মাঠ সাংবাদিক ও কবি তোতার জীবনাবসান

34

সুনীল ঘোষ:প্রায় অর্ধশত বছর সাংবাদিকতা, সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃত্ব দেয়া ও শেষ জীবনে সাহিত্য চর্চায় মেতে ওঠা মিজানুর রহমান তোতা আর নেই(ইন্না—রাজিউন)। আজ (১৭ জুলাই) যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর। মাঠ সাংবাদিকতায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছেন। প্রথিতদশা এই সাংবাদিকের মৃত্যুতে সাংবাদিকসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

তোতার মৃত্যুতে গভীর শোক ও শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন প্রেসক্লাব যশোরের সভাপতি জাহিদ হাসান টুকুন ও সম্পাদক আহসান কবীর।  প্রেসক্লাব ভবনে কালো পতাকা উত্তোলন ও খোলা হয়েছে শোকবই। আরও খবর>>আইসিইউতে যশোরের মাঠ সাংবাদিক তোতা

মিজানুর রহমান তোতার জন্ম ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ-সংলগ্ন এলাকায়। শৈশবে সেখানেই তাঁর বেড়ে ওঠা। ঝিনাইদহ কে সি কলেজে পড়াকালে তিনি জাসদ ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। পরে যশোর থেকে প্রকাশিত দৈনিক স্ফুলিঙ্গের মাধ্যমে গণমাধ্যমে হাতেখড়ি ঘটে তোতার। পরে তিনি দৈনিক আজাদসহ বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করেছেন। দৈনিক ইনকিলাব বাজারে আসার পর থেকে তিনি এই পত্রিকায় নিয়োগ পান। জেলা প্রতিনিধি থেকে শুরু করে ব্যুরো প্রধান ও বিশেষ প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করেছেন।

সাংবাদিক মিজানুর তোতার জীবনাবসানের আগমুহুর্ত পর্যন্ত দৈনিক ইনকিলাবের যশোর ব্যুরো প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন।

গত ৩ জুলাই হৃদরোগে আক্রান্ত হলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

মিজানুর রহমান তোতা কম বয়সে সংবাদপত্র জগতে প্রবেশ করেন। এ পেশায় তিনি ৪৫ বছর দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে একটানা ৩৫ বছর তিনি কাজ করেছেন দৈনিক ইনকিলাবে। যশোর সংবাদপত্র জগতে বিচরণ করে অবিভক্ত যশোর সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি, একবার প্রেসক্লাব যশোরের সেক্রেটারি ও তিনবার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন মিজানুর রহমান তোতা।

১৯৭৭ সালে ছড়া, কবিতা, সংবাদ লেখালেখি শুরু করেন। তবে সাহিত্য চর্চায় গভীরভাবে মনোনিবেশ করেন বছর দু’ই তিনেক হবে।

জানা যায়, ১৯৭৮ সালে দৈনিক গণকণ্ঠের রিপোর্টার, সমাচারের স্টাফ রিপোর্টার, ১৯৭৯ সালে দৈনিক স্ফুলিঙ্গের স্টাফ রিপোর্টার, পরবর্তীতে দৈনিক স্ফুলিঙ্গের নিউজ এডিটর, দৈনিক ঠিকানার এক্সিকিউটিভ এডিটর, দৈনিক আজাদের স্টাফ রিপোর্টার ও বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। এর মধ্যে সাপ্তাহিক ছুটি, সাপ্তাহিক পূর্ণিমায় খণ্ডকালীন লেখালেখি, তারপর থেকেই দৈনিক ইনকিলাবে টানা সময় পার করেছেন।

সাংবাদিকতার ওপর তার ‘মাঠ সাংবাদিকতা’ এবং আত্মজৈবনিক গ্রন্থ ‘ক্ষতবিক্ষত বিবেক’  সমাদৃত হয়েছে। সম্প্রতি তাঁর নির্বাচিত ৮০টি কবিতা নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে ‘দিবানিশি স্বপ্নের খেলা’ কাব্যগ্রন্থ।

মিজানুর রহমান তোতা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও ইউটিউবে সক্রিয় ছিলেন। এই সুবাদে তিনি আন্তর্জাতিক এক্টিভিস্টদের সংগঠন এবিসি অনলাইন এক্টিভিস্ট ইউনিটের উপদেষ্টা ছিলেন।
তাঁর মৃত্যুতে শোক ও সমবেদনা জানিয়ে বিৃবতি দিয়েছেন কেন্দ্রীয় সভাপতি সুনীল ঘোষ, সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান, বোর্ড কমিটির এমডি সাংবাদিক সাবিরা রহমান, উপদেষ্টা পরিষদের সভাপতি চিন্ময় চক্রবর্তী, সম্পাদক এলিজা রহমান, জনসংযোগ বিষয়ক সম্পাদক মিন্টু দত্ত প্রমুখ।

মিজানুর রহমান তোতার পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত মাসের শেষ সপ্তাহে তিনি গুরুতর অসুস্থ হন। করোনার উপসর্গ থাকায় তার শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (যবিপ্রবি) জেনোম সেন্টারে পাঠানো হয়। কিন্তু ফলাফল নেগেটিভ আসে।

নমুনা পরীক্ষায় ফলাফল নেগেটিভ আসার বিষয়টি নিশ্চিত করে মিজানুর রহমান তোতা তাঁর ফেসবুক আইডিতে একটি পোস্টও করেন। এই পোস্ট দেখে নিশ্চিত হন সতীর্থরা।

এদিকে হাসপাতালে ভর্তির কয়েকদিনের মাথায় দ্বিতীয় বারের মতো তার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়। সেই দিন তাকে বেসরকারি কুইন্স হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানকার ডাক্তাররা তাকে কোভিড-১৯ রোগী বলে শনাক্ত করেন। পরীক্ষায় দেখা যায় তার ফুসফুসের প্রায় ৬৫ শতাংশ সংক্রমিত হয়েছে । তাৎক্ষণিক তাকে যশোর জেনারেল হাসপাতালের করোনা রেড জোনে পাঠানো হয়। সেখানে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসা দেয়া হয়। শেষ দিকে তার করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছিল। একপর্যায়ে ঘণ্টায় দুই-তিন লিটার অক্সিজেন চলছিল। কিন্তু করোনা রেড জোন থেকে বের করে স্ট্রোকের চিকিৎসা করা সম্ভব হয়নি।
তাঁর করোনায় আক্রান্তের বিষয়টি সতীর্থদের অনেকে জ্ঞাত ছিলেন না।

আজ বাদ জোহর নতুন খয়েরতলা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে মিজানুর রহমান তোতার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সাংবাদিক ছাড়াও রাজনীতিক, জনপ্রতিনিধি, আত্মীয়-স্বজন এবং প্রতিবেশিরা অংশ নেন। এর আগে হাসপাতাল থেকে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় তার নূতন খয়েরতলার বাসভবনে। সেখানে সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে তোতার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। পরে তাকে স্থানীয় গোরস্থানে দাফন করা হয়েছে।