বিশেষ প্রবন্ধ অভিভাবকহীন বাংলাদেশের সাংবাদিকতা

65

Last Updated on

বাংলাদেশে সাংবাদিকতা যেন দিনের পর দিন স্থবির হয়ে পড়ছে। একদিকে করোনা সংকট অন‍্যদিকে সংবাদকর্মীদের আর্থিক দৈন‍্যতায় দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে চরম অধঃপতন। সাংবাদিকরা প্রাণ দিয়ে দেশ-সরকারের হয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সরকার গণমাধ্যমের ব্যাপারে চুপচাপ।
একটি কথাও কিন্তু বলছে না কেউ। সবসময়ই সরকার গণমাধ্যমকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। শুধু যে বর্তমান সরকার তা কিন্তু নয়। অতীতে সকল সরকারই সংবাদমাধ্যম প্রশ্নে একই  রকম আচারণ করেছেন। ফলে আলাদা করে কাউকে বলার কিছু নেই। এ কারনে সাংবাদিকতা এখন অভিভাবকহীন।
গ্রাম্য ভাষায়, ‘ধানের চেয়ে চিটা বেশি।’ আর প্রখ্যাত সাহিত্যিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’র ভাষায়, ‘শস্যের চেয়ে আগাছা বেশি। ধর্মের চেয়ে টুপি বেশি।’ যে উদাহরণই দেই না কেন; গণমাধ্যমের এমন অধঃগতির নেপথ্যে সাম্রাজ্যবাদী শাসনের দীর্ঘ পরিকল্পনার বিষক্রিয়া দায়ী।
বস্তুত সংবাদমাধ্যম আর গণমাধ্যমকর্মী/সাংবাদিকদের হাতে নেই। বেহাত হয়ে গেছে। এই সাইনবোর্ড ব্যবহার করতে দলে দলে ভিড় করছেন মুটে-মজুর-কুলি-চোর-গুন্ডা-বাটপার-দালাল-হোটেল বয়-ভবঘুরে-অকর্মা-বখে যাওয়া উপায়হীন অনেকেই। ফলে ২০২০-এর গণমাধ্যমকর্মীরা পূঁজিবাদী শাসন ব্যবস্থার মাউথঅর্গান। রুপ নিচ্ছেন ধনাঢ্য ব্যক্তির তোষামোদকারীতে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা রিপোটার্স স্যান্স ফ্রন্টিয়ার্স বা আরএসএফ চলতি বছরের এপ্রিলের শেষার্ধে প্রকাশিত রিপোর্টে বলছে, বিশ্বের
১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান বর্তমানে ১৫১তম স্থানে। এই সূচকে আগের বছর ছিল ১৫০তম স্থানে। তারও আগে ২০১৮ সালে ছিল ১৪৬তম স্থানে। অর্থাৎ প্রত্যেক বছর গণমাধ্যম স্বাধীনতা হারাচ্ছে। অথচ সরকার কিন্তু বলছে গণমাধ্যম স্বাধীন। গণমাধ্যম মুক্ত। হ্যাঁ আমরাও দেখছি, গণমাধ্যম মুক্ত। যদিও তা সংখ্যার বিচারে। এমন ঢালাওভাবে গণমাধ্যমের সংখ্যা বাড়িয়ে ‘সবপন্ডিতের দেশে’ পরিণত করা হয়েছে এ শিল্পকে। আগে সাংবাদিক দেখলে মানুষ সম্মান করতো। এখন প্রকারান্তরে মানুষ অট্টহাসি দেয়। মানুষ বুঝে গেছে, দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে প্রসূত মানহীন সংবাদ মাধ্যমে শুধু আবর্জনা উৎপাদিত হচ্ছে। প্রকৃত সাংবাদিক হাতে গোনা কয়েকজন।
এই সাইনবোর্ড ব্যবহার করতে দলে দলে ভিড় করছেন মুটে-মজুর-কুলি-চোর-গুন্ডা-বাটপার-দালাল-হোটেল বয়-ভবঘুরে-অকর্মা-বখে যাওয়া উপায়হীন অনেকেই। ফলে ২০২০-এর গণমাধ্যমকর্মীরা পূঁজিবাদী শাসন ব্যবস্থার মাউথঅর্গান। রুপ নিচ্ছেন ধনাঢ্য ব্যক্তির তোষামোদকারীতে।
