সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে নৈরাজ্য এখন চরম

182

সিএনজি অটোরিকশা   নিয়ে নৈরাজ্য কমছে না বরং বাড়ছে, অথচ দেখার কেউ নেই।

‘ঢাকা শহরে নতুন আইছেন নাকি। সিএনজি এখন আর মিটারে চলে না। মিটারে চললে আমাগো আর ভাত খাইয়া বাঁচন লাগবো না। জ্যামের ঠ্যালায় জমার টাকা উঠাইতেই দিন শ্যাষ হয়। মিটার ভুইল্যা যান।’ সিএনজি অটোরিকশাচালক আমজাদ অনেকটা ক্ষোভের সঙ্গেই কথাগুলো বললেন। রাজধানীর রাস্তায় চলাচলরত সিএনজিচালকদের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে কথা বলে আমজাদের মতো একই ধরনের বক্তব্য পাওয়া গেছে অনেকের কাছে। এখন রাজধানীতে চালকদের ইচ্ছে অনুযায়ী সিএনজি অটোরিকশা চলছে।

প্রতিটি সিএনজিতে মিটার রয়েছে, কিন্তু চালকরা মিটারে যাতায়াত করেন না। চুক্তিভিত্তিক ভাড়ায় চলা নিয়মে পরিণত হয়েছে। গণপরিবহনের অন্যতম এই বাহনের নৈরাজ্য এখন চরমে। কিন্তু এই নৈরাজ্য নিয়ন্ত্রণের কেউ নেই। পুলিশ রহস্যজনক কারণে নীরব ভূমিকায় রয়েছে। বিআরটিএ কর্তৃপক্ষও চোখ থাকতে অন্ধ, কান থাকতে বধিরের ভূমিকায় রয়েছে। নগরীর বিভিন্ন স্থানে সিএনজিচালক ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোনো সিএনজিচালকই এখন আর মিটারের ভাড়া অনুযায়ী যাত্রী পরিবহন করেন না। কোথাও যেতে চাইলে সরাসরি ইচ্ছে অনুযায়ী ভাড়া চেয়ে বসে থাকেন। চালকদের সাফ জবাব ‘সিএনজি এখন আর মিটারে চলে না।’ রাস্তায় কর্তব্যরত ট্রাফিক পুলিশের সামনেই সিএনজি চালকরা এই নৈরাজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ পুলিশ এই নৈরাজ্য নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

ফলে দিন যত যাচ্ছে, অটোরিকশা যাত্রীদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। আবার অনেক সময় মিটার টেম্পারিংয়ের কারণে দূরত্ব বেশি দেখিয়েও চালকরা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করেন। এ কারণে অনেক যাত্রী মিটারের পরিবর্তে চুক্তিতে যাতায়াত করতে পছন্দ করেন। প্রাইভেট অটোরিকশাগুলোও বাণিজ্যিক অটোরিকশার মতো একইভাবে যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া আদায় করছেন। গণপরিবহনে সংকট দেখা দিলে সিএনজি অটোরিকশা চালকরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেন। অর্থাৎ যাত্রীরা সিএনজি অটোরিকশার কাছে জিম্মি অবস্থায় রয়েছে। মিডিয়া কর্মী ঝর্ণা জানান, তাকে প্রতিদিন সকালে রামপুরা থেকে নীলক্ষেত যেতে হয়। দ্রুত যাতায়াতের জন্য তিনি সিএনজি অটোরিকশা ব্যবহার করেন। যাওয়ার সময় তিনি ১৫০ টাকা থেকে ২০০ টাকা ভাড়া দেন। তবে ফেরার সময় তাকে কমপক্ষে ৩০০ টাকা ভাড়া গুনতে হয়।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আরশাদুল মোমেন জানান, পান্থপথ থেকে তিনি সিএনজিতেই বনানী বাজারের অফিসে যাতায়াত করেন। সকালে আড়াইশ টাকার কমে কোনো সিএনজি যেতে চায় না। সন্ধ্যায় ৩০০ টাকার কমে কোনো সিএনজি পাওয়া যায় না। ভাড়ার এই নৈরাজ্য নিয়ে বেশ কয়েকবার রাস্তায় কর্তব্যরত ট্রাফিক সার্জেন্টের কাছে অভিযোগ করেছেন। কিন্তু সার্জেন্ট কোনো ব্যবস্থা নেননি বলে মোমেন অভিযোগ করেন।
অন্যদিকে বিপরীত চিত্রও দেখা গেছে। ধানমন্ডির বাসিন্দা ইয়াসমিন সাথী জানান, তিনি মিটারের চেয়ে চুক্তিতে যেতেই পছন্দ করেন। চুক্তিতে ধানমন্ডি ৬ নম্বর রোড থেকে
সাড়ে ৩০০ টাকায় বিমানবন্দর চলে যান। কিন্তু মিটারে গেলে দীর্ঘসময় যানজটে বসে থাকার কারণে ভাড়া অনেক বেশি গিয়ে দাঁড়ায়।

