২৫ মার্চ ১৯৭১’র ‘কালোরাতকে’ কেন ভুলে গেলো মুসলমানরা?

এবিসি বাংলা ডেস্কএবিসি বাংলা ডেস্ক
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  03:15 PM, 25 March 2019

উত্তর ইরাকের সিনজার শহরে যখন আইএস ইসলামিক জঙ্গিরা ঢুকে পড়ে তখন সেখানকার খ্রিস্টান ও ইয়াজিদি সম্প্রদায় পালাতে গিয়ে আইএস জঙ্গিদের হাতে ৫০০ জন মারা যায়। ৩০০ জন ইয়াজিদি ও খ্রিস্টান নারীদের আইএস জঙ্গিরা গণিমতের মাল হিসেবে তাদের আওতায় নিয়ে নেয়। ২০১৪ সালের আগস্ট মাসের ঘটনা এটি। আমার মনে পড়ে না বিশ্বের কোথাও একদিনে এতবড় গণহত্যার পর চারদিকে শুনশান নিরবতা থেকেছে। রোহিঙ্গাদের উপর বার্মিজ সেনাবাহিনীর আক্রমন কিংবা সম্প্রতি নিউজিল্যান্ডে ঘটা মসজিদে হামলার ঘটনায় যে পরিমাণ শো-ডাউন হয়েছে তার ছিটেফোটা আইএস, বোকো হারাম, তালেবানদের হাতে অমুসলিম জনগোষ্ঠির উপর চালানো গণহত্যা নিয়ে হয় না। তালেবানরা পাকিস্তানের একটি শিশুদের স্কুলে হামলা চালিয়ে ১০০ জন শিশু হত্যা করেছিলো। এই সেদিন লস্কর-ই তৈয়বা কাস্মিরে একটি শিশুকে মানবঢাল বানিয়ে তাকে হত্যা করল- কোথাও কোন সাড়া শব্দ নেই। আপনি যদি এই মুহূর্তে গুগলে সার্চ দেন তাহলে শত শত লিংক পাবেন যেখানে মুসলিমদের উপর খ্রিস্টান ইহুদী হিন্দুদের নির্যাতনমূলক নিউজ আর আর্টিকেল। দেশের তথাকথিত প্রগতিশীল কাগজঅলাদের মুখেও কেবলই মুসলিম নির্যাতনের হাহাকার। পশ্চিম আফ্রিকার মালিতে ১৩৪জন মুসলমানকে হত্যা করে মেরেছে মুসলিম বিদ্রোহী গ্রুপ। একদিনে এতগুলো মানুষ মারা গেলো কেউ শব্দ করল না। কারণ হত্যাগুলো মুসলমানরা করেছে মুসলমানদের উপর। মুসলমানদের হাতে যখন অমুসলিমরা গণহত্যার শিকার হয় তখনো চুপ করে থাকা নিয়ম। কুরআনের আয়াত আছে একজন মুসলমানের দায়িত্ব হচ্ছে অপর মুসলমান ভাইয়ের অপকর্ম গোপন রাখবে যাতে কাফেররা সমালোচনা করতে না পারে। যে কারণে মুসলিম বিশ্ব মুসলমানদের হাতে ঘটা গণহত্যা ধর্ষণের মত ঘটনাগুলোকে পরিকল্পিতভাবে গোপন রাখার চেষ্টা চালায়। ওআইসির মত সংগঠন মুসলমানরা বানিয়েছেই মুসলিম বিশ্বে ঘটনা অমানবিক মানবতাবিরোধী অপরাধগুলোকে প্রোটেকশন দিতে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে চালানো ২৫ মার্চ রাতে যে গণহত্যা চালিয়েছিলো পাকিস্তান সেনা বাহিনী সেই ইতিহাস ওআইসি ধামাচাপা দিয়ে রেখেছে। তাদের অধিবেশনে কখনই কি এই প্রসঙ্গ উঠেছিলো? আরব বিশ্ব কঠরভাবে পাকিস্তানের গণহত্যার বিরুদ্ধে তোড়জোড় করতে বাংলাদেশকে চাপ দিয়ে গেছে। দেড় হাজার