বাল্যবিয়ের শিকার হয়ে হারিয়ে গেলো কিশোরী ফুটবলার স্বরলিকা

29

>>>করোনায় বাল্যবিয়ে, হারিয়ে গেল দেশসেরা কিশোরী ফুটবলার স্বরলিকাসহ ৭ প্রতিভা 

প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার নিচ্ছে ‘হ্যাট্রিক’ কন্যা স্বরলিকা

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার পাথরডুবি ইউনিয়নের বাঁশজানি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্ষুদে ফুটবল দলের সাবেক খেলোয়াড় কিশোরী স্বরলিকা দেশের সেরা খেলোয়াড় হয়েও বাল্যবিয়ের কারণে হারিয়ে গেল ফুটবল জগত থেকে।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ এবং দারিদ্রতার কাছে হার মেনে অনেক খেলোয়াড়কেই অভিভাবকরা বাল্যবিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। একটি বেসরকারি সংস্থার তথ্য দেখা যায়, ২০১৮ সালের জানুয়ারি হতে ২০২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় ১৯৭টি বাল্যবিয়ে সংগঠিত হয়েছে।
জানা গেছে, ২০১৭ সালে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপে ‘হ্যাটট্রিক কন্যা’ খ্যাত দেশের সেরা খেলোয়াড় স্বরলিকা পারভীন। স্মরনিকা ও তার দল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার নেন। ফুটবল মাঠের পরিবর্তে স্মরনিকা ও তার দলের ৭ জন কিশোরী সংসার জীবনের মাঠে নেমে পড়েছে। উচ্চ বিদ্যালয়ের গণ্ডি না পেরোতেই বাল্যবিয়ের কালো থাবায় হারিয়ে গেল এই উদীয়মান খেলোয়াড়দের জীবন।

কুড়িগ্রাম জেলার ভূরুঙ্গামারী উপজেলার সীমান্তবর্তী পাথরডুবি ইউনিয়নের সাবেক ছিটমহল দীঘলটারী দক্ষিণ বাঁশজানী গ্রামে স্বরলিকার বাড়ি। ২০১৭ সালে বাঁশজানি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দলটি ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় চ্যাম্পিয়ন হয়ে ২০ জন কিশোরীর দলটি খেলায় অংশ নিতে ঢাকায় আসে।

বঙ্গমাতা গোল্ডকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে প্রতিপক্ষ রাজশাহীর গোদাগাড়ীর সোনাদীঘি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ৩-১ গোলে হারায় বাঁশজানি দল। সেখানে হ্যাটট্রিক করে অধিনায়ক স্বরলিকা। সেমি ফাইনালে হেরে গিয়ে স্থান নির্ধারনী ম্যাচে চট্টগ্রামের বাঁশখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ৪-১ গোলে হারিয়ে তৃতীয় হয় বাঁশজানি দল। এখানেও হ্যাটট্রিক করে কিশোরী। তাদের গ্রামটি পরিচিতি পায় নারী ফুটবলার গ্রাম হিসেবে। স্বরলিকার নেতৃত্বে আসে নানা সাফল্যের মেডেল, ক্রেস্ট ও কাপ।করোনার দুর্যোগে সম্ভাবনাময়ী এই দলের কোনো খোঁজ-খবর না রাখায় দারিদ্রতার কষাঘাতে বাধ্য হয়েই পরিবার থেকে বাল্যবিয়ে দেয়া হচ্ছে। মেয়েদের বয়স কম থাকায় নিবন্ধন (রেজিস্ট্রি) করতে না পেরে শুধুমাত্র গ্রামীণ আর ধর্মীয় রীতিতে বিয়ে দেওয়া হয়েছে।

স্বরলিকা পারভীন বলেন, ইচ্ছে ছিল জাতীয় দলে খেলার। দেশের জন্য কিছু করার। কিন্তু সেই স্বপ্ন সব শেষ বিয়ে হয়ে যাওয়ায়। সামাজিক নানা কথা মেয়েরা ফুটবল খেললে বিয়ে হবে না। ভালো ছেলে পাওয়া যাবে না। আর্থিক অনটনসহ এমন অনেক কারণে বাবা-মা বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। আমার টিমের অনেকেরই বিয়ে হয়ে গেছে।

স্বরলিকার বাবা শহিদুল ইসলাম বলেন, আমি কৃষি কাজ করি, ৫ জনের সংসার চালাই। সীমান্ত এলাকা এডে কোনো কাম-কাইজ নাই। করোনার জন্য অভাব আরো বেশি হইছে। ভালো ঘর পাইছি। ডিমান্ড ছাড়াই বিয়া দিছি মেয়ের। তিনি আরো বলেন, স্মরনিকার গত ৫মার্চ একই উপজেলার পাশ্ববর্তী শিলখুড়ি ইউনিয়নের মোটর মেকানিক কামরুল ইসলামের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে।

