সাতক্ষীরা সিটি কলেজে জালিয়াতির মাধ্যমে শিক্ষক ও এমপিওভুক্তি

23

>>নাটেরগুরু ১০ শিক্ষককে দুদকের ঢাকায় তলব
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি:নিয়ম বর্হিভূতভাবে এবং মোটা অংকের আর্থিক সুবিধা নিয়ে রেজুলেশন জালিয়াতির মাধ্যমে সাতক্ষীরা সিটি কলেজে ২০ জন শিক্ষক নিয়োগ ও ২১জন শিক্ষককে এমপিওভুক্ত করার অভিযোগের তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক।

প্রথম দফায় ১৭ জানুয়ারি থেকে ঢাকায় ডেকে নিয়ে কলেজের ১০জন প্রভাষকের লিখিত বক্তব্য নেয়া শুরু হয়েছে। গত ১১ জানুয়ারি সাতক্ষীরা সিটি কলেজের অধ্যক্ষকে দুদকের ইপসহকারী পরিচালক ও অনুসন্ধানী কর্মকর্তা প্রবীর কুমার দাশের দেয়া চিঠিতে অধ্যক্ষ আবু সাঈদসহ অন্যদের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, বিধি বর্হিভূত ভাবে রেজুলেশন জালিয়াতি করে শিক্ষক নিয়োগ ও অণনয়মের মাধ্যমে ১৬ জন শিক্ষককে এমপিও ভুক্তি করার বিষয়টি তদন্তের জন্য ১০ জন শিক্ষককে ঢাকায় তলব করা হয়েছে।

ইতোমধ্যে এই দশজন শিক্ষকের মধ্যে ৫ জন শিক্ষকের কাগজপত্র জাল বলে প্রাথমিক তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে।

