সাংবাদিকের ওপর পুলিশের হামলা


  প্রকাশিত হয়েছেঃ  06:06 PM, 12 August 2021

রহিম রানা: খুলনায় মাদক ব্যবসা ও সম্পত্তি দখলে বাধা দেয়ায় আবারো সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল বুধবার সকালে খুলনার লবনচরা থানাধীন আল-আকসা মোড়ে এই ঘটনা ঘটে। স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ী তাহিদুল ইসলাম ওরফে ধলা তাহিদ প্রথমে নিজে ও পরে তার স্ত্রী, শ্বশুর ও দলবল নিয়ে সাংবাদিক আব্দুল্লাহর ওপর হামলা চালায়। এসময় তাহিদের অসুস্থ্য-বৃদ্ধ মা হাবিবা বেগম (৭৫) সেখানে ছুটে গেলে তার ওপরও হামলা চালানো। তবে স্থানীয়দের সহযোগিতার কারণে সেখানে বড় ধরনের কোন হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

এর আগে এই মাদক ব্যবসায়ীর মাদক সেবনের একটি সিসি টিভি ফুটেজ প্রকাশের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বেশ রোষানলে পড়েন দৈনিক নাগরিক ভাবনা’র স্টাফ রিপোর্টার ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সাংবাদিক সংস্থার ঢাকা বিভাগের সেক্রেটারী আব্দুল্লাহ। তিনি তার পিতার একটি নির্মাধীন সাইটে নিরাপত্তার কারণে এইসব সিসি ক্যামেরা স্থাপন করায় এই মাদক ব্যবসায়ী ও তার খদ্দেররা বেশ ক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে, বিভিন্নভাবে তার সাথে শত্রুতা পোষণ করতে থাকে একর পর এক। অভিযোগ পাওয়া যায়, গত ৩রা আগস্ট ধলা তাহিদ এবং তারই আপন ভাই মেহেদী হাসান এই সাংবাদিকের বাসায় ২০-২৫ জনের একটি সশস্ত্র সন্ত্রাস বাহিনী পাঠিয়ে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি ও হুমকি ধামকি দিয়ে যায়, ঘরের ছোট ছোট শিশু ও মহিলাদেরকে লাঞ্ছিত করে যায়, নগদ টাকাও নিয়ে যায় ৩২ হাজার। কিন্তু সে ঘটনায় কোন মামলা কেন করা হয়নি এমন প্রশ্নের উত্তরে আব্দুল্লাহ জানান, যেহেতু এসব ঘটনার মূল কারিগর নিজেই একজন প্রভাবশালী পুলিশ অফিসার, সেহেতু থানায় মামলা না নেয়ারও একটা আশংকা রয়েছে, এমনকি তাদের তরফ থেকে জীবননাশেরও হুমকি আসছে বারবার। তবে এ ঘটনায়ও সিসি টিভি ফুটেজ থাকার কথা জানা যায়।
সূত্র বলছে, পুলিশ টেলিকমে চাকরিরত পুলিশের সাব ইন্সপেক্টর মেহেদী হাসান বেশ কয়েক বছর আগে তার আপন বড় ভাইয়ের স্ত্রীকে ভাগিয়ে নিয়ে বিয়ে করে, সেই ঘরে একটি ছেলে ও একটি মেয়ে সন্তানও ছিল। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মেহেদী দীর্ঘদিন ধরে পরিবার ও সকল আত্মীয়-স্বজন থেকে বিতাড়িত থাকে। ফলে আত্মীয় স্বজনদের প্রতি একটি গভীর প্রতিহিংসাত্মক মনোভাবের জন্ম নেয়, তাকে আরো বেশি উস্কে দেয় তার সেই স্ত্রী-ছনিয়া। এরপর এক সময় মেহেদী সুকৌশলে তার মা-বাবা ও ভাইবোনের সাথে মিলেমিশে যায় ঠিকই, কিন্তু ছনিয়াকে কখনো মেনে নেয়নি কেউ। এই ক্ষোভে সে এক সময় ঘোষণা দেয় যে, যে পরিবার সমাজের দোহায় দিয়ে তার স্ত্রীকে মেনে নেয়না, সেই পরিবার ও আত্মীয়-স্বজন সকলকে সে লাঞ্ছিত করবে, তার নিজের ছোট বোনের স্বামীর কাছেও বোন সম্পর্কে নোংড়া বানোয়াট সব ঘটনা শুনিয়ে তার সংসার ভাঙ্গার অপচেষ্টা করে, বড় বোনকে বানায় প্রধান শত্রু। বড় বোনের সাথে চ্যালেন্জ করে যে, ‘তুই তোর নাতি কে কিভাবে বিয়ে দিস তা আমি দেখাবো, তোর মেয়েদেরও সংসার ভাঙবো।’ এমনকি এমন চ্যালেন্জও ছোড়ে যে, ‘সমাজ নিয়ে চলবি? আমার পরিবার তোদের সমাজে মিশতে পারবে না? তাহলে তোর বাড়ির সামনে নেশার জায়গা বানাবো, জুয়ার আসর বসাবো, দেখি তোর পরিবেশ ক্যামনে ভালো থাকে!’
যেমন কথা তেমন কাজ- প্রথমে তার বড় বোনের ঘরের সামনেই শুরু করে রমরমা মাদক ব্যবসা, এরপর একটি রিকসা গ্যারেজ স্থাপনের কাজ ও বখাটেদের বাজে আড্ডার আসর জমাতে থাকে নিয়মিত। আর তার এসব অনৈতিক কাজগুলো করানোর জন্য শুরু থেকেই তারই আপন ভাই ধলা তাহিদকে বানায় মাদকাসক্ত-নেশাখোর, বিয়ে দেয় তারই এক শ্যালিকার সাথে। তার এই শ্যালিকা আবার দক্ষিণ বাংলার এক সময়ের দুরধর্ষ সর্বহারা লিডার রশিদের ভাগিনী, সেই পরিচয়ে এই শ্যালিকাও আগাগোড়া বেপরোয়া জীবনযাপন করে। এদিকে মেহেদী তার নিজের জায়গায় দোকান ঘর তৈরি করে নিজের বিনিয়োগে চা-সিগারেটের আড়ালে ধলা তাহিদকে দিয়ে মাদক ব্যবসা শুরু করে। একটা ইয়াবার বিনিময়ে এই দুরধর্ষ ধলা তাহিদ মেহেদীর হুকুমে তার নিজের মা-বাবা ও ভাই-বোনের ওপরে ছুরির আঘাত হানতেও একটু পিছপা হবে না- এভাবেই নাকি ট্রেনিং দেয়া হয়েছে তাকে।

