শরণখোলায় পানির জন্য দিশেহারা মানুষ

21

শরণখোলা প্রতিনিধি:বিধবা ফরিদা বেগম (৪৫)। তিনি উপজেলার উত্তর রাজাপুর এলাকার বাসিন্দা মৃত, আব্দুল ছত্তার হাওলাদারের স্ত্রী। মানুষের বাড়িতে ঝি-এর কাজ করে দিন চলে তার। দিন শেষে কিছু খাবার যোগাড় করতে পারলেও সুপেয় পানি জুটাতে ছুটতে হচ্ছে বহুদূরে। পবিত্র রমজান মাসে প্রচন্ড খরতাপের কারণে পানি সংকট প্রকটরুপ নিয়েছে। তিনি অন্যের বাড়ির কাজ ফেলে রেখে এক কলসী পানি নিতে (বুধবার) দুপুরে পার্শ্ববর্তী গ্রামের গাজী বাড়ির সরকারি পুকুরে আসেন। সেখানে বিভিন্ন এলাকার অন্য লোকজনের ব্যাপক ভীড় থাকায় প্রায় এক ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে তাকে। কোন উপায় নেই, কারণ রোজা খুলতে হলে প্রথমই পানির দরকার কিন্তু পুকুরের পানি কমে যাওয়ায় বাড়ির মালিক পানি দিতে চান না। যেকারণে ফরিদার মতো উপজেলার বহু নারী-পুরুষ পানি সংগ্রহ করতে শুস্ক মৌসুমে এখন দিক-বিদিক ছুটাছুটি শুরু করেছেন।

অনুসন্ধানে জানাগেছে, শরণখোলা উপজেলা জুড়েই পানি সংকট দেখা দিয়েছে। নদীর পানি লবনাক্ত, গভীর নলকূপ গুলোও অকেজ। অনাবৃষ্টি, সরকারি পুকুর খননে অনিয়ম, ঘূর্ণিঝড় সিড়র পরবর্তী এনজিও ভিত্তিক পানির প্রকল্প লোক দেখানো, এলাকা ভিত্তিক বাজার জাতকরা বিশুদ্ধ পানির গুণগত মান প্রশ্নবিদ্ধ, দীর্ঘদিন ধরে পুকুর ও খাল খনন না করা, সরকারি পুকুর, খাল-বিল ও জলাশয় বেদখল হওয়াসহ নানা কারণে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার পুকুরের পানি শুকিয়ে গিয়ে এখন তলানিতে ঠেকেছে। তাই বাধ্য হয়ে স্থানীয়রা দূষিত পানি পান করছেন। এরফলে ডায়রিয়া, আমাশয়, চর্মরোগসহ নানা রকমের পানি-বাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকে।
উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী মেহেদী হাসান বলেন, শুস্ক-মৌসুমে নলকূপের পানি শুকিয়ে যাওয়ার কারনে পন্ড স্যান্ড ফিল্টার (পিএসএফ) ও রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং-এর উপর নির্ভর করতে হয় এ অঞ্চলের মানুষের। উপজেলার চারটি ইউনিয়নে ১১ শতাধিক পিএসএফ থাকলেও তার অধিকাংশ অকেজো। এছাড়া পুকুরের পানি শুকিয়ে যাওয়ায় অন্য পিএসএফ গুলোও ব্যবহারে অনুপোযোগী হয়ে পড়েছে। যার কারণে চরম পানি সংকট চলছে। তবে, আমরা ভ্রাম্যমাণ মোবাইল ট্রিটমেন্ট প্লান্টের মাধ্যমে সাময়িকভাবে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বিনা-মূল্যে খাবার পানি সরবারহ কার্যক্রম শুরু করেছি।
শরণখোলা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ফরিদা ইয়াছমিন জানান, ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে ২০ এপ্রিল (মঙ্গলবার) ২১ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এনিয়ে গত ১ এপ্রিল থেকে এ পর্যন্ত শতাধিক মানুষ স্বাস্থ্য-কমপ্লে¬ক্সে ভর্তি হলেও আক্রান্তের সংখ্যা অনেক বেশি। উপজেলার উত্তর রাজাপুর গ্রামের বাসিন্দা খলিল গাজী, শাহজাহান শিকারী, জাকির গাজীসহ অনেকে বলেন, রৌদ্রের ব্যাপক তাপে তাদের এলাকার খাল-বিল, পুকুর সব শুকিয়ে গেছে। ৪/৫ মাইল পথ পায়ে হেঁটে গিয়েও অনেকে পানি পাচ্ছেন না। প্রায় পাঁচ মাস ধরে বৃষ্টির দেখা নেই। মানুষ এখন পানির জন্য ছুটাছুটি করছেন। পানি সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানান তারা।
৩নং রায়েন্দা ইউনিয়নের ১নং- উত্তর রাজাপুর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য জাকির হোসেন খান বলেন, তার ওয়ার্ডের অধিকাংশ পুকুর-খাল ও জলাশয় এখন পানি শুন্য। সাধারণ মানুষ ৩/৪ মাইল পথ হেঁটে পানি আনেন কিন্তু তাও জীবাণু মুক্ত না। ওই সব দূষিত পানি পান করে অনেকে ইতিমধ্যে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলা আওয়ামীলীগের এক নেতা বলেন, বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে ৩৫/১ পোল্ডারের বেড়িবাঁধ নির্মাণে ধীরগতি, জেলা পরিশোধের তত্বাবধানে সরকারি পুকুর খননে অনিয়ম, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকির অভাবে টিওবয়েলসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সরকারি-বেসরকারিভাবে স্থাপিত (পিএসএফ) গুলো অকেজো এবং খাল-বিল ও জলাশয় দখলের প্রতিযোগীতা বেড়ে যাওয়ায় প্রতি বছর শুস্কু-মৌসুম এলে পানির জন্য এ অঞ্চলে হাহাহার দেখা দেয়। কিন্তু তাতেও ঘুম ভাঙ্গেনা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। এছাড়া সিড়র পরবর্তী সময়ে গত এক যুগে বিভিন্ন দাতা সংস্থার অর্থায়নে শরণখোলা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নির্মিত পানির প্রকল্পগুলো ছিলো অনেকটাই লোক দেখানো ও নি¤œ মানের।
এ ব্যপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সরদার মোস্তফা শাহিন জানান, উপজেলার সর্বত্র পানি সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য ইতোমধ্যে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিত ভাবে জানানো হয়েছে।