হাকালুকি হাওরের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় সরকারী উদ্যোগ চায় হাওরবাসী

43
হাকালুকি হাওর

মাছ, জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ। বলতে গেলে হাকালুকির মূল্যবান সব সম্পদই লুট হচ্ছে। ম্লান হয়ে পড়ছে হাওরের সৌন্দর্য্য। ঐতিহ্য হারাচ্ছে দেশের অন্যতম পর্যটন স্পট। এর অন্যতম কারণ হাওরটি অরক্ষিত। তাই প্রতিনিয়তই লুটেরাদের থাবা। এসব অত্যাচরে উজাড় হচ্ছে ওখানকার জীববৈচিত্র্য। তবে টনক নড়ছে না সংশ্লিষ্ট কারো।
কাগজ-কলমে হাওরের রক্ষণাবেক্ষণ তৎপরতা দেখালেও প্রকৃতপক্ষে অনেকটাই অভিভাবক শূন্য এ হাওর।

মৃত্যুদশায় থাকা হাকালুকি নিয়ে স্থানীয়রাও চিন্তিত। তাদের কথায় উঠে আসে হাওরের সমস্যা ও সম্ভাবনার নানা কথা। বিল ইজারা থেকে শুরু করে মাছধরা। সব বিষয়ই নখ দর্পণে ছোট কর্তা থেকে বড় কর্তাদের। তাদের শুভদৃষ্টি নিয়েই যে যার মতো লুটেপুটে হজম করছে হাকালুকির সম্পদ। এমন অভিযোগ হাওরপাড়ের দরদি মানুষের। তারা বলছেন, বিলগুলো ইজারা দিতে কিংবা নিতে যে তৎপরতা তার সিকিভাগই যদি হাকালুকির উন্নয়নের জন্য হতো, তাহলে এমন বেহাল দশায় পড়তে হতো না দেশের মিঠাপানির মাছ, প্রাণী, উদ্ভিদ, নানা ধরনের কীটপতঙ্গ, জলজ-স্থলজ ক্ষুদ্র অণুজীবসহ সর্বোপরি বিলুপ্ত ও বিপন্ন প্রজাতির জীববৈচিত্র্যের এক সময়কার নির্ভরযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদের এই অভয়াশ্রম।

হাকালুকির ১ হাজার ২১২ প্রজাতির জীববৈচিত্র্যর অর্ধেকেরও বেশি দেখা মেলে না এখন আর। অতিথি ও দেশীয় পাখি নানা কৌশলে শিকারীচক্রের নিধনে হাওরজুড়ে পাখিদের আনাগোনা, খুনসুটি, ডুবসাঁতার, জলকেলী কিংবা খাবার সংগ্রহের ব্যস্ততা নেই আর আগের মতো। হাওর ও হাওর তীরের প্রাকৃতিক অভয়াশ্রমগুলোও ধ্বংস হচ্ছে।

বর্ষা মৌসুমে ভাসমান পানিতে হরিলুট চলে মা ও পোনা মাছের। নিষিদ্ধ জাল দিয়ে ইজাদার ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় এসব মাছ নিধন হলেও নানা অজুহাতে মৎস্য বিভাগ নির্বিকার। অথচ ওইসব মাছ স্থানীয় বাজারে দেদারছে বিক্রি হচ্ছে। বাজারগুলো থেকে যায় দেশের নানা প্রান্তে। কিন্তু খোঁজ পায় না স্থানীয় প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগ। এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।

ইজারাদাররা নিয়মবর্হিভূতভাবেই বিলের বাঁধ কেটে কৌশলে পানি সেচে মাছ ধরে। জেলেদের জালে ধরাপড়া ঝিনুক ও শামুকগুলো ডাঙায় স্তূপ করে ফেলে রাখার কারণে তা মরে যায়। হাওরের যে দু’চারটি বিল নামমাত্র অভয়াশ্রম হিসেবে আছে তাও লুটে নেয় প্রভাবশালীরা।

হাওরে সরকারি তরফে যে পোনা মাছ অবমুক্ত করা হয় সেখানেও সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশে চলে রমরমা বাণিজ্য। তারপরও বরাদ্দসহ নানা অজুহাতে পোনা মাছ সময়মতো অবমুক্ত হয় না। তাই মাছগুলি বড় হয়ে বংশ বিস্তারের আগেই পানি কমে যাওয়ায় ধরা পড়ে।

হাওরের কলুম, হিজল, বরুণ, আড়ং গাছসহ নানা প্রজাতির জলজ গাছ উজাড় হচ্ছে। নিশ্চিহ্ন হচ্ছে হাওরের ঝোপ-ঝাড় ও জঙ্গল। ফলে বাসস্থান হারাচ্ছে জলজ ও বনজ প্রাণী। এক সময় মূর্তার রাজত্য থাকলেও এখন পুরো নিশ্চিহ্ন। ক’বছর আগে প্রকল্প করে মূর্তা বাগান সৃজনের নামে হরিলুট হয় পুরো প্রকল্পের টাকা।

হাওরে হিজল, করছসহ অন্যান্য গাছ লাগানোর নামে চলে এনজিও সংস্থাগুলোর হরিলুট। হাওরে গড়ে উঠছে ঘরবাড়ি। ফলে আয়তন কমছে হাওরের। হাওরের সঙ্গে সংযুক্ত একাধিক নদী, খাল ও গাঙ ভরাট হয়ে যাচ্ছে। পর্যাপ্ত সেচ সুবিধা না থাকায় অনাবাদি থাকছে বোরোসহ মৌসুমী চাষাবাদ। এতে অল্প বৃষ্টিতেই বন্যা ও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। আর শুষ্ক মৌসুমে মরুভূমির রূপ ধারণ করছে।

বর্ষা কিংবা শুষ্ক মৌসুমে বিশাল এই হাওরটির রূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশ-বিদেশের প্রকৃতিপ্রেমিরা ছুটে আসেন। কিন্তু কয়েকটি জরাজীর্ণ ওয়াচ টাওয়ার ছাড়া নেই কোনো দির্কনির্দেশনা। নেই পরিচিতি সম্বলিত সাইনবোর্ড কিংবা পথনির্দেশক। এ কারণে ভ্রমণ পিপাসুরা প্রায়ই বিভ্রান্ত হচ্ছেন। অরক্ষিত হাওরের রূপ দর্শনে যে যার মতো করে অগোছালোভাবেই ঘুরে বেড়ান। অথচ সরকার উদ্যোগী হলে বছরান্তে শুধু পর্যটন খাত থেকে কয়েক কোটি টাকা রাজস্ব আয় করা সম্ভব হতো।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) মৌলভীবাজার জেলা সমন্বয়ক আ স ম ছালেহ সুহেল  বলেন, এটা সত্য দেশের সবচেয়ে বড় হাওরটি এখন অরক্ষিত। হাকালুকির জলজপ্রাণী, উদ্ভিদ, পরিবেশ, প্রতিবেশ ও দূর্লভ প্রজাতির নানা জীববৈচিত্র রক্ষায় সরকারের উচিত দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া ।