শিবানী রায়ের ছোট গল্প ” লাবনীর সংসার ” “


  প্রকাশিত হয়েছেঃ  05:49 PM, 16 August 2021

 


“লাবনীর সংসার-

উঠ ছ্যারি তোর বিয়ে”-

।। শিবানী রায় ( রোজ নীল)

আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে। ভাল পরিবার, ছেলে ব্যাংকে চাকরি করে, মা আমায় খুব সকালে ডেকে বলে, এই লাবনী তারাতারি ওঠে পর, আজ তোর বিয়ে,
আমি ধরমর করে উঠে বসলাম, চোখ ডলতে ডলতে বললাম কার বিয়ে মা?
তোর বিয়ে।
ভাল পাত্র পেয়েছি, কাল রাতে তোর বাবার সাথে পাত্র পক্ষের কথা হয়েছে, তারা আজ আসবে, এসে দেখেই একবারে তোকে বিয়ে করে নিয়ে যাবে।
আমি খুব স্বাভাবিক ভাবে বললাম, ও আচ্ছা।
মা বলে যা স্নান সেরে নে, আমি সেই কোন সকালে উঠে রান্না বান্না শুরু করেছি, তোকে ডাকিনি, ভাবলাম শ্বশুরঘরে গিয়ে তো আর এভাবে ঘুমাতে পারবি না,
আর শোন মা, শ্বশুরবাড়ি গেয়ে কিন্তু সবার কথা শুনবি, শ্বশুর, শাশুড়ি, স্বামী পরিবারের সবার মন যুগিয়ে চলবে, তুমি তো আবার সংসারের কোন কাজ তেমন পারনা, শ্বাশুড়ির কাছ থেকে শিখে নেবে,
আমি বললাম আচ্ছা মা,
মা বলে, আর একটি কথা শোন, শ্বশুর বাড়ির সবাই কিন্তু তোমার শিক্ষক হয়ে যাবে, সবাই তোমার এটা হয়নি ওটা হয়নি বলে শিক্ষা দেবে, রাগ করবে না। একটা মেয়ের জন্য শ্বশুর বাড়ি হলো প্রাইমারি স্কুল। খুব সাবধানে কাজ করবে, নতুবা ভুল হলে যখন কেউ বকা দেবে তখন কষ্ট পাবে,
মায়ের উপদেশ শেষ হলে আমি স্নান করতে গেলাম। স্নান শেষে আমার ছোট বোন আমাকে সাজাঁতে বসলো, আমার গায়ের রং একটু কালো, তাই খুব বেশি নিজেকে সাজাঁতে বারন করলাম।
যাহোক দুপুরের আগেই ওরা চলে এলো, আমাকে দেখলো,মোটামুটি পছন্দ হওয়া মেয়েটিকে ওরা ছেলের বৌ করে নিতে রাজি হলো।
বিয়ে হয়ে গেল আমার, কি থেকে কি হয়ে গেল আমি কিছুই বুঝতে পালাম না,
বুঝতে পারলাম তখন, যখন আমার প্রিয় মানুষগুলোকে ছেড়ে ওদের সাথে রওনা হলাম,
বুক ফেঁটে কান্না আসলো, গলাটা ভার হয়ে ব্যথা শুরু হলো,
চোখে সামনে সব আবছা দেখতে লাগলাম।
এক সময় শ্বশুরবাড়ি চলে আসলাম, দো’তলা একটি বাড়ি, খুব সুন্দর বাড়ি, আমাকে উপরের একটি ঘরে নিয়ে বসানো হলো, একে একে সবাই এসে আমার সাথে পরিচিত হলো,বাড়ির বৌ এসে মিষ্টি করে হেসে বললো আমি কিন্তু তোমার বড়দি, যেকোন সমস্যা হবে তুমি আমাকে বলতে পার, বড়দির ৫ বছরের মেয়েটি আমার পাশে এসে প্রথম থেকেই বসে আছে, আমাকে খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছে আর মিচকি হাসছে।

সেই রাতে স্বামী আমাকে কিছু উপদেশ দিল, এই যেমন আমাদের পরিবারে আমাদের মা- ই সব সামলায়, তুমি মায়ের কথা মত চলবে,বাবার খেয়াল রাখবে,

রাতে খুব একটা ভাল ঘুম হলোনা, নতুন জায়গায়, ভোর বেলা স্বামী ঠেলে আমায় উঠিয়ে দিয়ে বললো যাও রান্না ঘরে, মা কি করছে দেখ গিয়ে।