এতো অপকর্মের পরও এই পুলিশ অফিসারের ব্যাপারে নিরব রয়েছে তার ভূক্তভোগি মা-বাবা ও ভাই-বোন। কোন প্রতিবাদ করলেই দেখানো হচ্ছে হামলা-মামলার ভয়। বড় বোনের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা ধার নিয়ে তা চাইতে গেলে চাঁদাবাজ বলে মামলা করার ভয় দেখায় সে, কর্মস্থলে কোন ঘুষ খায়না বলে দাবি করলেও আপন ভাই-বোনের কাছে কড়া সূদে টাকা খাটানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে । আপন ভাই নাহিদুল শেখকে মাত্র দেড় লাখ টাকা ধার দিয়ে ১২ লাখ টাকা সূদ খাওয়ারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে, শেষমেষ না পেরে নাহিদের নিজের বসত বাড়িই লিখে দিতে হয়েছিল মেহেদীকে। মেহেদীর বিরুদ্ধে এরকম অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে তার মায়েরও, প্রতারণা করে সে তার মায়ের দামী জমিজমা লিখে নিয়েছে সম্প্রতি, মৃত ভাইয়ের স্ত্রীকে ফাঁকি দিয়ে প্রায় ৪ লাখ টাকা মূল্যের সোনার হারও আত্মসাৎ করেছে সে।
আরো জানা যায়, মেহেদী দীর্ঘদিন পরোকিয়া করে তার বড় ভাইয়ের বিবাহিতা স্ত্রী ছনিয়াকে ভাগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরও সেই হতভাগা বড় ভাই কোনদিন ছোট ভাইকে টু-শব্দটিও বলার সুযোগ পাননি, যখনই প্রতিবাদ করতে চেয়েছেন তিনি তখনই মেহেদী তার ভাইয়ের প্রতিপক্ষদের সাথে গোপনে আতাত করে বিভিন্ন রাজনৈতিক মামলায় ফাঁসিয়েছে তাকে। আপন ভাইকে লোক দিয়ে প্রায় হাফ ডজন মামলার আসামী বানিয়েছে সে। একদিকে সে নিজেই মামলায় ফাসিয়েছে, অন্যদিকে মামলা লড়তে সকল প্রকার আর্থিক সহযোগিতাও করেছে সে। তার বক্তব্যমতে সে যা কিছু করে বা করছে তার সবকিছুই এসপি-ডিআিইজি’র হুকুমে হচ্ছে, অতএব তাকে দমানোর কোন শক্তি কারো নাই। এরকম নানা ভয়-ভীতি ও অপকৌশলে সে তার পুরো পরিবারটাকে জিম্মি করে রেখেছে বলে অভিযোগ করেছেন তারই নিজের মা। এসব বিষয়ে এই পুলিশ অফিসার মেহেদী হাসানের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদনটি লেখা পরযন্ত তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি।

এদিকে গতকালের হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সাংবাদিক সংস্থার মহাসচিব দেওয়ান ওমর ফারুক তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, একজন মানবাধিকার কর্মী নিজেই দীর্ঘদিন যাবৎ এভাবে নিরবে-নিভৃতে অন্যায়ের শিকার হবেন তা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না, যদি তার ওপর কোন হুমকি থেকে থাকে তাহলে প্রয়োজনে আমরাই আইনী পদক্ষেপ গ্রহণ করবো। এসময় তিনি সকল সাংবাদিক এবং মানবাধিকার কর্মীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন যে, শুধু সাংবাদিক আব্দুল্লাহর পাশে দাড়ানো নয়, বরং এই অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা মেহেদী হাসানের মা-বাবা ও ভাই-বোনের সাথে আলাপ করে প্রয়োজেনে তাদেরকে অভিযোগ দায়েরের ব্যাপারে সহায়তা করা দরকার। তিনি মনে করেন যে, এই ধরণের কতিপয় বেপরোয়া পুলিশ সদস্যের কারণে গোটা পুলিশ সমাজ আজ লজ্জিত হচ্ছে, এদেরকে দ্রুত চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।

আপনার মতামত লিখুন :