কাদিয়ানীকে হত্যার মাস্টারমাইন্ড মওদুদির ফাঁসি রায় সৌদি আরবের হস্তক্ষেপে বাতিল হয়ে গিয়েছিলো। ১৮৯০ সালে তুর্কি সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ আর্মেনিয় খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের পরিণতি কি হতে পারে তার আগাম ঘোষণা দিয়েছিলেন এভাবে, “আমি খুব দ্রুত এই আর্মেনীয়দের একটা উচিত শিক্ষা দেবো। আমি তাদের কানে একটা বাকশো পরিয়ে দেব, যেটা তাদের বিপ্লবী চিন্তাভাবনার ইতি টেনে দেবে”। ইসলামিক খিলাফতের এই খলিফা সন্দেহ করতেন তার রাজ্যের এই খ্রিস্টানরা হয়ত পাশ্ববর্তী খ্রিস্টান রাজ্যগুলো কিংবা রাশিয়ার প্রতি বেশি আনুগত্য। এই সন্দেহবশে তুর্কি মুসলিম সেনাবাহিনী আর্মিনিয়দের গ্রামকে গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়ে, তাদের পুরুষদের হত্যা করে, তাদের নারীদের বন্দি করে হেরেম ভরে ফেলে। পথে পথে আর্মিনিয় খ্রিস্টানদের লাশ শেয়াল-কুকুরে খেতে থাকে। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্ক জার্মানির পক্ষ নিয়ে যুদ্ধ করতে সিদ্ধান্ত নেয়ার পাশাপাশি অটোমান সাম্রাজ্যের সকল ইসলামিক স্ককলাররা সিদ্ধান্ত নেয় তাদের যুদ্ধ-মিত্র বাদে সকল খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে তারা জিহাদ ঘোষণা দিবে। নিজ রাষ্ট্রে আর্মেনিয় খ্রিস্টানদের হুমকি মনে করত তারা। খ্রিস্টানদের প্রতি তারা অনুগত কিনা এই সন্দেহবশে ফের ১৯১৫ সালের এপ্রিল মাসে দ্বিতীয় দফা ভয়াবহ গণহত্যার শিকার হয় এই খ্রিস্টান সম্প্রদায়টি। মুসলমানদের হাতে তখন পর্যন্ত এটিই ছিলো সমসাময়িক কালের মধ্যে সবচেয়ে বড় গণহত্যা। ১৯২০ সাল পর্যন্ত চলা এই গণহত্যায় ১৫ লক্ষ আর্মিনিয় খ্রিস্টানকে হত্যা করেছিলো তুর্কি মুসলমানরা। আর্মিনিয় শিশুদের ধর্মান্তরিত করে মুসলিম বানিয়ে তুর্কি পরিবাগুলোর কাছে দিয়ে দেয়া হতো। আর হতভাগ্য আর্মিনিয় খ্রিস্টান নারীদের ঠাই হতো মুসলিম হেরেমগুলোতে। তুরস্কের এই গণহত্যা বিশ্বে কোথাও বড় করে আলোচনা করা হয়নি। আমেরিকার মিত্র হওয়ায় তুরস্কের এই গণহত্যা নিয়ে তারা উচ্চবাচ্য করেনি। যথারীতি মুসলিম বিশ্ব ও পরবর্তীতে গঠিত ওআইসি এই গণহত্যাকে আড়াল করতে যথাচেষ্টাই করেছে। তুরস্কের এরদোয়ান সরকার কয়েক বছর আগে আর্মিনিয় গণহত্যার জন্য ক্ষমা চাওয়ার প্রসঙ্গ উঠলে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে জবাব দিয়েছিলো, সেসময়ের পরিস্থিতিতে তুরস্ক কোন অন্যায় করেনি!

