সীমান্ত দিয়ে যাচ্ছে স্বর্ণ আসছে মাদক

36

ভারত বাংলাদেশের সীমানায় কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে , প্রায়শ বিএএফের গুলিতে নিহত   হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ ৷ অথচ এই সীমান্ত দিয়েই   স্বর্ণ যাচ্ছে  আর বিিনিময়ে মাদক আসছে। স্বর্ণ পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে বাংলাদেশের ভূখণ্ড। বিনিময়ে অনেক ক্ষেত্রে নগদ অর্থের পরিবর্তে পাঠানো হচ্ছে মাদক। মাদকের বিনিময়ে স্বর্ণ যাচ্ছে পার্শ্ববর্তী দেশে।

শক্তিশালী কিছু সিন্ডিকেট জড়িত রয়েছে এই অপতৎপরতায়। অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় গত কয়েক মাসে সীমান্ত এলাকায় সব চেয়ে বেশি স্বর্ণের চালান ধরা পড়েছে। এ বিষয়ে বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা তৎপরতা। প্রায়ই জব্দ করা হচ্ছে স্বর্ণের চালান। জব্দ হচ্ছে মাদকও।

সূত্রমতে, বাংলাদেশ থেকে ভারতে স্বর্ণ পাচারের অন্যতম কারণ ভারতে স্বর্ণ আমদানি বৈধ হলেও দিতে হয় উচ্চ শুল্ক। ফলে শুল্ক ফাঁকি দিতে বাংলাদেশকে স্বর্ণ চোরাচালানের ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করছে আন্তর্জাতিক চক্র।

দুবাই, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া থেকে হয়ে স্বর্ণ বাংলাদেশ হয়ে পাচার হচ্ছে ভারতে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশ থেকে তা পাচার করা হচ্ছে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত দিয়ে পাচার করা স্বর্ণ ভারতের বিভিন্ন স্থানে যায়। এরমধ্যে কলকাতা স্বর্ণ হাব বউবাজার ও বুরাবাজারে যায় বলে গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানিয়েছে। সেখানে এই স্বর্ণ থেকে অলংকারে তৈরি করা হয়। এই অলংকার পরে তা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আবার পাচার হয়।

সূত্রমতে, ২০১৪ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত প্রায় চার লাখ কেজি স্বর্ণ দেশে আমদানি হয়েছে। এজন্য ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫০০ কোটি ডলার। বাংলাদেশে স্বর্ণ আমদানির নীতিমালা ২০১৯ সালের আগে সুস্পষ্ট না থাকায় মূলত অবৈধভাবে আমদানি হতো স্বর্ণ। যে কারণে স্বর্ণ আমদানির কোনো তথ্যও নেই সংশ্লিষ্ট কোনো সংস্থার কাছে। নীতিমালা হওয়ার পর গত বছরের জুলাইয়ে প্রথম বৈধভাবে স্বর্ণ আমদানি করা হয়।

প্রতিটি স্বর্ণের বার শুল্ককর দিয়ে আনা হলেও বাজারমূল্যের চেয়ে গড়ে ১০ হাজার টাকা দাম কম পড়ে বলে ব্যবসায়ীরা জানান। স্বর্ণের বারে খাদ মেশানোর পর মূল্য সংযোজন আরো বেশি হয়। নীতিমালার আওতায় গত এক বছরে মাত্র ২৫ কেজি স্বর্ণ আমদানি করেছে দুটি প্রতিষ্ঠান। ওই এক বছরের তুলনায় এক মাসে ৪৩ গুণ বেশি স্বর্ণ চট্টগ্রাম বিমানবন্দর দিয়ে এনেছেন প্রবাসীরা। গত বছরের নভেম্বরে এ বিমানবন্দর দিয়ে ১ হাজার ৯২ কেজি স্বর্ণ এসেছে। এ ছাড়া ভিন্নপথে অবৈধভাবে আসা স্বর্ণের হিসাব না থাকলেও প্রায়ই জব্দ করা হচ্ছে বিভিন্ন চালান। এসব স্বর্ণ আমদানি করেন মূলত এক শ্রেণির ব্যবসায়ীরা। যার প্রায় অর্ধেকই দেশে আসার পর আবার পাচার হয়ে যাচ্ছে। পাচারের সুবিধার্থে অনেক ক্ষেত্রেই স্বর্ণের মূল্য পরিশোধ হচ্ছে মাদকে।

টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজ আক্তার বলেন, প্রায়ই স্বর্ণের বার ও মাদক জব্দ করা হচ্ছে। ধারণা করছি মাদক কারবারিরা ইয়াবার মূল্য পরিশোধ হিসেবে স্বর্ণের বার ব্যবহার করতে পারে। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। সম্প্রতি কক্সবাজারের উখিয়া ও যশোর সীমান্ত এলাকায় বিপুল স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে।

গত ২০শে মার্চ যশোর সীমান্ত এলাকা থেকে ৩ কোটি ১৭ লাখ ৮০ হাজার টাকা মূল্যের স্বর্ণের বার জব্দ করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এ ঘটনায় দু’জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিজিবি এর যশোর ব্যাটালিয়ন (৪৯ বিজিবি)’র সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ ফারুক হোসেন জানান, স্বর্ণগুলো ঢাকা থেকে সীমান্ত এলাকা দিয়ে পাচার করা হচ্ছিলো। ঢাকা থেকে বেনাপোলগামী ফেম পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস যশোর-মাগুরা মহাসড়কের বাহাদুরপুর বাজারে পৌঁছালে অভিযান চালিয়ে স্বর্ণসহ দু’জনকে আটক করা হয়।

