শরণখোলার অনেকে জেলের কপালে দুঃচিন্তার ভাজ

22

>>সরকারি সহায়তার তালিকা তৈরিতে স্বজনপ্রীতি আত্মীয়করণ ও দলীয়করণ
>>দাদনের জালে জড়িয়ে এলাকা ছাড়ার কথা ভাবছেন অনেকে

শরণখোলা প্রতিনিধি:কবির হোসেন মৃধা (৫৫), পেশায় একজন জেলে, বলেশ্বর নদী ঘেঁষা উপজেলার সাউথখালী ইউনিয়নের রায়েন্দা গ্রামের বাসিন্দা তিনি। এক সময় তাদের বহু সহায়-সম্পত্তি ছিল, সময়ের বির্বতনে ভাঙ্গনের ফলে বাড়ি-ঘরসহ সবকিছু গিলে নিয়েছে বলেশ্বর। যেকারণে এখন তিনি সর্বহারা। তাই কোন উপায় না থাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে ৩৫/১ পোল্ডারের বেরিবাঁধের পাশে অন্যের জমিতে কোন মতে মাথা গুজেছেন। তবে, জীবন-জীবিকার তাগিদে স্থানীয় এক ইউপি সদস্যের কাছ থেকে দাদন নিয়ে দীর্ঘ ২৮ বছর নদী ও সাগরে ইলিশ শিকার করে আসলেও ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে পারেনি তিনি। তবে, দাদনের জালে জড়িয়ে কবিরের মতো অনেক জেলে নিঃস্ব হয়েছেন। তবে ভাগ্য পাল্টে গেছে উপকুলীয় এলাকার সুধী মহাজনদের। সম্প্রতি সমুদ্রে মাছ শিকারের নিষেধাজ্ঞায় কপালে যেন দুঃচিন্তার ভাঁজ পড়েছে কবিরসহ ওই এলাকার অনেক জেলের।
খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, প্রজননসহ সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণের জন্য ২০ মে হতে আগামী ২৩ জুলাই পর্যন্ত দেশের সমুদ্র সীমায় ইলিশসহ সব ধরণের মাছ আহরণ নিষিদ্ধ করে মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়। কিন্তু এমন কর্মসূচি মানতে নারাজ উপকুলীয় অঞ্চলের জেলেরা। কবির ছাড়াও স্থানীয় অন্যান্য জেলেরা বলেন, আমাদের অর্থনৈতিক দৈন্য-দশার কথা বিবেচনা করে ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা বাতিল করা প্রয়োজন। এছাড়া মার্চ-এপ্রিল দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার মাত্র তিন সপ্তাহ পর নতুন করে ৬৫ দিনের অবরোধ দেয়ার ফলে সমুদ্রে মাছের জীবন রক্ষা হলেও বিপন্ন হতে চলছে আমাদের (জেলেদের) জীবন।
আলাপকালে জেলে কবির আরো জানান, স্যার নদীর পাশেই আমাদের জন্ম, প্রাকৃতিক নানা দুর্যোগের সাথে প্রতিনিয়ত লড়াই করে পরিবার পরিজন নিয়ে বাঁচতে হয় আমাদের। নদীর কিনারে থাকতে গিয়ে অনেকের মরণও হয় নদী কিংম্বা সাগরে। তাছাড়া নদীতে গেলে আমাদের সংসার চলে, না গেলে চুলা জলে না। এমনকি আমাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগও নেই। আমাদের খবর কেউ রাখে না, দীর্ঘ ২৮ বছরে ভাগ্য বদলায়নি, আপনারা লিখলে আর কি হবে ? গত দু’বছর ধরে সাগরে তেমন মাছ না পাওয়ার কারণে লোনসহ দাদনের এক প্রকার পাহাড় জমা হচ্ছে। পুর্বের টাকা পরিশোধ করতে পারিনি। তারপরও এবছর মহাজন ছাড়াও নুতন করে ৪টি (এনজিও) থেকে আরো দুই লাখ টাকা লোন নিয়ে নৌকা জাল ট্রলারসহ প্রয়োজনীয় মালপত্র গুছিয়ে সাগরে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়েছি। কিছু দিন আগে দু’মাসের অবরোধ গেল, এখন আবার শুনি ৬৫ দিনের অবরোধ। এভাবে চলতে থাকলে পেশা টিকবো ক্যামনে-প্রশ্ন করেন তিনি। পাশাপাশি আমি কার্ডধারী জেলে হয়েও সরকারি সহায়তা থেকে নয় বছর ধরে বঞ্চিত। অথচ জেলে না হয়েও অনেকে পাচ্ছেন সরকারি সহায়তা। কবিরের মতে, অবরোধ কালীন সময় কাজের বিনিময় ব্যাংক কিংম্বা মোবাইল একাউন্টের মাধ্যমে সরকারি অফিসার নিয়োগ করে জেলেদের মজুরীর টাকা দেয়া হলেও সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যান-মেম্বাররা জেলেদের নামে বরাদ্ধকৃত চাল লুট-পাট করার সুযোগ পেত না।
অপরদিকে, জাতীয় মৎসজীবী ট্রলার মালিক সমিতি শরণখোলা উপজেলা (শাখার) সভাপতি ও ব্যবসায়ী আবুল হোসেন বলেন, ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, এটা কোন ভাবে মেনে নেওয়া যায় না। এছাড়া সরকারি নির্দেশের পর উপকুলীয় জেলেরা মাছ ধরা বন্ধ করলেও ভারতসহ দেশের একাধিক প্রভাবশালী চক্র ট্রলির মাধ্যমে সমুদ্র হতে প্রতিনিয়ত মৎস্য সম্পদ লুট করে যাচ্ছে কিন্তু মাঝখান হতে আমরা সাধারণ জেলে ও ব্যবসায়ীরা চরম ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। এমন অবস্থা চলতে থাকলে দাদনসহ লোনের বোঝা মাথায় নিয়ে সাধারণ জেলে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হবে এবং এ পেশায় শ্রমিক সংকট দেখা দেবে। এছাড়া জেলে তালিকায় ব্যাপক গরমিল থাকায় প্রকৃত জেলেরা সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা আমাদের কোন মতামত না নিয়ে মনগড়া ভাবে তালিকা তৈরি করায় স্বজনপ্রীতিসহ দলীয় ও আত্মীয়করণ করছে এবং দুই মাসের জন্য সরকারি সহায়তার ৮৫ কেজি চাল একটি জেলে পরিবারের তেমন কোন উপকারে আসে না বলে মন্তব্য করেন ওই মৎস্য নেতা।
এ বিষয়ে শরণখোলা উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা এম.এম. পারভেজ জানান, জেলেদের দাবি যৌক্তিক নয়। বিগত দিনে অবরোধের কারণে সমুদ্রের মাছ শিকার বন্ধ থাকায় উৎপাদন ইতিমধ্যে কয়েক গুন বৃদ্ধি পেয়েছে। তাছাড়া চোরাইপথে যাতে কেউ মৎস্য সম্পদ লুট করতে না পারে সেজন্য বাংলাদেশের জলসীমায় নৌবাহিনীর বিশেষ নজরদারী রয়েছে। তাছাড়া জেলে পরিবারগুলোর জন্য নগদ টাকাসহ সরকারি সহায়তা যাতে আরো বৃদ্ধি করা যায় সেজন্য উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে কেউ মাছ শিকার করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।