আমি উঠে ফ্রেস হয়ে রান্না ঘরে গেলাম, শাশুড়ি মা আমায় দেখে বলে ও তুমি? আজ তোমাকে কিছু করতে হবে না, তবে এরপর কিন্তু সংসারের সব দায়িত্ব তোমার। বড় বৌ চাকরি করে, ওর পক্ষে সংসারের দায়িত্ব পালন করা সম্ভব না, তোমার দেবর, ননদ তো পড়াশুনা করে,
আমি বল্লাম আচ্ছা মা,
সেই দিনের পর থেকে সংসারের সব দায়িত্ব আমার উপর এসে পরলো, কাজের বুয়া অবশ্য আছে একজন। ছুটির দিনগুলোতে বড়দি অনেক কাজে সাহায্য করে, কাজে ভুল করলে শাশুড়ি মা মাঝে বকাঝকা দেয়, দেবর, ননদ এরা খুব ভালবাসে তাই ওদের সব আব্দার আমার কাছে, ৫ বছরের বাচ্চা মেয়েটিও আমাকে ছাড়া কিছু বোঝে না, মাঝে মাঝে সত্যি আমি হাঁপিয়ে উঠি, খুব ইচ্ছে হয় মায়ের কাছে গিয়ে কয়েকটা দিন বিশ্রাম নিয়ে আসি।
আমার স্বামী ভাল মানুষ, তবে সে আমাকে বুঝতে পারে না, আমার মান, অভিমান, চাওয়া পাওয়া কোনটার দিকে তার খুব একটা খেয়াল থাকে না, প্রথমে খুব কষ্ট পেতাম এখন মানিয়ে নিতে চেষ্টা করছি।শ্বশুর এবং ভাশুর এরা আপন মনে থাকে। এই আমার পরিবার।
আমার বিয়ের ৭ মাস কেটে গেছে, আমরা ধারনা কেউ আমাকে নিয়ে তেমন একটা ভাবে না।
কি করে আমি একা সব দিক সামলিয়ে চলছি,
যে আমি মাকে হুকুম করতাম মা আমাকে এটা দাও, ওটা দাও আর এখন আমাকে সবাই হকুম করে,
হঠাৎ একদিন আমার বড় জা আমায় বলে, লাবনী আমার স্কুল বেশ কয়েকদিন বন্ধ আছে, তুমি যাও না এই ফাঁকে বাবা মায়ের কাছ থেকে বেড়িয়ে আস, আমি এ দিকটা সামলিয়ে নেব।
আমি বললাম, তা কি করে হয় তুমি একা পারবে না বড়দি, তাছাড়া ও কি রাজি হবে?
বড় জা বলে, সবাইকে রাজি করার দায়িত্ব আমার।
সত্যি সত্যি বড়দি সবাইকে রাজি করিয়ে ফেললো, আমার শাশুড়ি মা রাজি হতে না চাইলেও শেষে রাজি হলো।
আমাকে আমার স্বামী এসে আমার বাড়ি পৌছে দিয়ে গেল, অনেকদিন পর বাবা মার কাছে এসে মনটা আনন্দে ভরে গেল, ছোট বোনটাও আমাকে পেয়ে অনেক খুশি, কি করে যে চারটি দিন কেটে গেল বুঝলামই না,৫ ম দিনের দিন হঠাৎ আমার স্বামী এসে হাজির, আমায় বলে লাবনী সরি, তোমাকে বাড়ি যেতে হবে, মায়ের শরীরটা ভাল না, বড় বৌদি একা সব পেরে উঠছে না,
আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল।
ও বললো মন খারাপ করনা, যাও রেডি হয়ে নাও, আবার না হয় কয়েকদিন পর এসে বেড়িয়ে যাবে, আর তোমার মাকে পাঠিয়ে দাও আমি তাকে বুঝিয়ে বলি,
কষ্ট হলেও আমি মাকে ওর কাছে পাঠিয়ে রেডি হয়ে নিলাম,
আমরা রওয়া হলাম ঠিক ৫ টায়, বাড়ি যেতে যেতে সাতটা বাজলো,

