যশোরের ভৈরব নদের ইতিহাস-ঐতিহ্য

একটি মাঠ পর্যায়ের প্রাথমিক সমীক্ষা প্রতিবেদন

জহিরুল হকজহিরুল হক
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  09:44 PM, 01 September 2021
ফাইল ছবি

ধীরে লয়ে বয়ে যায় অযুথ ভৈরব। ঠিক পঞ্চাশ বছর আগে একথা পরিপূর্নভাবে সত্য ছিল। যারা নীলাকাশের নীচে প্রকৃত মনুষ্য জীব হয়ে যশোর জেলা নামক অঞ্চলে বসবাস করেছিলেন বা করতেন, তারা তাদের অনেকেই চাক্ষুষ প্রমাণ হয়ে কালের সাক্ষী স্বরূপ এখনও দাড়িয়ে আছেন। মোহাম্মদপুর নগরের হরিনাথ থেকে শুরু করে হরিনাকুন্ডুর কাঙ্গাল হরিনাথ সকলেই বটবৃক্ষের মত ছায়া-মায়া পেয়েছে এই ভৈরবের তীরে। যেমন শীলা রায় চৌধুরীর বিরামপুরের অবিরাম আশ্রায়ন বর্তমানে ছোট বাচ্চাদের স্কুল রূপে এবং তেমনি কিছুটা বেদখলদারদের দখলে চলমান আমাদের এই ভৈরব নদ।

প্রমত্তা বা কীর্তিনাশা নয়, সুফলা ভৈরব খেজুর গাছের বর্ধনকে ফেমাস করেই খ্যান্ত দেয়নি, কই মাছকেও ফেমাস করেছে। ভৈরব একটি নদীর নাম শুধু নয়, একটি সং¯ৃ‹তি সভ্যতার ইতিহাসও, একটি জ্বলন্ত অঙ্গার, মাতাময়ী দুর্গা আবার কখনো শিব। ভৈরব কখনো মরা ভৈরব, কখনো বুড়ি ভৈরব নামে যশোর জেলার মধ্যে সাপের মতন আঁকাবাকা পথ ধরে খুলনা হয়ে পশুর নদীর সাথে মিলিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে “হারিয়ে” গিয়েছে। ’হারিয়ে যাওয়া’অর্থটা এখানে আসলেই মিশে যাওয়া নয়, হারিয়ে যাওয়াই বুঝানো হয়েছে। কারণ বর্তমানে যশোরের অভয়নগর থানার নওয়াপাড়ার আগ পর্যন্ত যে ভৈরব, তাঁর কোনো মহাপুরুষের মতন শৌর্য-বীর্য নেই। খাঁন জাহান আলীর সময় বারোবাজার অঞ্চল এবং হামিদপুরের বালুর ঘাট, বালিয়াডাঙ্গা, ইত্যাদি সব ভৈরবের জলে থৈ থৈ করত এবং বড় বড় জাহাজ, লঞ্চ, স্টীমার চলাচল করত। কথিত আছে, বড়পীর খাঁন জাহান আলী (রঃ) একবার নামাযরত অবস্থায় ছিলেন আর তখন প্রচন্ড বন্যায় সব ভেসে যাচ্ছিল। পীর সাহেব নামায পড়ছিলেন ভৈরব নদীর তীরে, তিনিও ভেসে যাওয়ার উপক্রম হতেই, তিনি তার লাঠি দিয়ে পানিতে বাড়ি মারলেন, তৎক্ষনাৎ আকস্মাৎ সব থেমে গেল কিন্তু বড়ো বাঁধ তৈরী হয়ে গেল ভৈরব নদীতে। সেই বাঁধ নাকি বর্তমানের নওয়াপাড়ার কাছাকাছি। লোকায়ত এই কাহিনীর পাশাপাশি আরেক কাহিনী হলো মাছ ব্যবসায়িরা তৈরী করে এই বাঁধ। বর্তমানে নওয়াপাড়া থেকে খুলনার দিকে ভৈরবে এখনও বড় বড় কয়লা ও পাথর বহনকারী লঞ্চ, স্টীমার চলাচল করে নিয়মিত কিন্তু নওয়াপাড়ার এপাশে যশোরের দিকের ভৈরব নদী শুকিয়ে যেতে যেতে ক্ষীনকায় লতার আকার ধারন করেছে। যদিও এর পেছনে শুধু প্রাকৃতিক বিপর্যয়ই দায়ী, তাই নয়, মনে করা হয়, মানুষের দখল ও মাছ চাষ নামক অবৈধ লিজিং সহ বহু লোভ-লালসার, কামনা-বাসনার করাল গ্রাসে আজ মৃতপ্রায় শান্ত পানির ভৈরব নদ। যদিও খুলনা নগরীর অবস্থান বলতে ভৈরব নদীকে ব্যবহার করা হয় কিন্তু সেটা শেষের অংশ আর প্রকৃত ভৈরবের উৎপত্তি কুষ্টিয়ার পদ্মা নদীর উপশাখা নদী গড়াইয়ের উপনদী নবগঙ্গা যেটা মাগুরাকে ঘিরে বয়ে চলেছে তারই হাত ধরে যশোরে পদার্পণ করেছে। তাই বলা যায় ভৈরবের প্রকৃত অবস্থান যশোর। ভৈরব যশোরের নদী। আমরা যশোরের মানচিত্রে নদীর অবস্থান দেখলে দেখবো যশোরকে চতুর্দিক দিয়ে অক্টোপাসের মত জড়িয়ে ধরে আছে। যদিও সবাই যশোর বলতে বোঝে কপোতাক্ষ নদের কথা। কিন্তু কপোতাক্ষ নদ এক দিকের একটি অংশ মাত্র, যেমন মানুষের ডানহাত মানে পুরো মানুষ নয়, তেমনই কপোতাক্ষ মানে যশোর নয়, কিন্তু ভৈরব হলো হৃদয়, যশোরের প্রতিটি উপজেলায় যার সদা পদচারনা বর্তমান (পূর্বে আরো ভালো স্বাস্থ্যবান ছিল)। মহাকবি মাইকেল মধুসুদন দত্ত ‘কপোতাক্ষ নদ’ নামক বিখ্যাত সনেট রচনা করার কারণে, আজ সারা বিশ্বে যশোর কপোতাক্ষ নদের তীরে অবস্থিত বলে সুপরিচিত। বাংলাদেশের সমস্ত নদীই উত্তর দিক থেকে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত।