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে অপারেশ সার্চলাইন চালিয়ে ঘুমন্ত ঢাকাবাসীর উপর ঝাপিয়ে পড়েছিলো পাকিস্তান সেনাবাহিনী। পাকিস্তানীরা মূলত পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালী মুসলমানদের আধা হিন্দু মনে করত। এছাড়া দেশভাগের পর অবিশিষ্ট থেকে যাওয়া হিন্দু সম্প্রদায়কে পাকিস্তানে ভারতের চর হিসেবে ভাবত এবং পাকিস্তানের জন্য তাদের হুমকি মনে করত। মূলত আওয়ামী লীগের সমর্থক এবং হিন্দুদের দমন করতেই পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে লেলিয়ে দিয়েছিলো সেদিন পাকিস্তান সরকার। ঘুমন্ত ঢাকাবাসীর কে হিন্দু আর কে আওয়ামী লীগার সেটি দেখে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। তাই ২৫ মার্চের আক্রমন ছিলো নির্বিশেষে। বাংলাদেশ সরকার বহুদিন ধরে ২৫ মার্চকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতির চেষ্টা করছে। এটি বাংলাদেশ কোনদিনই সম্ভব হবে না। যতদিন পর্যন্ত ‘মুসলিম বিশ্ব’ বলতে সাম্প্রদায়িকভাবে বিশ্বকে মুসলমানরা বিভক্ত করে রাখবে ততদিন পর্যন্ত মুসলমানদের হাতে ঘটা সমস্ত আকামকুকামকে এই বিশ্ব রাখঢাক দিয়ে যাবেই। মুসলমান বলেই তো বাংলাদেশের মানুষ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের গণহত্যা ভুলে তাদের প্রতি আবেগ ভালোবাসা দেখাতে পারে। ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে আসলে আর্মিনিয় খ্রিস্টানদের ভাগ্যবরণ করেছিলো হিন্দুরা। তারাই বেশি শরণার্থী হয়েছিলো। তাদের নারীদেরই বেশি ধর্ষণ করা হয়েছিলো। কলেমা পড়ে মুসলিম পরিচয় দিলে পাকিস্তানীরা ছেড়ে দিতো। কিন্তু কাফেরদের প্রতি কোন ছাড় ছিলো না। পাকিস্তানীরা হিন্দু নারীদের গণিমতের মাল বলে ঘোষণা দিয়েছিলো। হিন্দু সম্পত্তি গণিমতের মাল হয়েছিলো। এরকম একটি গণহত্যাকে তাই বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমান ভুলে গেছে। তারা ভারতের কাঁটাতারে ঝুলে ধাকা ফালানী লাশকে আজো ভুলতে পারে না তাই সঙ্গ কারণেই। কিন্তু হাজার হাজার ধর্ষিতা নারী পাকিস্তানী সেনাদের ক্যাম্প থেকে যখন বেরিয়ে এসেছিলো মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে দেশ স্বাধীন হবার পর- সেই দৃশ্য, সেই ইতিহাস মুসলমানরা দ্রুত বিশ্ব থেকে গোপন করে গেছে কারণ একজন মুসলমান আরেক মুসলমানের অপকর্মকে ঢেকে রাখবে! ২৫ মার্চ তাই বাংলাদেশে কোন প্রভাবই ফেলে না। আজকের দিনে বহু বিয়ের অনুষ্ঠান হবে। বহু জমকালো পার্টি, এনগেঞ্জমেন্ট অনুষ্ঠান, সুন্নতে খাৎনা, হৈ হুল্লার সবই ঘটবে। কোন সভ্য জাতি এমনটা করতে পারে না। জাপানিরা কি হিরোশিমা ডেতে ব্যক্তিগত হৈ হুল্লা করতে পারে?

লেখক:Susupto Pathok

আন্তর্জাতিক

আপনার মতামত লিখুন :