বাড়িটা কেমন অন্ধকার আর থমথমে, দোতলায় ব্যলকুনিতে আলো জ্বলছে কিন্তু নিচে কেমন জানি একটা অন্ধকারভাব, সবাই চুপচাপ, কাজের বুয়া দরজা খুলে দিয়ে করে চলে গেল, আমার বুকটা ধক করে উঠলো মায়ের কি কিছু হয়েছে।
আমি আমার স্বামীকে বললাম সবাই কোথায় আর ড্রয়িং রুমে আলো নাই কেন?
ও বলে দাঁড়াও বৌদিকে ডাকি,
কথাটা বলার সাথে সাথে সব আলো একসাথে জ্বলে উঠলো, আমার মাথার উপর হরেক রকমের ফুল এসে পরতে লাগলো, ঘরটাকে অদ্ভুদ সুন্দর করে সাজানো হয়েছে, চারিদিক থেকে মিউজিক বেজে উঠলো ‘হ্যাপি বার্থডে টু ইউ,’
সামনে তাকিয়ে দেখি পরিবারের সবাই দাড়িঁয়ে হাসছে। এমনকি আমার শাশুড়ি মা ও আছে, সবার হাতে কিছু না কিছু উপহারের প্যাকেট, বাবার হাতে বড় একটা কেক, তিনি সামনে টেবিলে কেকটি রেখে আমার মাথায় হাত দিয়ে বললো শুভ জন্মদিন মা,
আমি কি বলবো ভাষা খুজেঁ পাচ্ছি না,
বড় জা আর মা এসে আমাকে একটা সাজানো চেয়ারে এনে বসালো,
আমি শুধু বললাম মা আজ যে আমার জন্মদিন তোমরা জানলে কি করে?
আমার বড় জা বললো একটু ওয়েট করো সবাই আসুক তারপর বলবো।
আমি বললাম সবাই বলতে কে আসবে আর,
বলতে বলতে বেল বাজলো, বাবা বললো যাও মা তুমি গিয়ে দরজা খোল, আমি দরজা খুলে হতভম্ব, আমার মা,বাবা, বোন ওরা এসেছে।
আমি বললাম তোমরা? বোনটি বললো আমরা তোমার জন্মদিনে নিমন্ত্রিত। অবাক হয়ে আমি সবার দিকে পিছন ঘুরে তাকালাম।
সবাই হাসছে, বসতে না বসতে আবার বেল বাজলো, বাবা বললো মা এবারও তুমিই দরজা খোল,
আমি দরজা খুলে আরো বেশি অবাক হলাম, আমার সব চেয়ে প্রিয় দুই বান্ধবী ওরা দরজায় ফুলের তোড়া হাতে দাঁড়িয়ে।
এত আনন্দ আমি কোথায় রাখবো বুঝতে পারছিনা,
আমাকে নিয়ে আবার চেয়ারে বসানো হলো,
কেক কাটা হলো, সবাই কত যে গীফট দিল,
বড় জা, মা এরা আমাকে নিয়ে যা কথা বললো আমি তো অবাক,
বড় জা বললো, লাবনীকে আমি ধন্যবাদ দেই আজ তোমার কারনে আমি নিশ্চিন্তে অফিস করতে পারছি, আমি তো কেবল অফিস করছি আর তুমি আমাদের পুরো পরিবার সামলাচ্ছো। সবার সেবা করছো আমার চেয়ে ও অনেকগুন বেশি কাজ করো তুমি।
সবার উদ্দেশে বলে, কিন্তু ও বাড়িতে কাজ করে বলে আমরা ওর সঠিক মূল্যায়ন কখনো করিনি, আমি এই কয়েকদিন সংসার সামলিয়ে বুঝেছি ও কত কষ্ট করে। আমি কৃতজ্ঞ ওর কাছে।
শাশুড়ি মা ও বলে আমিও লাবনীর কাছে কৃতজ্ঞ কারণ আমি না বুঝে ওকে কখনো কখনো বকাঝোকা করেছি, কখনো বুঝতে চেষ্টা করিনি, আমি চল্লিশ বছর ধরে সংসার চালিয়েও হিমসিম খাই কখনো কখনো আর ও তো সেই দিন আসলো এ সংসারে, বাচ্চা একটি মেয়ে, কেন আমি ওর উপর এত চাপ দিচ্ছি, তুমি আমায় ক্ষমা করে দিও মা,

বাবা সবাইকে থামিয়ে দিয়ে বললো, এবার আমার একটা কথা শোন, আমার খোকা আর বৌ বিয়ের পর একা কোথাও ঘুরতে যায়নি তাই আমার ইচ্ছে ওরা কয়েকটা দিন নিজেদের মত ঘুরে আসুক।
এই নাও তোমাদের নেপালের টিকিট।
সবাই হাত তালী দিল, কিন্তু আমি কেদেঁ উঠলাম। তবে এ কান্না খুশির কান্না।

এই হলো আমার লাবনীর সংসার।

আপনার মতামত লিখুন :