দুদকের এই তদন্ত প্রক্রিয়ায় কলেজের অধ্যক্ষসহ মোট ২১ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ প্রক্রিয়ায় রাখা হয়েছে। ২০১৯ সালের ২৪ জুলাই দুদকের হট লাইনে এক শিক্ষকের অভিযোগের পর তদন্ত প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি থেকে এ সকল শিক্ষকে তদন্ত কর্মকর্তাদের মুখোমুখি দাড়িয়ে লিখিত বক্তব্য দিতে হচ্ছে।
যে সকল শিক্ষককে ১৭ জানুয়ারি থেকে ঢাকায় দুদক কার্যালয়ে হাজির হতে বলা হয়েছে তারা হলেন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক সৈয়দা সুলতানা, পদার্থবজ্ঞান বিভাগের আজিম খান, ইংরাজী বিভাগের এ এস এম আবু রায়হান, ইতিহাস বিভাগের মো: জাকির হোসেন, রসায়ন বিভাগের মোছা: নাজমুন্নাহার, হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের অরুণ কুমার সরকার, দর্শন বিভাগের শেখ নাসির উদ্দিন, বাংলা বিভাগের মো: মনিুরুল ইসলাম, মনোবিজ্ঞান বিভাগের উত্তম কুমার সাহা ও প্রাণীবিদ্যা বিভাগের সুরাইয়া জাহান। আজ ২১ জানুয়ারি প্রথম দফায় ১০ জন শিক্ষকের জিঙ্গাসাবাদ শেষ হচ্ছে । প্রতিদিন দুইজন করে শিক্ষকের লিখিত বক্তব্য নেয়া হয়েছে।
প্রায় ৪ কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্যে কলেজ পরিচালনা পরিষদের সভাপতি, কলেজ অধ্যক্ষ আবু সাঈদ ও মাউশি’র মহাপরিচালক, মাউশি’র খুলনা বিভাগীয় উপ-পরিচালক, জেলা ও উপজেলা শিক্ষা অফিসারের বিরুদ্ধে এই অনিয়মের অভিযোগ আনা হয় ২০১৯ সালে। অভিযোগের প্রেক্ষিতে ১৯ সালের পহেলা আগস্ট দুদকের উপ-পরিচালক এনফোর্সমেন্ট মো. মাসুদুর রহমান সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রতিবেদন প্রেরণ পূর্বক কমিশনকে অবহিত করনের নির্দেশ প্রদান করেন। দুদকের ১০৬ হট লাইনে ১৯ সালের গত ২৪ জুলাই সাতক্ষীরা সিটি কলেজের হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক বিধান চন্দ্র দাস এক অভিযোগ দাখিল করেন। পরে এই অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ পত্রসহ লিখিত অভিযোগ চাওয়া হলে অভিযোগকারি প্রভাষক বিধান চন্দ্র দাস গত ৫ আগস্ট ৬ পৃষ্টা বর্ণিত অভিযোগ ও শতাধিক পৃষ্টার তথ্য প্রমানসহ দুদক চেয়ারম্যান বরাবর ফের আবেদন করেন। যা হট লাইনে করা অভিযোগের সাথে সংযযুক্ত করা হয়।
অভিযোগ তৎকালিন পরিচালনা পরিষদের সভাপতি জামায়াত নেতা ও তৎকালিন সংসদ সদস্য বর্তমানে যুদ্ধাপরাধ মামলায় কারাগারে থাকা অধ্যক্ষ মাও. আব্দুল খালেক এর নির্দেশে এক বিতর্কিত নিয়োগ বোর্ড দেখিয়ে অধ্যক্ষ মো. ইমদাদুল হক, উপাধাক্ষ্য মো. শহিদুল ইসলাম, অর্থনীতি বিভাগে মো. কাদির উদ্দীন এবং মো. মফিজুর রহমান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে একেএম ফজলুল হক, ইসলামের ইতিহাস বিভাগে মো. আশরাফুল ইসলাম ও মো. আব্দুল ওয়াদুদ, ইতিহাস বিভাগে মো. জাকির হোসেন, দর্শন বিভাগের মো: জাহাঙ্গীর আলম, ভূগোল বিভাগে মো. নজিবুল্যাকে রাতারাতি নিয়োগ প্রদান করেন। পরবর্তীতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নীরিক্ষা অধিদপ্তর ২০১১ সালের ২২ ও ২৩ অক্টোবর শিক্ষা পরিদর্শক মো. মজিবুর রহমান এবং অডিট অফিসার মো. ফরিদ উদ্দীন নীরিক্ষা ও পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে ২০১২সালের ৩ জানুয়ারি দেয়া রিপোর্টে তৎকালিন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আব্দুর রশিদের আমলে নিয়োগকৃত শিক্ষক কর্মচারিদের নিয়োগ যথাযথ হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়। অভিযোগ,জামায়াত নেতা অধ্যক্ষ আব্দুল খালেক মন্ডলের সময়ে বিতর্কিত ওই ১৪জন শিক্ষকের নিয়োগ বাতিল না করে বর্তমান অধ্যক্ষ আবু সাঈদ ও কলেজ পরিচালনা পরিষদের সভাপতি কাগজপত্র জালিয়াতি করে এবং প্রকৃত তথ্য গোপন করে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে অর্থনীতি বিভাগে মো. কাদির উদ্দীন এবং মো. মফিজুর রহমান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে একেএম ফজলুল হক, ইসলামের ইতিহাস বিভাগে মো. আশরাফুল ইসলাম, ইতিহাস বিভাগে মো. জাকির হোসেন, দর্শন বিভাগের মো. জাহাঙ্গীর আলমকে এমপিওভুক্ত করান। অভিযোগ রয়েছে এরা সকলেই জামায়াত শিবিরের ক্যাডার এবং বিভিন্ন নাশকতা ও রাষ্ট্রদ্রোহী মামলায় একাধিকবার আটক হলেও কলেজ কতৃপক্ষ তাদের এমপিও হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগ, সিটি কলেজের প্রভাষক অরুণ কুমার ২০১১ সালের ১৫ ডিসেম্বর উক্ত কলেজের হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের অনার্স শাখায় যোগদান করেন। এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০১৮ সালের ২৮ আগষ্ট ও ২০১৯ সালের ১২ মার্চ পরিপত্রে ডিগ্রি স্তরে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় শিক্ষক হিসেবে এমপিওভুক্তির প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এই প্রজ্ঞাপন উপেক্ষা করে অধ্যক্ষ আবু সাঈদ ও কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির যোগসাজসে ১৫ ডিসেম্বর ২০১১ তারিখে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক অরুণ কুমার সরকারের নিয়োগ ও যোগদান সংক্রান্ত তথ্য জালিয়াতি ও গোপন করে ২০১০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি তারিখের পূর্বে ডিগ্রি স্তরের তৃতীয় শিক্ষক হিসেবে ২০১৯ সালের জুলাই মাসে এমপিওভুক্ত করেন। এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র উপেক্ষা করে ডিগ্রি স্তরে ইংরেজি বিভাগে এসএম আবু রায়হান, বাংলা বিভাগে মো. মনিরুল ইসলাম, দর্শন বিভাগে মো: নাসির উদ্দীনকে একই ভাবে জালজালিয়াতির মাধ্যমে ও তথ্য গোপন করে ডিগ্রি স্তরের তৃতীয় শিক্ষক হিসেবে ২০১৯ সালের জুলাই মাসে এমপিওভুক্ত করা হয়। বিএসসি শাখায় ডিগ্রি স্তরে কোন ছাত্র ছাত্রী না থাকলেও প্রাণি বিজ্ঞানে আশরাফুন্নাহার ও সুরাইয়া জাহানকে ২০১৮ সালে কাগজপত্র জালিয়াতি করে ও তথ্য গোপন করে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।