সাহিত্যিক উপাদানঃ

অদ্বৈত মল্লবর্মন তার অমর কথামালা গেথেছেন ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ নামক উপন্যাসে, সেখানে নির্দিধায় আমরা ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার তিতাস নদীর চেতন-অবচেতন মনের উম্মুখাকাঙ্খা দেখতে পাই স্বচ্ছপানির আয়নায়। ঠিক সেভাবে ভৈরবের জলছবি আঁকা হয়নি আজ পর্যন্ত। যদিও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যিনি বিশ্বকবি হিসেবে পরিচিত, তিনি তার প্রথম উপন্যাস ‘বৈঠাকুরনের হাট’ এ যশোরের রাজা প্রতাপপাদিত্য এবং যশোরের চাঁচড়া জমিদার বাড়ীর পুকুর ঘাটের অবস্থানকে তুলে ধরেছিলেন কিন্তু পদ্মার বোটের মতন ভৈরবের বোট আঁকতে পারেনি কেন, তা আজ অবান্তর কারণ তিনি কাল প্রয়াত। অবশ্য রবী ঠাকুরের নৌকা হয়ত গড়াই ছেড়ে ভৈরবে ঢুকতে পারিনি, এটা ভূ-তত্ত্ববিদদের নীরিক্ষায় বের হয়ে আসতে বাধ্য যে, তৎকালীন সময়ে নবগঙ্গার যুথ গুলো কি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাছাড়া যেখানে মাইকেল কপোতাক্ষ নদ নিয়ে লিখতে পারলেন পুরো একটি কবিতা, সেখানে একটি লাইনও কেন ভৈরবের জন্য উৎসর্গ করতে পারলেন না “রবি ঠাকুর” তা প্রশ্নই রয়ে গেল। অবশ্য, বর্তমানে কাজী শাহেদ আহমেদ একটি উপন্যাস লিখেছেন “ভৈরব” নামে।