গণমাধ্যমকর্মীরা চিনতে ভুলে যাচ্ছেন কোনটি সাদা আর কোনটি কালো। শুধু নিজেরা চিনতে ভুলে গিয়েই ক্ষান্ত হননি; সামষ্টিক জনগোষ্ঠিতে সেই ভুল শিক্ষা দিচ্ছেন।
সরকার হাজার হাজার গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান অবমুক্ত করেছেন। আরও কয়েক হাজার অনুমতি ছাড়াই চলছে। কিন্তু হাজার হাজার সংবাদ
ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে যে লাখ লাখ কর্মী কাজ করছেন তাদের বেতন-ভাতার নিশ্চয়তা নেই। এমনকি সাংবাদকিরা খেয়ে আছে নাকি না খেয়ে আছে তারও খবর নেওয়ার ফুসরত নেই।
সর্বশেষ উদাহরণই ধরুন, করোনা যুদ্ধ। পুলিশ, ডাক্তার, নার্স ইত্যাদি সম্মুখ যোদ্ধাদের জন্য প্রণোদনা, বীমা সবই চালু করা হচ্ছে। অথচ করোনাযুদ্ধে জয়ী হতে যদি তিনটি সংস্থা দরকার হয় তার মধ্যে একটি
সংবাদ মাধ্যম। সংবাদ মাধ্যম সার্বিক দিক থেকে এই যুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছে। সাংবাদিকরা প্রাণ দিয়ে দেশ-সরকারের হয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সরকার গণমাধ্যমের ব্যাপারে চুপচাপ। একটি কথাও কিন্তু বলছে না কেউ।
এমনই সবসময় সরকার গণমাধ্যমকে উপেক্ষা করে এসেছে। শুধু যে বর্তমান সরকার তা কিন্তু নয়। অতীতে সকল সরকারই সংবাদমাধ্যম প্রশ্নে
একই চরিত্রে স্থির ছিল। ফলে আলাদা করে কাউকে বলার কিছু নেই।
এ কারনে সাংবাদিকতা এখন অভিভাবকহীন। অভিভাবকহীন হয়ে পড়ায় পঙ্গপালের মত ছড়িয়ে সাংবাদিকতার নাম ভাঙ্গিয়ে সত্যটাকে চেটেপুটে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। নিজে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে অস্বচ্ছ, মিথ্যা, ঠকবাজীতার সাথে।
আবার কিছু মানুষ ঢুকছে যারা গণমাধ্যমের স্বার্থে নয়; বিশেষ
কাউকে সন্তুষ্ট করতে। খোঁজ নিয়ে দেখবেন, সাংবাদিকদের হাত থেকে সাংবাদিকতা কেড়ে নিয়ে যারা খবরদারি করেন তারা এটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন। তাদের অন্য পেশা রয়েছে। হোক সে ডায়াগনস্টিক ব্যবসায়ী, মাদক ব্যবসায়ী, জমির দালাল ইত্যাদি ইত্যাদি।
সাংবাদিকতার যতগুলো বই পড়েছি, সারমর্মে এটুকু বুঝেছি দুই ধরণের সাংবাদিকতা দৃশ্যমান। সু-সাংবাদিকতা আর অপসাংবাদিকতা। এটি বাংলায়। ইংরেজীতে ইয়োলো জার্নালিজম বলে একটি শব্দ চয়ন করে রাখা হয়েছে। বিপরীতে আর কোন শব্দ নেই। কারন ইয়োলা জার্নালিজম মানে অপসাংবাদিকতাকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। বিপরীতে ভালো
সাংবাদিকতার কোন মানদন্ড রাখা হয়নি। ভালোর কোন শেষ নেই।
