মাগুরায় ধর্মান্তরিত হতে হিন্দু পরিবারে চিঠি:কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে জানতে চেয়েছে আদালত

44

এবিসি ডেস্ক:শুক্রবার মাগুরার দুটি গ্রামে নজিরবিহীনভাবে জনা পঞ্চাশেক হিন্দু ব্যক্তিকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে আহ্বান জানিয়ে বেনামি চিঠি পাঠানোর পর সে ঘটনার পেছনে দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, পুলিশের কাছে জানতে চেয়েছে আদালত।

শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে আগামী ২৩ মার্চের মধ্যে এ বিষয়ে আদালতে বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন মাগুরার শ্রীপুর আমলী আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুবা নাসরীন।

এরআগে মাগুরার শ্রীপুরে দুটি গ্রামে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ইসলামের দাওয়াত দিয়ে চিঠি দেয়ার পর সেখানে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।

প্রশাসন জানাচ্ছে, তারা ওই ঘটনাটির পর সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।

এ ঘটনায় চার জনকে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে পুলিশের তরফ থেকে জানানো হলেও তাদের আটক বা গ্রেপ্তার করার কথা স্বীকার করেনি পুলিশ।

শ্রীপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়াছিন কবীর জানান, উপজেলার দারিয়াপুর ইউনিয়নের চৌগাছি, গোয়ালদাহ এবং মালাইনগর গ্রাম এলাকায় সম্প্রতি ৫০ জন হিন্দু ব্যক্তিকে এসব চিঠি বিতরণ করা হয়।

চিঠি পেয়েছেন এমন একজন বিবিসিকে জানান, তিনি এবং তার প্রতিবেশীরা চিঠি পেয়েছেন শুক্রবার রাতে।

এসব চিঠি বিতরণের পর এক ধরণের উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে ওই এলাকার হিন্দু জনগোষ্ঠির মধ্যে। ইউএনও মি. কবীর বলছেন, সুনামগঞ্জের শাল্লায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বাড়ি-ঘরে সম্প্রতি হামলার ঘটনার প্রেক্ষাপটে এই উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে।

এই উৎকণ্ঠা নিরসনের জন্য শনিবার হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সদস্যদের নিয়ে বিভিন্ন জনের সাথে কথা বলা হয়েছে এবং বাসিন্দাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, এতে ভয়ের কোন কারণ নেই।

নিরাপত্তার জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্য এলাকা পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শন করেছেন স্থানীয় প্রশাসনের সদস্যরাও।

এলাকার বাসিন্দাদেরও কাছ থেকেও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এর সাথে যারা জড়িত তাদের সবার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আলী আহমেদ মাসুদ বলেন, চিঠি বিতরণ যারা করেছে, তাদের চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

“একে হালকাভাবে দেখছি না আমরা। এর পেছনে আসলেই কোন উদ্দেশ্য আছে কিনা দেখা হচ্ছে,” বলেন মি. মাসুদ।
চিঠি যারা পেয়েছেন তাদের একজন শ্রীপুর উপজেলার চরগোয়ালদাহ গ্রামের মাধ্যমিক শিক্ষক নির্মল কুমার সরকার।

বিবিসিকে তিনি বলছিলেন, চিঠি পাওয়ার পর “প্রথমে মনে কষ্ট পেয়েছি, তারপর ভয় পেয়েছি, তারপর উৎকণ্ঠিত হয়েছি”।

তিনি বলছিলেন, গত শুক্রবার সন্ধ্যায় তার ছোট ভাইয়ের বউয়ের কাছে কেউ একজন চিঠিটি দিয়ে যান। প্রথমে ব্যাপারটা চেপে গিয়েছিলেন তিনি। অন্য কেউও বিষয়টি সামনে আনেননি।

“আমরা হিন্দু সম্প্রদায় তো, এমনিতেই মানসিক উৎকণ্ঠায় থাকি”, বলছিলেন মি. সরকার।

পরে অবশ্য তিনিই স্থানীয় মন্দিরে একটি সভা ডেকে ব্যাপারটি উত্থাপন করেন। তারপর একে একে বাকিরাও চিঠি পাওয়ার কথা জানান।

পরে এই খবরটি স্থানীয় প্রশাসনের কানে গেলে তারা হস্তক্ষেপ করেন।
কী ঘটেছিল?

শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মি. কবীর জানান, যারা চিঠি বিতরণ করেছে তারা ইয়াকুব নামে এক ব্যক্তির নেতৃত্বে একটি ছোট মাদ্রাসা পরিচালনা করতেন।

জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছেন, তারা তাদের ভাষায় ‘ঈমানী দায়িত্ব’ পালনের অংশ হিসেবে ১০০ জন অমুসলিমকে ইসলামের দাওয়াত দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

এর জন্য তারা তিন জন করে ২১ জনের মোট ৭টি দল গঠন করেন, যারা চিঠি বিতরণের কাজ করবে।

মোট দুই পাতার এই চিঠিতে কুরআনের বিভিন্ন আয়াত হাতে লিখে কপি করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।

“সেই সাথে চিঠিতে তাদের নিজেদের কিছু কথা আছে এবং তারা একটি উপসংহার টেনেছেন যে, আপনারা এসব বিধর্মী পথ ছেড়ে শান্তির পথে আসুন।”

চিঠিটি বেনামী এবং কারা পাঠিয়েছেন তাদের কোন নাম উল্লেখ করা নেই। তবে চিঠির শুরুতে লেখা রয়েছে, “মুসলিম জামাতের পক্ষ থেকে”। এটির পর বিভিন্ন প্রাপকের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তারা সবাই হিন্দু ধর্মাবলম্বী বলে জানান তিনি।

মি. কবীর বলেন, চিঠিটি তারা পড়েছেন এবং এতে কোন ভীতিকর কোন বিষয় তারা দেখেননি। কাউকে কোন ধরণের হুমকিও দেয়া হয়নি।

“চিঠিটি যাদের দেয়া হয়েছে, দেয়ার সময় তাদের কাউকে ভীতি প্রদর্শন করা হয়নি,” বলেন মি. কবীর।
‘গ্রহণযোগ্য নয়’

হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের প্রেসিডিয়াম সদস্য সুব্রত চৌধুরী বলেন, মাগুরায় যে ঘটনাটি ঘটেছে, তা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

এসব ঘটনায় জড়িতদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তিনি।

মি. চৌধুরী বলেন, সুনামগঞ্জ এবং মাগুরায় যে ঘটনা ঘটেছে তার দায় প্রশাসন এবং সরকারকে নিতে হবে। এড়িয়ে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, এর আগে যে ঘটনাই ঘটুক না কেন বলা হতো যে, বিএনপি-জামাত ঘটিয়েছে বা মৌলবাদী গোষ্ঠী করছে।

কিন্তু এখন যেসব ঘটনা ঘটছে তাতে দেখা যাচ্ছে যে, প্রতিটি ঘটনাতেই ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের জড়িত থাকার তথ্য জানা যাচ্ছে।

“সরকারের নাকের ডগা দিয়ে এসব ঘটনা ঘটছে,” তিনি বলেন।

সূত্র:বিবিসি