হয়ত বিধি-বাম,! যশোর সাহিত্য-সংস্কৃতির জন্য বহু প্রাচীন কাল থেকেই বিখ্যাত। অনেক কবি সাহিত্যিকের জন্ম এখানে; এই ভৈরবের তীরে মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, কাজী কাদের নওয়াজ, গোলাম মোস্তফা, ফররুখ আহমেদ, হাজী মোহাম্মদ মোহসীন, মুন্সী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ, আব্দুল হাই, রেজাউদ্দিন স্টালিন, আব্দুল মান্নান তালিব, শমসের আলী, মোজাম্মেল হক, আলী আনসারী, মাইকেল মধুসুদন দত্ত, সতীশ চন্দ্র মিত্র, বিমল কর, নীহারঞ্জন গুপ্ত, কাসেম আবু বকর প্রমুখ। হতে পারে, তাদের লেখায় ভৈরবের কথা উঠে এসেছে। তারা তাদের রচনায় বহুস্থানে ভৈরব নদীর রূপের বর্ননাও করেছেন কিন্তু তা কালোত্তীর্ন না হওয়ায় কপোতাক্ষ নদের মতন আমাদের চক্ষু সম্মুখে প্রবাহিত নয়। যদিও বর্তমান কপোতাক্ষ নদের প্রকৃত অবস্থান ৭৬টি ব্রিজের চাপে ন্যুব্জ আর পুরো মরুভূমিতে পরিনত হওয়ার উপক্রম, যা দু’কুলবাসীকে কান্নার জোয়ারে হাফিয়ে তুলেছে। সে আরেক শেক্সপিরীয় ট্রাজেডী। আর ভৈরব নদীর অবস্থান এর দুঃখ গাঁথা বলতে গেলে অং ুড়ঁ ষরশব রঃ এর কমেডিধর্মী দ্ব্যার্থ বোধক শেক্সপিরীয় প্রহসনে ফিরে যেতে হয়। ১৯১৪ সালে প্রকাশিত সতীশ চন্দ্রের লেখা ’যশোর-খুলনার ইতিহাস’ গ্রন্থে যশোরের এ নদীর গতি-প্রকৃতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।

