শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতারক চক্র

24

ময়মনসিংহের নান্দাইলের রাজাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী আশা মনি। গত ১১ মার্চ তার মা শিরিনা বেগমের ‘নগদ’ অ্যাকাউন্টে উপবৃত্তির টাকা আসে। এর পরপরই একটি বাংলালিংক নম্বর থেকে ফোন করা হয়। আশার মা কথা বলেন। উপবৃত্তির টাকার কথা বলে পাঠানো খুদেবার্তার (এসএমএস) চার সংখ্যার নম্বরটি (পিনকোড) বলতে বলা হয়। নম্বরটি বলার পর দেখেন, তার অ্যাকাউন্টে থাকা উপবৃত্তির টাকা আর নেই।

শিরিনা বেগম বিষয়টি বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জানান। পরে জানতে পারেন, তাদের এলাকার অন্য শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকাও একইভাবে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আমিনুল ইসলাম রতন বলেন, তাদের বিদ্যালয়টি প্রত্যন্ত এলাকায়। শিক্ষার্থীর অভিভাবকরা প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা রাখেন না। প্রতারক চক্র কৌশলে পিনকোড নিয়ে পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।রতন জানান, প্রতারক চক্র পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করায় এখন অভিভাবকদের হাতে অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণও নেই। ফলে আগামী বরাদ্দ আসার পর প্রতারকরা আবার শিক্ষার্থীদের টাকা হাতিয়ে নিতে পারে।

দেশের বেশ কয়েকটি জেলা থেকে এ ধরনের প্রতারণার খবর পাওয়া গেছে। ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নোয়াখালী, ঝালকাঠি, রংপুর, ফেনী, রাজবাড়ী ও নড়াইল জেলায় এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিক খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কেবল ময়মনসিংহ জেলা থেকেই অন্তত

১০ কোটি টাকা ‘ডিজিটাল ডাকাতি’ হয়েছে বলে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। করোনার কারণে বিদ্যালয়গুলো বন্ধ থাকায় প্রতারিত হওয়া অভিভাবকের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানাতে পারছেন না কর্মকর্তারা। তবে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক অভিভাবক অভিযোগ নিয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিসে ভিড় করছেন।

উপবৃত্তির অর্থ শিক্ষার্থীর মায়ের মোবাইল ফোনে পাঠানো হয়। মোবাইল ব্যাংকিং সেবা প্রতিষ্ঠান ‘নগদ’-এর মাধ্যমে তা পাঠিয়ে থাকে ‘প্রাথমিক শিক্ষার জন্য উপবৃত্তি প্রকল্প’ (তৃতীয় পর্যায়) কর্তৃপক্ষ। গত ১১ মার্চ উপবৃত্তির টাকা পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গে প্রতারক চক্রের সদস্যরা কৌশলে পিনকোড জেনে নেয়। এর পর তা পরিবর্তন করে টাকা হাতিয়ে নেয়।

সমকালের সঙ্গে আলাপকালে কয়েকজন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সারাদেশেই কমবেশি এ ঘটনা ঘটেছে। কোথাও অভিভাবকরা অভিযোগ করেছেন, কোথাও করেননি। এভাবে কোটি কোটি টাকা লুটে নেওয়া হয়েছে। উপবৃত্তির টাকা তিন মাস পরপর দেওয়া হয়। প্রতিবার সারাদেশে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা উপবৃত্তি হিসেবে দেওয়া হয়। এর ১ শতাংশ প্রতারণার মধ্যে পড়লেও প্রায় দেড়শ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারকরা।

দেশের ৬৫ হাজার ৬২০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক কোটি ৪০ লাখ শিশুর প্রত্যেকে প্রতি মাসে ১০০ টাকা উপবৃত্তি পায়। বছরে মোট চারবার উপবৃত্তি দেওয়া হয়। শিশুদের মায়েদের মোবাইল ফোন নম্বর দিয়ে তৈরি করা মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে এক কিস্তিতে ৩০০ টাকা করে দেওয়া হয়। আগে এই উপবৃত্তি বিতরণের কাজটি করত ‘শিওরক্যাশ’। সম্প্রতি তাদের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে ‘নগদ’কে দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি এবারই প্রথম উপবৃত্তি বিতরণ করল।

