শিবানী রায়ের ছোট গল্প ” একলা জীবন কাম‍্য নয়”


  প্রকাশিত হয়েছেঃ  10:57 PM, 18 August 2021

স্বাধীন জীবন কাম্য নয়


☆ শিবানী রায় ( রোজ নীল ) ☆

প্রতিদিনের অভ্যাস ঘুম থেকে উঠে এক কাপ চা খাওয়া, চা টা বাড়ির রেসমা বানিয়ে দেয়, রেসমা অনেক বছর ধরে আমাদের বাড়ি কাজ করে,
আমার স্ত্রী অসুস্থ, বাড়ির প্রায় সব কাজই রেশমা করে,
আমার বয়স হয়েছে, তবুও স্ত্রীর সেবাযত্ন আমি নিজের হাতেই করি,
এতে সবাই আমাকে বাহ্বা দেয়, সবাই বলে, স্বামী হিসাবে আমি নাকি খুব ভাল, এমন স্বামী নাকি খুঁজলে পাওয়া যাবে না, প্রায় ৩ বছর হলো আমার স্ত্রী রেবেকা বিছানা থেকে একা উঠতে পারেনা, ওর পা দুটো অবশ হয়ে গেছে, কথা বলতে পারে না। দেহটাও কঙ্কালের মত হয়ে গেছে।
সবাই আমাকে ভাল স্বামী জানলেও আমি আসলে অতটা ভাল নই, মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় ওকে ফেলে কোথাও চলে যাই,
ছেলেরা আমাদের ছেড়ে আলাদা সংসার পেতেছে, মায়ের খোঁজ প্রতিদিন একবার নেয় তবে খুব একটা আসে না, ভাই বোন আত্মীয় স্বজন সবাই যে যার নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত, কেউ কারো খবর নেয়না বললেই চলে।
যা হোক আসল কথায় আসি, ঘুম থেকে উঠে চা টা খেলাম, ওয়াসরুমের কাজ ছেড়ে ভাবলাম এবার ওকে ডাকি, কাল রাতে কিছুই খায়নি, আজ সকাল সকাল কিছু একটা খাওয়াতে হবে, একটা সময় ছিল ও সবার যত্ব নিত, আমরা তিন ভাই ছিলাম, সংসারটা বড়ই ছিল, ও গরীবের ঘরের মেয়ে ছিল বলে আমার মা ওকে দিয়ে সব কাজ করাতো, কাজ না পারলে বলতো আসছো তো ফকিরের ঘর থেকে কথা কও তো নবাবের বেডির মত, তাও বুঝতাম বাপের টাকা আছে,
ও মাঝে মাঝে কেঁদে আমাকে মায়ের নামে কিছু বলতে এলে আমি উল্টো ওকেই দু কথা বেশি শুনিয়ে দিতাম।

কিন্তু সেই আমি আজ ওর সেবা করছি, নিজেই অবাক হয়ে যাই মাঝে মাঝে ভাবি আমি কত বদলে গেছি, আমার বয়স এখন ৭২ বছর, আমিই বা কয়দিন বাঁচবো?

যাক, ওকে ডাকতে গেলাম, শরীরে হাত দিতেই আমি চমকে গেলাম, একেবারে ঠান্ডা শরীর, শক্ত হয়ে গেছে,
রেবেকা কি মরে গেছে? কখন মারা গেল? নিশ্চয় কয়েক ঘন্টা আগে, তা না হলে এতটা শক্ত হতো না,

তার মানে আমি একটা মৃত মানুষের পাশে ঘুমিয়ে ছিলাম? কেমন জানি গা টা ঘিন ঘিন করে উঠলো, তাড়াতাড়ি বাথরুমে গেলাম, শরীরে অনেক পানি ঢেলে নিজেকে পরিস্কার করে নিলাম,
সবাই ভাবছেন এ কেমন ভালবাসা? সত্যি আমারও অবাক লাগলো, ও মরে যাওয়াতে আমি কেমন যেন একটা স্বস্তি পেলাম। নিজেকে এখন বেশ স্বাধীন মনে হচ্ছে,
স্নান সেরে বের হয়ে কাজের মেয়েটিকে বললাম আর এক কাপ চা দিতে,
ও চা নিয়ে এলে আমি ওকে বললাম রেশমা মা তুমি আমার তিন ছেলেকে ফোন কর, বল, তাদের মা মারা গেছে,
রেশমা আমার দিকে হা করে তাকিয়ে রইলো, আমার স্বাভাবিক আচরনের জন্য ও বোধহয় বুঝতে পারলো না আমি সত্যি বলছি কি না। আমি বললাম, হা করে আছ কেন? তোমার আন্টি মারা গেছে।

ছেলেমেয়েরা আসলো, ওরা খুব কাদঁলো, মায়ের শেষ কাজ করলো, কিন্তু আমার কেন জানি একটুও কান্না পেল না, আমার স্বাভাবিক আচরন দেখে ওরা কিছুটা ভয় পেল বোধহয়। রেশমাকে বললাম, রেশমা আমাকে ভাত দাও, আমার খিদে পেয়েছে,
আর হ্যাঁ কালকের পর থেকে তুমি কয়েক দিন আর কাজে এস না, ছেলেদের বললাম তোমরাও চলে যাও।
ওরা বললো যে আমাকে এখানে একা রাখবে না, যে কোন এক ছেলের সাথে আমাকে যেতে হবে,
কিন্তু আমি তো যাব না কারো সাথে, কারণ আমি এখন স্বাধীন, নিজেকে কোন বাধঁনে আর বাধাঁর ইচ্ছে নাই।
আমার জেদের কারণে অবশেষে ছেলে, বৌমারা চারদিন থেকে চলে গেল।
আজ আমি ঘরে একা, সারাদিন বই,পড়লাম, এটা সেটা করে কাটিয়ে দিলাম।
বিশ্বাস করেন এতটুকুও খারাপ লাগিনি রেবেকা মারা যাওয়াতে।
কিন্তু যখন রাতে বিছানাতে শুতে আসলাম তখন বুকের ভিতর একটা কিসের কষ্ট যেন জমা হতে লাগলো, আস্তে আস্তে চোখটা কেমন ঝাপসা হয়ে এলো, এমন লাগছে কেন? কেন ইচ্ছে হচ্ছে চিৎকার করে কাদিঁ? কেন নিজেকে এত একা লাগছে? বিছানাতে এসে রেবেকাকে কেন খুঁজে বেড়াচ্ছি? ওহ্ গড আমার কাছে মনে হচৃছে একদিনেই বুঝি আমি পাগল হয়ে যাব, না, না আমি রেবেকাকে ছাড়া সত্যি বেচেঁ থাকতে পারবো না,
চাইনা আমার কোন স্বাধীন জীবন, তুমি ফিরে এসো রেবেকা, আমি আবার না হয় তোমার সেবা করবো।
প্লিজ রেবেকা আমাকে একা করে দিওনা, প্লিজ ফিরে এস।

( বৃদ্ধ বয়সে কেউ একা থাকতে চায়না, তবুও স্বামী বা স্ত্রী কেউ না কেউ একাই হয়ে যায়।)

অন্যান্য

আপনার মতামত লিখুন :