ইতিহাস ঃ

ভৈরব নদ বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাংশের একটি নদ। ভৈরব নদের তীরে খুলনা ও যশোর শহর অবস্থিত। এছাড়া এর তীরে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ন শহর গুলোর মধ্যে রয়েছে মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, বড় বাজার (বারোবাজার), কোটচাঁদপুর, চৌগাছা, দৌলতপুর ও বাগেরহাট। হিন্দুদের কাছে নদীটি পবিত্র হিসেবে সমাদৃত। নদীটির নাম ‘ভৈরব’ এর অর্থ ভয়াবহ। এক সময় গঙ্গা/পদ্মা নদীর মূল প্রবাহ এই নদকে প্রমত্তা রূপ দিয়েছিল, সেই থেকেই নামটির উৎপত্তি। নদটির দুইটি শাখা রয়েছে ইছামতি নদী এবং কপোতাক্ষ নদ। খুলনা-ইছামতির কিছু অংশ ভারতে এবং বাকীটুকু বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলায় পড়েছে-এই নদীটি সেখানে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমানা নির্দেশ করে। ভৈরব নদীটি তার যাত্রাপথে একেক স্থানে একেক নাম নিয়েছে। কালীগঞ্জ হতে কৈখালী পর্যন্ত নদীটির নাম ‘কালিন্দি’। এর পর এটি ‘রায়মঙ্গল’ নামে পরিচিত। তারপর নদীটি দুইভাগে ভাগ হয়ে যায়। পশ্চিমের অংশটি ‘হাড়িভাঙ্গা’ এবং পূর্বেরটি ‘ভৈরব’ নামে প্রবাহিত হয়। কৈখালীর পর নদীটি ‘খুলনা-ইছামতি’ নামে প্রবাহিত হয়। দক্ষিণের অংশটি ‘রায়মঙ্গল হাড়িভাঙ্গা নামে পরিচিত। ভৈরব নদীটির মোট দৈর্ঘ্য ২৫০ কিলোমিটার। বর্তমানে নদটির অনেকাংশ শুকিয়ে গিয়েছে। যশোর জেলার বাঘারপাড়া উপজেলা পার হলে নদীটির আর নাব্য থাকে না। বর্ষা মৌসুমে এটি নাব্য থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে নদীটি শুকিয়ে যায়। তবে নদটির নিচের দিকের অংশে জোয়ার ভাটা হয় ও তা সারা বছর নাব্য থাকে। যশোরের অন্যান্য নদী হলো Ñ চিত্রা, কপোতাক্ষ, চেতনা, যুক্তেশ্বরী (বাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ খন্ড-৪, প্রধান সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম, লেখক, মোহা. শামসুল আলম এবং মাসুদ হাসান চৌধুরী, পৃ.  ৪৮৩-৮৬, ২০১৪, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি,ঢাকা)। যশোরের অন্যান্য নদী হলো: আপার ভৈরব, লোয়ার ভৈরব, চিত্রা, বেগতী, নবগঙ্গা, চন্দনা, কপোতাক্ষ, বারাসিয়া, খোলপটুয়া, এলেংখালি, পানগুবি, করা, কালীগঙ্গা, কাঠিপোতা, দড়াটানার খাল, মরিছাপ, চাঁদখোনি, পাংগানি, নাইনগত সমুদ্র, বড় পাঙ্গা, কুমার, বড় গাংদিয়াদহ, আমলা মদরপুর, ডাকোয়া, মরাগড়াই, পালং, আত্রাই প্রভৃতি।

 

নদীর নাম

মোট দৈর্ঘ্য

প্রবাহিত এলাকা

বেতনা-খোলপটুয়া

১৯১

যশোর (১০৩),  খুলনা (৮৮)

ভদ্রা

১৯৩

যশোর (৫৮), খুলনা (১৩৫)

ভৈরব

২৫০

যশোর , খুলনা

চিত্রা

১৭০

কুষ্টিয়া (১৯) , যশোর (১৫১)

গড়াই-মধুমতি-বলেশ্বর

৩৭১

যশোর (৯২), কুষ্টিয়া(৩৭) খুলনা (১০৪)

কপোতাক্ষ

২৬০

যশোর (৮০), খুলনা (১৮০)

কুমার

১৬২

যশোর,  ফরিদপুর

নবগঙ্গা

২৩০

যশোর (২০৪), কুষ্টিয়া (২৬)

(উৎস: স্ট্যাটিসটিকাল ইয়ার বুক অব বাংলাদেশ ১৯৯৮)

এছাড়া খালধার রোড, দড়াটানা, রাজঘাট, রাজারহাট, বারোবাজার, বিলখালি, বৈকালি, বেতনিয়া, এলেংখালি প্রভৃতি স্থানের নামেই বোঝা যায় এগুলি সবই যশোরের বিভিন্ন নদীর নামে এবং নদীর তীরে গড়ে ওঠা শহর-গঞ্জ-বাজার সমূহ। বাংলাদেশের নদীবহুতার কারণে বাংলাদেশকে নদীমার্তৃক দেশ বলা হয়। যশোরেও বহু নদী নালা খাল-বিল জালের মতন ছড়িয়ে রয়েছে।