রাস্তায় সিএনজি অটোরকিশার অনিয়মের ব্যাপারে ট্রাফিক সার্জেন্ট মকবুল হোসেন জানান, যাত্রীরা অভিযোগ করলে আমরা ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করি। অনেক সময় চালকরাও যুক্তিসংগত কারণ দেখায়। তখন আমাদের আর কিছুই করার থাকে না।
সিএনজি চালক আমজাদ জানান, মিটারে চললে তারা ভাত খেয়ে বেঁচে থাকতে পারবেন না। একবার সিএনজি নিয়ে বের হতে জমা, গ্যাস ও নিজের খাওয়াসহ ২ হাজার টাকা খরচ আছে। এরপর আবার বিভিন্ন স্থানে পুলিশকেও টাকা দিতে হয়। এই খরচ উঠিয়ে তারপরে পরিবার চালানোর খরচ তুলতে হবে। কিন্তু যানজটের কারণে দিনের খরচ উঠাতেই হিমশিম খেতে হয়। মিটারে চললে টিকে থাকা যাবে না।

সিএনজি চালক আব্দুল মালেক জানান, এখন প্রতিদিন মালিককে ১ হাজার টাকা জমা দিতে হয়। কমপক্ষে ৪০০ টাকার গ্যাস লাগে। তিন থেকে চার’শ টাকা লাগে খাওয়ায়। মাঝে মাঝে নানান বাহানায় পুলিশ টাকা চাইলে তাও দিতে হয়। তিনশ টাকার এক খ্যাপ মারতে যানজটের কারণে রাস্তায় ৪ ঘণ্টাও বসে থাকতে হয়। মিটারে চললে দিনের খরচও উঠবে না। তাই মিটার বাদ দিয়ে এখন চুক্তিতে চলাচল করি।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজ্জাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সিএনজি অটোরিকশা অন্যতম গণপরিবহনের ভূমিকা পালন করে। অনেক দিন থেকেই অটোরিকশার নৈরাজ্য চলছে। কিন্তু পুলিশের ভ‚মিকা দুর্বল হওয়ার কারণে নৈরাজ্য বন্ধ হচ্ছে না। যখন পুলিশের তৎপরতা বেশি থাকে তখন তারা মিটারে যাতায়াত করে। বিআরটিএর তৎপরতা নেই বললেই চলে। সিএনজি অটোরিকশার নৈরাজ্য দূর করতে হলে পুলিশ ও বিআরটিএকে জোরালো ভূমিকা নিতে হবে।

পুলিশ ও বিআরটিএ সূত্র জানায়, বায়ু দূষণের কারণে টু- স্টোক অটোরিকশা রাজধানী থেকে তুলে সিএনজি অটোরিকশা নামানো হয়। প্রথমে ১৩ হাজার সিএনজি অটোরিকশাকে বিআরটিএ থেকে নিবন্ধন দেয়া হয়। তবে এখন বৈধ ও অবৈধ মিলিয়ে ৩০ হাজারের বেশি অটোরিকশা চলাচল করছে। অবৈধ সিএনজিগুলো রাজধানীর প্রধান সড়কে কম চলাচল করে। পুলিশকে ঘুষ দিয়ে এগুলো ‘ফিডার রোডে’ চলাচল করে।