টিমের অপর খেলোয়ার লিসামনির মা আমিনা বেগম বলেন, এই তিন বছর থাকি কেউ খোঁজ নেয়নি। স্কুল বন্ধ, পড়াশুনা নাই, মেয়েরা বসি থাকে। ভালো ছেলে পাইছে, স্বরলিকার বিয়ে দিছে ওর বাবা-মা। আমিও ভালো ছেলে পাইলে আমার মেয়েকেও বিয়ে দেবো। কেননা হামারতো সামর্থ্য নাই যে মেয়েকে বাইর্যা নিয়া পড়াশুনা করামো আর খেলোয়াড় বানামো।

লিসামনি বলেন, আমি বাঁশজানি টিমে খেলেছি। সেই সেদিনের সেই অনুভূতি বলার মতো না। সেখান থেকে আসার পর আমাদের কেউ কোনো খোঁজ-খবর রাখেনি। গেল তিন মাসে আমাদের টিমের ৭ জন মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। তারা হলো- বাঁশজানি দলের অধিনায়ক ১০ম শ্রেণিপড়ুয়া স্মরনিকা, ১০ম শ্রেণির জয়নব, ৯ম শ্রেণির শাবানা, ৮ম শ্রেণির রত্না, আঁখি, শারমিন এবং আতিকা।

শাবানার বাবা অটোচালক সাইফুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এত দূরে মেয়েরা খেলতে গেছিল। শুধু যাওয়া-আসা আর থাকা-খাওয়া ছাড়া মেয়েরা কিছুই পায়নি। উল্টো খেলতে গেলে মেয়েদের পেছনে টাকা খরচ করতে হতো। করোনার আগেও রংপুর ও ঢাকা খেলে আসছে। কোনো সহযোগিতা পায় নাই। করোনার মধ্যে স্কুল বন্ধ, আয় কমি গেছে। খরচ বাড়ছে। তাই ভালো সম্বন্ধ আসছে, মেয়ের বিয়ে দিছি।

প্রতিবেশী শাহআলম বলেন, করোনার কারণে দিনে দিনে বাল্যবিয়ের হার বাড়ছে। তিনি আরো বলেন, সরকারি-বেসরকারিভাবে এসব প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের নজরদারী বাড়ালে অন্যান্য মেয়েদের বাল্যবিয়ের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

বাঁশজানি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সে সময়ের ফুটবল প্রশিক্ষক আতিকুর রহমান খোকন জানান, সেই সময়ের বাঁশজানি দলের ৬/৭ জনের বিয়ে হয়ে গেছে। আমাদের অগোচরেই এসব বিয়ে দিয়েছে তাদের পরিবার। এখন তারা খেলার মাঠে থাকার কথা। অথচ অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যাবার কারণে সংসারের হাল ধরতে হয়েছে। ওদের কারও মুখের দিকে তাকানো যায় না। কতগুলো সম্ভাবনা চোখের সামনেই শেষ। খেলে আসার পর থেকে এদের প্রশিক্ষণ আর অর্থনৈতিক সহযোগিতা করা যেত তাহলে হয় তো এমনটি ঘটতো না। এখন যারা বাকি আছে তাদের এগিয়ে নিতে সরকারি-বেসরকারিভাবে সহযোগিতা প্রয়োজন।

বাঁশজানি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষক কায়সার আলী বলেন, করোনার সময় স্কুল বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের খোঁজ-খবর তেমনটা নেয়া সম্ভব হয়নি। অনেকের বিয়ের বিষয়টি আমি পরে জানতে পেরেছি। বিয়ের সময় জানতে পারলেও বিয়ে আটকানো যেত। আসলে বিয়ে হয়ে যাবার পর আমাদের কিছু করার থাকে না।

পাথরডুবি ইউপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আরফান আলী বলেন, স্থানীয় প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধির অগোচরেই বাঁশজানি দলের অনেকেরই বিয়ে হয়ে গেছে। তবে তিনি দাবি করেন, সরকারি-বেসরকারিভাবে কিশোরী খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণসহ প্রত্যন্ত সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা বৃদ্ধি করা গেলে বাল্যবিয়ের হার কমে আসবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দীপক কুমার দেব শর্মা জানান, কিশোরী ফুটবলারদের বাল্যবিয়ের বিষয়ে অবগত ছিলেন না। কেউ তাকে জানায়নি। জানলে তিনি আইনি পদক্ষেপ নিতে পারতেন। তবে বাকি খেলোয়াড়রা যেন বাল্যবিয়ের শিকার না হয় সেজন্য তিনি নজর রাখার পাশাপাশি তাদের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।