আলোচনা ঃ

অবশ্য বর্তমানে ভৈরব পুরো মরে যাওয়ার পথে। আর একাজ শুরু হয়েছে সেই পাকিস্থান আমল থেকেই। ভৈরবের যে চ্যানেল প্রাচীনকালে সরাসরি ভারতের ভাগীরথী নদী থেকে উৎপন্ন হয়েছিল। পাকিস্থান আমলে  আইয়ুব শাসনে এক অদূরদর্শিতার কারণে ভাগীরথীর মুখে তালবাড়ীয়া ব্যারেজ নির্মাণ করা হলে ভৈরবের পানি প্রবাহের সেই বড় ধারাটি সম্পূর্ন বন্ধ হয়ে যায়। মৃত প্রায় ভৈরব দুইদিক দিয়েই বঞ্চিত লাঞ্চিত হচ্ছে। টহফবধঃয অবস্থা খুবই ভয়াবহ অবস্থা। যেমন-অনেক অভাগা বেঁচে গিয়ে অন্যের হাড় জ্বালানী উৎস হয়, আবার বৃদ্ধাবস্থায় অনেকে অসুস্থ হয়ে গেলে-তখন বলতে শোনা যায় Ñ “বুড়ো মরলে বাঁচি”। ভৈরবের অবস্থা এখন দুই দিক থেকে গালাগালি পূর্ণ। আধা কিলো., এক কিলো অন্তর ছোট-বড় সেতু, কাঠের পুল, বাাঁশের সাঁকো, কংক্রিটের ব্রিজ প্রভৃতি গড়ে উঠে পুরো পানি প্রবাহকে বন্ধ করে দিয়েছে। আর যশোর সদর থানার মধ্যেতো আরো ভয়াবহ অবস্থা। দুই পাড়ে যে যার মত দখল করে মসজিদ থেকে শুরু করে হাসপাতাল, মাদ্রাসা, গোডাউন, দোকান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাড়ি উত্যাদি গড়ে তুলছে। যার ফলে, দড়াটানা ব্রিজের উপর দাড়িয়ে পূর্ব-পশ্চিমে তাকালে পানির ড্রেনের মতন কিছু একটা আছে বলেও মনে হবে না (প্রকৃত অর্থে তার চেয়েও খারাপ অবস্থা)। চৌগাছার দিকেতো মাঝখানে মাঝখানে পুরো বন্ধ হয়ে গেছে চ্যানেল আর যে জায়গায় পানি আছে বা বর্ষাকালে জলাশয় আকার ধারন করে সেগুলো এখন আলাদা আলাদা বিল, খাল নামে পরিচিত এবং মাছচাষীদের অভয়ারন্য। যশোর শহরের নীলগঞ্জ সেতু থেকে ক্যান্টনমেন্ট এর কাছে পালবাড়ীর একটু ভিতরের দিকে বিরামপুর এবং বাহাদুরপুর পার্কের কাছ পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটার এর মধ্যে মোট ১২ টি ছোট বড় সেতু (নীলগঞ্জ সেতু, দড়াটানা সেতু, কাঠের পুল, বারান্দীপাড়া ব্রিজ, ঢাকা রোড ব্রিজ, বিরামপুর ব্রিজ প্রভৃতি) যা পুরো ভৈরব নদীর ব্যবস্থাপনাকে অকার্যকর করে দিয়েছে। যশোর সদর উপজেলার যশোরের বড় বাজার নামে খ্যাত বাজারটি সম্পূর্ণ-ই (দড়াটানার পূর্ব থেকে পশ্চিমে বারান্দীপাড়া পর্যন্ত) ভৈরব নদীর উত্তর ও দক্ষিণ পাড়/তীর ঘেষে গড়ে ওঠা। আর যার ফলশ্রুতিতে দুই তীরের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গুলো তাদের বর্জ্য-আবর্জনা সব কিছু নদীতে ফেলে এবং ইচ্ছাকৃত ভাবে বাশঁ, খুঁটি পুঁতে, গাছ লাগিয়ে ভরাট করে গোডাউন সম্প্রসারনের মাধ্যমে নদীকে গিলে খাচ্ছে। এমনকি নদীর মধ্যে বড় বড় ৫/৬ তলা সমৃদ্ধ হাসপাতালও গড়ে তুলেছে প্রশাসনের চোখের সামনেই। যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার ভৈরবের তীরেই অবস্থিত। সেটির দেয়াল পর্যন্ত পানি টলায়মান ছিল বহু বহু বছর আগে নয়, এই আশির দশকেও। কিন্তু মাত্র ২০/২৫ বছরের মধ্যেই আজ সেখানে শুকনো এবং বড় বড় নারিকেল ও মেহগনি গাছের সারি আর ধানক্ষেত আর কিছু বস্তিবাসীর চালাঘর মাঝে মাঝে উঁকি মারে। এই একই অবস্থা পুরো নওয়াপাড়ার বসুন্দিয়া পর্যন্ত। প্রভাবশালী মহল নামে বেনামে এমনকি দাতব্য সংস্থার নাম করে দখল বানিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে অনেক প্রতিষ্ঠান। আর আমরা তাকিয়ে হাপিত্যেষ ও করছি না। তাই –