আর বাংলাদেশে নতুন করে শিখছি আভিধানিক সাংবাদিকতার বাইরে দুই ধরনের সাংবাদিকতার প্রচলন।
প্রথম পক্ষ দেশের স্বার্থে সাংবাদিকতায় আসে। এটাকে আমি জাতীয় সাংবাদিকতা বলবো। সাধারণত আমরা অনুমান করি ঢাকায় বসে যারা গণমাধ্যমে মাতব্বরি করেন তারা জাতীয় সাংবাদিক। বস্তুত তা নয়। মফস্বলে থেকেও জাতীয়/আর্ন্তজাতিক সাংবাদিক হতে পারেন। এক্ষেত্রে চিন্তার প্রসার নির্ধারণ করেন কে কোন মানের সাংবাদিক। আর দ্বিতীয় পক্ষের সাংবাদিক হচ্ছেন ব্যক্তি স্বার্থে। এই পক্ষকে
আরেকটি নাম দেওয়া যায় ‘ইতর শ্রেণী’। এরা সাংবাদিকতায় আসেন শুধু নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য। দেশ বা সামগ্রিক কল্যান এদের
কাছে কোন চিন্তা থাকে না। ফলে দেখা যায়, ইতর শ্রেণীর এই
সাংবাদিকরা জাতীয় সাংবাদিকদের কাজ করার পথ রুদ্ধ করে দেন। তখন মিথ্যা ও ইতর শ্রেণীর সাংবাদিকদের সাথে লড়াই করে সাংবাদিকতা করতে হয় প্রকৃত সাংবাদিকদের। ওদিকে ইতর শ্রেনীর ভিতরে আরেক প্রজাতি রয়েছেন, যারা সাংবাদিকতা করেন দলের সার্পোট পেতে। এই শ্রেনীর মানুষ সবচেয়ে বেশি। তারা বড়শিওয়ালার মতন। রাজনৈতিক দলের বগলে চড়ে বেড়ান। আর বিপদে পড়লে পরিচয় দেন, আমি সাংবাদিক।
সাংবাদিকতার আদি ইতিহাস বলছে, নিপেড়িতর পক্ষে, অন্যায়ের বিপক্ষে বিবেকের আদালত হচ্ছে গণমাধ্যম। কিন্তু ২০২০ সালে বাংলাদেশে সাংবাদিকতায় অন্যায় আর ন্যায় বলতে ইদানিং বিশেষ তফাৎ করা হচ্ছে না।
হ্যাঁ, এ কথা সত্য যে এখনো সাংবাদিকতার ষোলআনা শঠতামি গ্রাস করতে পারেনি। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক এখনো সততার সাথে সাংবাদিকতা করেন। তারা নিবেদিত চিত্তে কাজ করছেন।
কিন্তু গোলযোগটা হাফপাস সাংবাদিকদের নিয়ে। আর উপরের পর্যবেক্ষণও সেই হাফপাস সাংবাদিকতা নিয়েই। এমন সাংবাদিকতার উদ্ভব কখনোই হতো না যদি, সাংবাদিকদের খাদ্যের নিরাপত্তা থাকতো, বাস স্থানের নিরাপত্তা থাকতো, বাকস্বাধীনতা খর্ব না হতো। সর্বোপরি জীবনের নিরাপত্তা থাকতো। তখন চিন্তা করতে হতো না, মানববন্ধনের ছবি তুলে বা এনজিওর আলোচনা সভা শেষে প্রাপ্ত টাকা দিয়ে দিনের বাজার করে ঘরে ফিরতে হবে বা চেয়ারম্যান-মেম্বারের চাল চুরির তথ্য ফাঁস করলে পান্ডাদের পিটুনির শিকার হতে হবে।
পরিশেষে বলতে চাই, সংবাদপত্র তথা গণমাধ্যমকে রাস্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হলেও সেইদিন আমাদের কাছে এই কথাটি অর্থপূর্ণ হবে যেদিন সাম্রাজ্যবাদীতার স্লাে পয়জনিং বন্ধ হবে। সকলস্তরের গণমাধ্যমকর্মীদের জুটবে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও বেচে থাকার নিরাপত্তা।

লেখক:জেমস আব্দুর রহিম রানা
যশোর জেলা সমন্বয়কারী
সম্মিলিত সাংবাদিক পরিষদ (এসএসপি)