সুনামগঞ্জের শালায় হিন্দু বাড়িঘরে হেফাজত কর্মীদের হামলা লুটপাট

99

>>নরেন্দ্র মোদির আগম ঠেকাতে এই হামলা পরিকল্পিত-স্থানীয় সচেতন মহলের অভিমত
এবিসি ডেস্ক:
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাও. মামুনুল হককে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দেয়ার অভিযোগের জেরে সুনামগঞ্জের শাল্লায় তার অনুসারীরা একটি হিন্দু অধ্যুষিত গ্রামে হামলা ও লুটপাট চালিয়েছে। হেফাজত কর্মীদের তান্ডবে গোটা এলাকায় চরম ভীতিকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
বুধবার (১৭ মার্চ) সকালে এ ঘটনা ঘটে।
হামলার সময় মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়দানকারীদের ওপর বেশি চড়াও হয় হামলাকারী হেফাজতের সন্ত্রাসীরা। তারা দেশ ছাড়া করে ছাড়বে বলেও হুমকি দেয়।

আতঙ্কে গ্রাম ছেড়ে চলে গেছেন হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন। ঘটনাস্থলে পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, মুজিববর্ষের অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আসতে দেবে না-এমন হুংকার দিয়ে আসছে হেফাজত। কিন্তু শেষ তাকে ঠেকানোর কোনো উপায় না পেয়ে পরিকল্পিত ভাবে হিন্দু বাড়িঘরে হামলা লুটপাট চালানো হয়েছে। ভিডিও লিংক

এরআগে মসজিদ থেকে মাইকিং করে গ্রামবাসীকে হিন্দুপাড়ায় হামলায় অংশ নেয়ার আহবান জানানো হয়। 

পুলিশ ও এলাকাবাসী জানায়, গত ১৫ মার্চ দিরাইয়ে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে আসেন মামনুল হকসহ কেন্দ্রীয় হেফাজত নেতৃবৃন্দ। তিনি সমাবেশে নানান আপত্তিকর কথা বলেন। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে শাল্লা উপজেলার হবিবপুর ইউনিয়নের নোয়াগাও গ্রামের এক যুবক ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন। স্ট্যাটাসে বঙ্গবন্ধুর ভাঙস্কর্যবিরোধী নেতা মামুনুলের সমালোচনা করেন তিনি।

এ ঘটনাকে ধর্মীয় উস্কানি দেওয়ার অভিযোগ এনে ওই এলাকার হেফাজত নেতার অনুসারীরা রাতে বিক্ষোভ মিছিল করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ রাতেই ওই যুবককে আটক করে। বুধবার সকালে কাশিপুর, নাচনী, চণ্ডিপুরসহ কয়েকটি মুসলিম অধ্যুষিত গ্রামের হেফাজত নেতা মামুনুল হকের কয়েক হাজার অনুসারী দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র ও লাঠিসোটা নিয়ে নোয়াগাঁও গ্রামে অতর্কিত হামলা চালায়।

এদিকে হাজারো মানুষের আক্রমণে গ্রাম ছেড়ে পলায়ন করেন হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন। এই সুযোগে হেফাজত নেতার অনুসারীরা গ্রামে প্রবেশ করে তছনছ করে। লুটপাট করে বিভিন্ন বাড়িতে। এ ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। ভয়ে ও আতঙ্কে কথাও বলতে পারছে না হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন। হামলাকারীরা ভাঙচুর ও লুটপাটের পাশাপাশি মন্দির ও ভাঙচুর করেছে।

হামলার খবর জানালেও পুলিশ দেরিতে ঘটনাস্থলে আসে বলে অভিযোগ করেছেন গ্রামের লোকজন। তারা এ ঘটনায় নিরাপত্তাহীনতায় আছেন বলেও জানান।
অন্যদিকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষের দিনে হিন্দু সম্প্রদায়ের গ্রামে সংঘবদ্ধ হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সুধীজন। তারা এ ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে সাম্প্রদায়িক দুষ্কৃতিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন।

গ্রামের রন্টু দাস বলেন, আমার বাড়িতে হামলা চালানো হয়েছে। ঘরের সব কিছু লুটপাট করা হয়েছে। আমরা গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে এসেছি প্রাণ বাচাতে। আমাদের কি দোষ আমরা কি করেছি আমাদের উপর এমন অত্যাচার কেন, ঘরের মন্দির থেকে শুরু করে সব ভেঙেছে তারা।

হবিবপুর ইউপি চেয়ারম্যান ও নোয়াগাও গ্রামের বাসিন্দা বিবেকানন্দ মজুমদার বলেন, কয়েক হাজার মানুষ এসে হঠাৎ গ্রামে হামলা, লুটপাট চালায়। আমাদের অনেকের দেবতাঘরও ভাঙচুরও করেছে। লুট করেছে ঘরবাড়ি। এমন ঘটনা একাত্তরেও ঘটেনি বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, দিরাই উপজেলার নাচনী, চন্ডিপুর, সন্তোষপুর, সরমঙ্গল ও শাল্লা উপজেলার কালিমপুর গ্রামের লোকজনএই হামলা লুটপাটে অংশ নেয়।

দিরাই শাল্লার কৃষক আন্দোলনের নেতা অমরচান দাস বলেন, সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী আজ সকালে হিন্দু সম্প্রদায়ের গ্রাম নোয়াগাওয়ে কয়েক হাজার সশস্ত্র লোক নিয়ে হামলা ও লুটপাট চালিয়েছে। প্রাণে বাঁচতে গ্রামবাসী পালিয়ে গেছে। তিনি বলেন, অসাম্প্রদায়িক নেতা ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিনে এমন ঘটনায় আমরা হতবাক।

শাল্লা থানার ভাঙরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হক গ্রামে হামলার ঘটনা স্বীকার করে বলেন, খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে এসেছি। আমরা উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা করছি। তবে এ ঘটনায় কাউকে আটক করা হয়নি।

এদিকে সর্বশেষ খবরে জানা যায়, খবর পেয়ে শাল্লা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আল আমিন চৌধুরী, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আল মুক্তাদির হোসেন, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হক ঘটনাস্থলে যান। এরপর স্থানীয় লোকদের নিয়ে বৈঠক করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সবার সহযোগিতা চান।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আল মুক্তাদির হোসেন বলেন, উপজেলার কয়েকটি জায়গায় উত্তেজনা ছিল। প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, পুলিশ ও স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতায় সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করা গেছে। র‍্যাব-পুলিশ কাজ করছে। তিনি আশা করেন আর কোনো সমস্যা হবে না। নোয়াগাঁও গ্রামে লোকজনের কী কী ক্ষতি হয়েছে, সেটি প্রশাসন খতিয়ে দেখছে বলে তিনি জানান।

সূত্র:সিলেট টুডে,বিডিনিউজ,বিবিসি.কম