বিজিবি জানায়, ভারতে পাচারের উদ্দেশ্যে পায়ের স্যান্ডেলের মধ্যে বিশেষ কায়দায় রাখা ৪.৫৪০ কেজি ওজনের ১৩টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। জব্দকৃত স্বর্ণের মূল্য ৩ কোটি ১৭ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এ ঘটনায় আটককৃতরা হচ্ছে, রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দির খালখোলার আক্তার হোসেন মণ্ডল (৩০), ও একই জেলা সদরের হোগলাডাংগী গ্রামের হোসেন মিজি (৩৭)।

সম্প্রতি কক্সবাজারের উখিয়ার পালংখালী সীমান্তের কাটাখালী থেকে ৫৬টি স্বর্ণের বার জব্দ করেছে বিজিবি। এ ঘটনায় আটক করা হয় তিনজনকে। আটকরা হলেন কক্সবাজার সদর উপজেলার মনির আলম (৩৮), টেকনাফের হোয়াইক্যং এলাকার মামুনুর রশিদ (১৮), একই এলাকার নুর মোহাম্মদ (৩৬)।

কক্সবাজার ৩৪ বিজিবি’র অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আলী হায়দার আজাদ আহমেদ জানান, জব্দকৃত স্বর্ণের দাম প্রায় পাঁচ কোটি ৩০ লাখ টাকা। একইভাবে টেকনাফ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন রাস্তার উত্তর পূর্ব পাশে অভিযান চালিয়ে ৪২ ভরি ১১ আনা ওজনের তিনটি স্বর্ণের বার জব্দ করে কোস্টগার্ড। এ সময় মো. সেলিম (৩৫) নামে এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। উদ্ধার করা স্বর্ণের বারের আনুমানিক মূল্য ১৮ লাখ ৯১ হাজার ৭৫১ টাকা।

বিজিবি কর্মকর্তারা জানান, আগে স্বর্ণের বার যশোর সীমান্ত এলাকায় বেশি উদ্ধার হতো। এখন কক্সবাজার, কুমিল্লাসহ দেশের অধিকাংশ সীমান্ত এলাকায় স্বর্ণ উদ্ধার হচ্ছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, দেশে যে মাদক প্রবেশ করছে সেগুলোর মূল্য পরিশোধে স্বর্ণের বারগুলোকে ব্যবহার করা হচ্ছে। স্বর্ণের দাম বেশি আর পরিবহনও খুব সহজ, এই কারণেই মাদকের মূল্য পরিশোধে এগুলো ব্যবহার হচ্ছে। বিশেষ করে স্বর্ণের বিনিময়ে মাদক কারবারিরা ভারত থেকে ফেনসিডিল ও ইয়াবা আমদানি করছে। সূত্রমতে, দীর্ঘদিন থেকেই বিজিবি অভিযোগ করছে ভারত সীমান্ত এলাকায় মাদকের কারখানা রয়েছে। মিয়ানমার ছাড়াও ভারত থেকে দেশে আনার সময় প্রায়ই ইয়াবাও জব্দ করা হচ্ছে।

গত ১৫ই মার্চ বিজিবি’র সাতক্ষীরা ব্যাটালিয়ন ১ কোটি ২২ লাখ ৪৩ হাজার টাকা মূল্যের এক কেজি ৭৪৯ গ্রাম ওজনের ১৫টি স্বর্ণের বার জব্দ করে। বিজিবি’র যশোর ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. সেলিম রেজা জানান, গত ৯ই মার্চ যশোর বেনাপোলের আমড়াখালী চেকপোস্টের সামনে থেকে ৮০ লাখ টাকা মূল্যের ১০টি স্বর্ণের বারসহ একজনকে আটক করা হয়। এই স্বর্ণ ভারতে পাচারের উদ্দেশ্যে বিশেষ কায়দায় বহন করছিলো জানিয়েছে বিজিবি।

বিজিবি জানিয়েছে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে দেশের সীমান্ত এলাকাসহ অন্যান্য স্থানে অভিযান চালিয়ে ৫ লাখ ৭২ হাজার ৪১৩ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ৬২ হাজার ৮৭৮ বোতল ফেনসিডিল, ১৬ হাজার ৬৭৯ বোতল বিদেশি মদ, ৯১৪ ক্যান বিয়ার, ২,০৬৯ কেজি গাঁজা, ৬ কেজি ৫৩৬ গ্রাম হেরোইন জব্দ করা হয়েছে। প্রতি মাসে বিপুল মাদক আসছে সীমান্ত এলাকা দিয়ে।

বেনাপোল পোর্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মামুন জানান, দেশ থেকে স্বর্ণ পাচার করা হচ্ছে। অন্যদিকে আমদানি করা হচ্ছে মাদক। আমরা প্রায়ই স্বর্ণ ও মাদকসহ জড়িতদের গ্রেপ্তার করি। কিন্তু যারা গ্রেপ্তার হচ্ছে তারা মূলত ক্যারিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মূলহোতারা আড়ালে থেকে যায়। গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা অনেকে মূল হোতাদের পরিচয় জানে না।