শরণখোলায় অবৈধ করাত কলের ছড়াছড়ি!

23

শরণখোলা (বাগেরহাট) প্রতিনিধি:বাগেরহাটের শরণখোলায় লাইসেন্স বিহীন অবৈধ করাত কলের ছড়াছড়ি শুরু হয়েছে। সুন্দরবন থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে এই করাত কলগুলো বসানোর কারণে ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর উপজেলা প্রশাসন ও বনবিভাগ এক যৌথ অভিযান চালিয়ে বন সংলগ্ন উপজেলার বিভিন্ন এলাকার ৫টি করাত কল বন্ধ করে দেয়।

পরে বন-বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জের পক্ষ হতে করাতকল আইনে ওই পাঁচ কল মালিকের বিরুদ্ধে পৃথক পাঁচটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলা দেওয়ার পর মিলগুলো কিছুদিন বন্ধ থাকলেও কয়েক দিন পর করাত কলের মালিকরা আইনকে চ্যালেঞ্জ করে পুনরায় কাঠ চেরাই শুরু করেন।
সম্প্রতি অবৈধ করাত কলের বিষয়ে উপজেলা সদর রায়েন্দা বাজার এলাকার বাসিন্দা আব্দুল হক আকনের ছেলে মো. সোহাগ আকন বাগেরহাট জেলা প্রসাশক, বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন দপ্তরে একাধিক অভিযোগ দায়ের করেন। জনবসতিপুর্ণ এলাকাসহ অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঘেঁষে এসব অবৈধ করাত কল রাতারাতি স্থাপন করা হলেও প্রশাসনসহ বন-বিভাগের পক্ষ থেকে তেমন কোন উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি।
খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, সুন্দরবন থেকে ১০ কিলোমিটারের মধ্যে করাত কল স্থাপনের বিধান না থাকলেও তা মানছে না বনসংলগ্ন এলাকার প্রভাবশালীরা। অভিযোগ রয়েছে, বন বিভাগ ও প্রশাসনের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বিশেষ ব্যবস্থায় ম্যানেজ করে রাতারাতি স্থাপিত হচ্ছে এসব স-মিল। এছাড়া বন-সংলগ্ন এলাকার করাত কলগুলোর কারণে গত ২০ বছরে সুন্দরবনের সুন্দরী, গেওয়া, গরানসহ মুল্যবান সম্পদ উজাড়ের পাশাপাশি সামাজিক বনায়নের নানা প্রজাতির বহু গাছ ইতিমধ্যে উজাড় হয়েছে। তবে বনাঞ্চলসহ পরিবেশ রক্ষায় উপজেলা প্রসাশনের একটি কমিটি থাকলেও তার কোন কার্যক্রম নেই ।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, স’মিল মালিকরা বন-বিভাগ, প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কোন প্রকার অনুমতি ছাড়াই রাতারাতি স-মিল বসিয়ে সুন্দরীসহ নানা প্রজাতির কাঠ চেরাই শুরু করেন। এরা এতো ক্ষমতা কোথায় পায় তা জানি না। তবে, মালিকরা প্রভাবশালী হওয়ায় এদের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না। এরা বনের বিভিন্ন প্রজাতির মুল্যবান কাঠ চেরাই করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গোপনে পাচার করছে। এছাড়া সুন্দরবনের চার-পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে প্রশাসনের নাকের ডগায় এই মিলগুলো বসিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তারা বিভিন্ন প্রকার কাঠ চেরাই করে আসছে। মামলা হওয়া সত্বেও তারা থেমে নেই। এমনকি সম্প্রতি উপজেলার কাসেমুল উলুম কওমী মাদ্রাসা সংলগ্ন নলবুনিয়া, সিং-বাড়ী, তাফালবাড়ী কলেজ সংলগ্ন সেলিম হাওলদার, দক্ষিন মালিয় রাজাপুর স্কুল সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা মো. ছগির আকনসহ গত এক বছরে উপজেলার অনেক বাসিন্দা অবৈধ ভাবে একাধিক করাত কল স্থাপন করলেও রহস্যজনক কারণে তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না বন-বিভাগ ও প্রশাসনের কেউ।
এ বিষয়ে সুন্দরবনসহ ব্যবস্থাপনা কমিটির কোষাধ্যক্ষ ফরিদ খান মিন্টু বলেন, নিয়ম নীতির বাইরে কিভাবে করাত কল গুলো স্থাপিত হয় তা আমার বোধগম্য নয়। তবে, প্রভাবশালী চক্রের লাগাম টানতে বন-বিভাগসহ প্রশাসনের আরো কঠোর হওয়া প্রয়োজন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে করাত কল মালিক উপজেলার তাফালবাড়ী বাজার ব্যবসায়ী মো. আলাউল আহসান সেলিম বলেন, আইনকে অবজ্ঞা করা কিংম্বা অবৈধ ভাবে করাত কল স্থাপনের বিষয়টি সঠিক না। তবে, আমাদের কোন কাগজপত্র না থাকলেও লাইসেন্স পাওয়ার জন্য ইতিমধ্যে বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করেছি ।
এ ব্যাপারে, সুন্দরবন পুর্ব বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বনসংরক্ষক (এসএিফ) মো. জয়নাল আবেদীন জানান, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে করাত কল বা কোনো প্রকার মিল, কলকারখানা স্থাপন নিষিদ্ধ। তবুও শরণখোলা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কিছু করাত কল বসিয়েছে। সম্প্রতি পাঁচটি করাত কলে অভিযান চালিয়ে তা বন্ধ করে দেয়ার পরও আইন অমান্য করে মিলগুলো চালু করেছে মালিকরা। এদের বিরুদ্ধে পুনরায় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
শরণখোলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সরদার মোস্তফা শাহিন বলেন, মিলগুলো বন্ধ করে মামলা দেওয়ার পরও ফের চালু করায় তারা আইনকে অবজ্ঞা করেছে। তবে, নুতন ও পুরাতন সকল স-মিল মালিকদের ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়া হবে।