”আমায় প্রশ্ন করে নদীগুলোর জরা/ আর কতকাল রবো ক্ষীণকায় জলহারা/…” শ্রীকান্তের গাওয়া গানটির কিছু শব্দ পাল্টিয়ে এভাবেই এযুগে গাইতে প্ররোচনা জোগায় গায়কদের মৃত্যুপথ নদীগুলো।

বর্তমান ভৈরব নদ খনন কার্যক্রমঃ

২০১৬ সালের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ- একনেক“ ভৈরব নদের জলাবদ্ধতা দূরীকরণ ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন” প্রকল্পে পূণঃখননে ২৭২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। ৫ বছরের এই প্রকল্পে ভৈরব নদের তাহেরপুর থেকে আফ্রা ঘাট পর্যন্ত ৯২ কিলোমিটার ও বুড়ি ভৈরব নদের সঙ্গে মাথাভাঙ্গা নদী সংযোগ স্থাপনের জন্য ৩৩ কিলোমিটার খনন করা হবে। আফ্রা ঘাট থেকে বসুন্দিয়া পর্যন্ত নদের ৪ কিলোমিটার ড্রেজিং করা হবে। এ ছাড়া দাইতলা খালের ২০ কিলোমিটার ও আরও ৪ টি সংযোগ খালের সাড়ে ৪ কিলোমিটার পূনঃখনন করা হবে। ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরে নদী খননের কাজ শুরুর টার্গেট হাতে নেয়া হয়। জুন ২০১৯ এর মধ্যে ২৩ কিলোমিটার কাজ শেষ করা হবে। ভৈরব নদ সীমানায় ১১৮ অবৈধ স্থাপনা বহাল থাকায় খনন কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। যে কারণে শহরের অংশে ৪ কিলোমিটার বাদ রেখেই খনন কাজ এগুচ্ছে। ইতিমধ্যে ফতেপুর ঘোড়াগাছি অংশের ১৩ কিলোমিটারের ৭০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে (গ্রামের কাগজ, ৪ নভেম্বর, ২০১৮ ও প্রিয়.কম, ৩১ মার্চ, ২০১৭)।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান যে, যশোর শহর এলাকায় ভৈরব নদের দুই তীরে হেরিং বোন রাস্তা নির্মাণ করা হবে। যার ফলে যশোর অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক নতুন মাত্রা যোগ হবে। নৌ-যোগাযোগের মাধ্যমেও পাল্টে যাবে যশোরের চিত্র। পাশাপাশি অর্থনৈতিক অবস্থারও উন্নতি আরো বেগবান হবে।

লেখক:

জহিরুল হক জিতু

গবেষক ও প্রাবন্ধিক

 

গ্রন্থপঞ্জিঃ

সতীশ চন্দ্র মিত্র, যশোর-খুলনার ইতিহাস, ১ম খন্ড, (প্রথম প্রকাশ:১৯১৪ ), কলকাতা।

আব্দুল ওয়াহেদ, বাংলাদেশের নদীমালা, ১৯৯১, ঢাকা।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, অর্থনৈতিক ভুগোল: বিশ্ব ও বাংলাদেশ, ১৯৯৫, ঢাবি, ঢাকা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, স্ট্যাটিস্টিকাল ইয়ার বুক বাংলাদেশ ১৯৯৮, ঢাকা।

শামসুল আলম এবং মাসুদ হাসান চৌধুরী, বাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ, খন্ড-৪, (প্রধান সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম), পৃ.  ৪৮৩-৮৬, ২০১৪, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি,ঢাকা।

পরিবেশ

আপনার মতামত লিখুন :