যেভাবে টাকা লুট :ময়মনসিংহের ১৩টি উপজেলায় দুই হাজার ২০৪টি বিদ্যালয়ের চার লাখ ৫০ হাজার ৯৫৫ শিক্ষার্থী এবার উপবৃত্তি পেয়েছে। ৯ থেকে ১১ মার্চ পর্যন্ত ছাড় করা হয় উপবৃত্তি। প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা পেয়েছে ৪৫০ এবং প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণির শিক্ষার্থীরা পেয়েছে ২২৫ টাকা। গত বছরের এপ্রিল, মে ও জুন- এই তিন মাসের বরাদ্দের টাকা দেওয়া হয় নগদ সেবার মাধ্যমে।

প্রতারণার শিকার বেশ কয়েক অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ‘নগদ’-এ টাকা আসার পর প্রতারক ফোন করে। বলা হয়, ‘ঢাকার হেড অফিস থেকে বলছি। আপনার অ্যাকাউন্টে যে টাকা গেছে, সে কথা কি স্কুল থেকে জানিয়েছে?’ অভিভাবকের উত্তর ‘না’ সূচক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বলা হয়, এখনই দুই হাজার টাকা দেওয়া হবে। একটি কোড যাবে, সেটি জানান। চার সংখ্যার কোডটি জানানোর পর দেখানো হয়, পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করা হয়েছে।

নান্দাইলের প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী সিদ্দিক বলেন, উপজেলায় অন্তত ৩৪ হাজার শিক্ষার্থীর উপবৃত্তি পাওয়ার কথা। প্রতারণার মাধ্যমে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীর উপবৃত্তির টাকা প্রতারক চক্র হাতিয়ে নিয়েছে বলে খবর পেয়েছেন। প্রতারিতদের শনাক্ত করে লিখিতভাবে জানানোর জন্য শিক্ষকদের বলেছেন।

ত্রিশাল উপজেলায় গত ১১ মার্চ উপবৃত্তির টাকা ছাড় হয়। গত বুধবার পর্যন্ত শতাধিক শিক্ষার্থীর উপবৃত্তির টাকা প্রতারক চক্র হাতিয়ে নিয়েছে- এমন তথ্য এসেছে স্থানীয় শিক্ষা অফিসের কাছে। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নূর মোহাম্মদ বলেন, এবারই প্রথম নগদ সেবার মাধ্যমে উপবৃত্তির টাকা দেওয়া হচ্ছে। এর আগে শিওরক্যাশের মাধ্যমে দেওয়া হতো। কৌশলে পিনকোড পরিবর্তন করে চক্রটি শিক্ষার্থীদের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

গফরগাঁও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) সালমা আক্তার ও গৌরীপুর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মনিকা পারভীন জানান, প্রতারণার মাধ্যমে উপবৃত্তির টাকা হাতিয়ে নেওয়ার খবর তারা পেয়েছেন।

ঈশ্বরগঞ্জের শিক্ষা কর্মকর্তা আনার কলি নাজনীন বলেন, অনেক শিক্ষার্থীর টাকা প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়ার খবর পেয়েছেন। কাউকে পাসওয়ার্ড না দিতে শিক্ষকদের মাধ্যমে অভিভাবকদের সতর্ক করা হচ্ছে।

ময়মনসিংহ জেলা উপবৃত্তি মনিটরিং কর্মকর্তা মো. আছাদুল্যাহ বলেন, উপবৃত্তি পাওয়া শিক্ষার্থীদের মাঝে অন্তত ১৪ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। কিন্তু প্রতারক চক্র কৌশলে পিনকোড নিয়ে মোট কত টাকা তুলে নিয়েছে, তার কোনো পরিসংখ্যান তারা পাননি। তবে ৮০ শতাংশের বেশি অভিভাবক প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ময়মনসিংহ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শফিউল হক বলেন, উপবৃত্তির টাকা হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়টি তিনি বুধবার জানতে পেরেছেন। জেলায় কী সংখ্যক অভিভাবক প্রতারণার শিকার হয়েছেন, সে বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে একটা সমাধান বের করা হবে।

গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার ভাল্লুকবেড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অন্তত চার শিক্ষার্থীর উপবৃত্তির টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা হলো- শিশু শ্রেণির তুহিন, প্রথম শ্রেণির মুন্নি ও আলামীন এবং চতুর্থ শ্রেণির ইতি রানী।

সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার জাঙ্গাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থীর উপবৃত্তির টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। তারা হলো- তামীম আহমেদ, সুমাইয়া আক্তার তান্নি ও তাসলিমা বেগম। এভাবে ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার সদরদী রায়পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার ২১২ নম্বর পূর্ব মল্লিকডুবা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঢাকার কেরানীগঞ্জ উপজেলার ৫৫ নম্বর কালিগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার ৩৭ নম্বর কুরুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একই জেলার বাসাইল উপজেলার রাশড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মির্জাপুর উপজেলার আজগানা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলার বাখরনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার লাফনাউট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মৌলভীবাজার সদর উপজেলার শহীদ জিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রাজনগর উপজেলার বাবুরবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও হংসখলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার বাদুড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাত-আটজন শিক্ষার্থীর টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

কুষ্টিয়া সদর উপজেলায় একটি বাংলালিংক নম্বর থেকে ফোন দিয়ে পিনকোড জেনে নিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। দেশের প্রায় সব উপজেলা থেকেই এমন প্রতারণার খবর পাওয়া গেছে। একটি উপজেলার কিছু স্কুলে এভাবে প্রতারণা করা হয়েছে; সব স্কুলে হয়নি।

প্রকল্প কর্মকর্তারা যা বলেন :’প্রাথমিক শিক্ষার জন্য উপবৃত্তি প্রকল্প’ (তৃতীয় পর্যায়)-এর প্রকল্প পরিচালক ইউসুফ আলী সমকালকে বলেন, দেশের বেশ কয়েকটি স্থান থেকে উপবৃত্তির টাকা লুটে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিভাবকদের অসচেতনতার কারণেই এমনটি ঘটেছে।

তিনি বলেন, সরকারি অর্থ দ্বিতীয়বার তাদের দেওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই। কাউকে পিনকোড বা পাসওয়ার্ড না দিতে অভিভাবকদের মাঝে টেলিভিশনের মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার চালাতে ‘নগদ’কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ঘটনা জানার পর গতকাল তার অফিসে বৈঠক করে সারাদেশের উপবৃত্তি মনিটরিং অফিসারদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রতিটি এলাকায় অন্তত পাঁচটি উঠান বৈঠক করে মায়েদের সচেতন করতে।

প্রকল্পের সহকারী পরিচালক (পরিকল্পনা ও মনিটরিং) কবির উদ্দিন বলেন, যেসব ফোন নম্বর থেকে অভিভাবকদের ফোন দিয়েছিল প্রতারকরা, তা আমাদের দিলে আমরা পুলিশকে জানাতে পারি।

‘নগদ’-এর হেড অব পাবলিক কমিউনিকেশন জাহিদুল ইসলাম সজল সমকালকে বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। আমরা খেয়াল করছি, কিছু অসাধু ব্যক্তি গ্রামের সহজ-সরল মানুষকে কথার ফাঁদে ফেলে বা মিথ্যা তথ্য দিয়ে তাদের কাছ থেকে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের অ্যাকাউন্ট নিয়ে অ্যাকাউন্টে থাকা অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। প্রযুক্তিগত সেবা হওয়ায় কোনো গ্রাহক যদি তার অ্যাকাউন্টের পিন নিজেই দিয়ে দেন, তাহলে সেখানে আমাদের কিছুই করার থাকে না। এ জন্য আমরা গ্রাহকদের সচেতন করতে বিভিন্ন ধরনের প্রচার চালাচ্ছি ৷’সূত্র :দৈনিক সমকাল