডিয়া হাইওয়ে প্রজেক্ট, আইজল-থুইপাং ন্যাশনাল হাইওয়ে প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করবে ভারত।

এদিকে, মিয়ানমারে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করে চীন। পরিসংখ্যান বলছে, গত ৩০ বছরে মিয়ানমারে চীনের বিনিয়োগের পরিমাণ ১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ভারতের বিনিয়োগ এখন পর্যন্ত ততটা বেশি না।

এর আগে, চীন কিউক ফুতে একটি বন্দর তৈরির প্রকল্পে ভারতের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রকল্পটি নিজেদের করে নেয় । ওই বন্দর থেকে পণ্যগুলো মিয়ানমারের উত্তর দিকে চীনের কুনমিং প্রদেশে পাঠানো হয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে সীমান্ত অঞ্চলে মিয়ানমারের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলতে এখন বিশেষ মনোযোগী ভারত। এই অঞ্চলে আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে দুই দেশই সমান তালে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে ৷

অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গবেষক তোয়ে তোয়ে থেইন বিবিসিকে জানিয়েছেন, এই কোম্পানিগুলো নৈতিকতার সঙ্গে আপস করেই মিয়ানমারে ব্যবসা চালাচ্ছে এবং এদের মধ্যে ভারতের আদানি শিল্পগোষ্ঠী বা ইনফোসিসের মতো টেক সংস্থাও রয়েছে।

২০১৭ সালে মিয়ানমারে রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে যে সামরিক অভিযান চালানো হয়েছিল, তার জন্য আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলাও চলছে, কিন্তু তার পরও সে দেশের ফৌজি সংস্থাগুলোকে বাণিজ্যিক বয়কটের মুখে পড়তে হচ্ছে না বলেই তাঁর পর্যবেক্ষণ।

বস্তুত চীন বা ভারতের মতো দেশগুলোর প্রভূত পরিমাণে বাণিজ্যিক স্বার্থ আছে বলেই রোহিঙ্গা গণহত্যার প্রশ্নে তারা সেভাবে মিয়ানমারের সমালোচনা করে না – এই অভিযোগ গত কয়েক বছরে বারে বারেই উঠেছে ৷

পার্থ থেকে টেলিফোনে তিনি বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, “জাতিসংঘের প্রতিবেদনে এই প্রথমবারের মতো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কোম্পানির সমালোচনা করা হয়েছে – যারা মিয়ানমারের সেনার সঙ্গে অংশীদারিত্বে সে দেশে ব্যবসা চালাচ্ছে।”

“মিয়ানমার আর্মির অধীন দুটি সংস্থা, মিয়ানমার ইকোনমিক কর্পোরেশন (এমইসি) ও মিয়ানমার ইকোনমিক হোল্ডিং লিমিটেডের (এমইএইচএল) ব্যবসার মুনাফা যে সরাসরি সেনা অভিযানে ব্যবহার করা হয়েছে, জাতিসংঘ তারও প্রমাণ পেয়েছে।”

“সে কারণেই জাতিসংঘ এই সংস্থাগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে এই কোম্পানিগুলোকে আহ্বান জানিয়েছে।”

জাতিসংঘের যে মিশন এই রিপোর্ট দিয়েছে, তার সদস্য ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক মানবাধিকার কমিশনার ক্রিস সিডোটি, ইন্দোনেশিয়ার সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মার্জুকি দারুসমান ও শ্রীলঙ্কার মানবাধিকার আইনজীবী রাধিকা কুমারাস্বামী।

অধ্যাপক থেইন মনে করছেন, এইচএসবিসি বা স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের মতো ব্যাঙ্কিং জায়ান্টরা কিংবা ভারতের আদানি পোর্টস এই মিশনের মতামতকে মিয়ানমারে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করার নীতি নিয়েছে।

তার কথায়, “মিয়ানমারে যাদের সঙ্গে ব্যবসা করবেন, তাদের ব্যাপারে ভাল করে খোঁজ নেওয়া বা ‘ডিউডিলিজেন্স’ খুব জরুরি।”

“আমি এটা মানি মিয়ানমারের ফৌজি কোম্পানিগুলোর বন্দর, রিয়েল এস্টেট, মাইনিং, অবকাঠামো ইত্যাদি বিভিন্ন খাতে যেমন মনোপলি বা একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ আছে কিংবা যে বিপুল জমির মালিকানা আছে তাতে তাদের বাদ দিয়ে ব্যবসাপাতি করা খুব মুশকিল – কিন্তু একেবারে অসম্ভব নয়।”

“কিন্তু যাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ আছে, তাদের সঙ্গে সরাসরি ব্যবসায় জড়িয়ে এই কোম্পানিগুলো নৈতিকতার সঙ্গে বিরাট আপস করছে বলেই মনে করি”, বলছিলেন অধ্যাপক থেইন।

তোয়ে তোয়ে থেইন অবশ্য এটাও স্পষ্ট করে দিতে চান, তিনি কখনওই মিয়ানমারে আন্তর্জাতিক লগ্নির বিরোধী নন।  বরং তিনি চান মিয়ানমারে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো আরও বেশি করে আসুক – কিন্তু তারা যেন ‘হাতে রক্তের দাগ লাগা’ সেনাবাহিনীর সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কে না জড়ায়।

জাতিসংঘ মিশনের সদস্য রাধিকা কুমারাস্বামী

দিল্লিতে জাতিসংঘ মিশনের সদস্য রাধিকা কুমারাস্বামী, জেনেভাতে তাদের রিপোর্ট পেশ করেন  ৷ তিনি বিবিসিকে বলছিলেন, “সে দেশের আর্থসামাজিক কাঠামোতে ‘তাতমাদও’ বা সামরিক বাহিনীর একটা প্রগাঢ় প্রভাব রয়েছে, এবং তাদের উপেক্ষা করে ব্যবসা করা খুব কঠিন – এরকম একটা চিত্রই কিন্তু আমরা পাই।”

“এখানে এথিকস বা নৈতিকতা এবং ব্যবসায়িক স্বার্থ – দুটো যে যার মতো আলাদা পথে চলে বলেই আমার পর্যবেক্ষণ! কোম্পানিগুলো এথিকসকে একভাবে দেখে, আর বিজনেসকে দেখে অন্য চোখে।”

চীনের প্রাধান্যই সেখানে বেশি ভারতের চেয়ে। আর একটা কথা হল, মিয়ানমার কিন্তু নিজেদের প্রধানত পূর্ব মিয়ানমারে নৈতিকতার সঙ্গে আপসের প্রশ্নে আদানি গোষ্ঠীর জবাব কী, সে প্রসঙ্গে তাদের কাছে ইমেইল পাঠানো হলেও এখনও জবাব মেলেনি , তবে ভারতীয় কোম্পানীর ব্যবসার স্বার্থ আছে সেটা স্পষ্ট ৷

গত মাসেই আদানি পোর্টস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইয়াঙ্গনে তারা যে অ্যাহলোন বন্দর টার্মিনাল বানাচ্ছে সেটা স্থানীয় অর্থনীতির উন্নয়ন ঘটাবে, অন্তত এগারোশো স্থানীয় বাসিন্দা সেখানে চাকরি পাবেন।