বনসংলগ্ন এলাকার জনবসতি হয়ে উঠেছে সুন্দরবনের জন্য হুমকি

33

>>১৭ বছরে সুন্দরবনে ২৫ বার আগুন:ধরা-ছোঁয়ার বাইরে প্রভাবশালী মহল
শরণখোলা সংবাদদাতা:বার বার অগ্নিকান্ডের ঘটনায় আয়তন কমেছে বিেেশ্বর একক বৃহত্তর ম্যানগ্রোপ ফরেস্ট সুন্দরবনের। নানা কারণে সংঘঠিত হওয়া অগ্নিকান্ডে বনের হাজার হাজার গাছ পালা পুড়ে ছাই হওয়ায় এখন অনেকটা ফাঁকা অনুভব হচ্ছে সুন্দরবন। তবে বনকে তার পুরানো চেহারায় ফিরে যেতে কিংম্বা আগুনের ক্ষত শুকাতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের। প্রাণী ও মৎস্য এবং মধুসহ বনের নানান সম্পদ লুটতে একাধিক চক্র সক্রিয় হওয়ার কারণে বার বার অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটছে সুন্দরবনে-দাবি বিভিন্ন সূত্রের।
অপরদিকে, বন সংশ্লিষ্ট এলাকার টহল ফাঁড়ি গুলোতে পাহারার কাজে ২/৪ জন বনকর্মী থাকলেও বনজ সম্পদ পাচারকারী চক্রের কাছে তারা নিজেরাই অসহায়। তবে, বনবিভাগের দাবি সুন্দরবন লাগোয়া ঘনবসতি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের জন্য এখন হুমকি। বনে যেসব অপরাধ সংঘঠিত হচ্ছে তার অধিকাংশ ঘটনার সাথে ওই জনবসতিদের কারো না কারো সম্পৃক্ততাা থাকে। তাছাড়া আধুনিক সুযোগ সুবিধাসহ চরম জনবল সংকটের কারণে নিরন্তন চেষ্টা করেও অপরাধী চক্রের লাগাম টেনে ধরতে পারছে না বনবিভাগ।
অনুসন্ধানে জানাগেছে, সুন্দরবনের নানা সম্পদ লুটতে প্রভাবশালী চক্র বনসংলগ্ন এলাকার জনবসতিদের মধ্যে কিছু অসাধু ব্যক্তিকে নানা প্রলোভন দেখিয়ে বনের অভ্যন্তরে পাঠিয়ে বহু অপরাধমূলক কর্মকান্ড করতে বাধ্য করে তোলে।
গত ১৭ বছরে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ২৫ বার অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। তবে কখনোই আইনের আওতায় আনা হয়নি প্রভাবশালী চক্রের সদস্যদের। সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগর এলাকা ইতিমধ্যে সংরক্ষিত হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু ওই সকল জলাশয়ের মাছ, বনের মধুসহ বনজ ও প্রাণী সম্পদ লুটের উদ্দেশ্যে প্রভাবশালী চক্র অসাধু বন-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ম্যানেজ করে থাকেন। ২০০৪ সাল হতে গত ১৭ বছরে সুন্দরবনের যেসব এলাকা আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ওইসব এলাকাগুলো আজও পুরোপুরি স¦াভাবিক হয়ে ওঠেনি। এলাকা গুলোতে নেই প্রাণী কুলের তেমন বিচারণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, দফায় দফায় অগ্নিকান্ডের ঘটনায় সুন্দরবনের ওই সকল স্থানের জীবজন্তু, পশু-পাখি অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। তাছাড়া এভাবে বারবার অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটলে সুন্দরবন সুরক্ষা করা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
নাম গোপন রাখার শর্তে বন সংলগ্ন এলাকার দু’জন সমাজ সেবক বলেন, সুন্দরবনের পার্শ্বে বসবাসরত বাসিন্দাদের মধ্যে কিছু অসাধু ব্যক্তি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কিছু নেতার ছত্র-ছায়ায় থেকে সুন্দরবনে ঢুকে অতি লোভের কারণে বিষ দিয়ে মাছ শিকার ও ফাঁদ পেতে হরিণ শিকারের পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে বাঘ হত্যায়ও জড়িয়ে পড়েন অনেকে। এছাড়া শুস্ক মৌসুম এলেই অবৈধভাবে বিভিন্ন জলাশয়ের মাছ এবং আগুনের কুন্ডালী সাজিয়ে মধু সংগ্রহ করে থাকেন কতিপয় অসাধু পেশাজীবি। তাছাড়া বনরক্ষীদের তেমন কোন টহল ব্যবস্থা না থাকায় পর্যটকসহ সাধারণ মানুষের বনের অভ্যন্তরে অবাধ যাতায়াত থাকায় বন্ধ করা যাচ্ছে না সুন্দরবনের নাশকতার আগুন। এমনকি রাজনৈতিক দলের কিছু নেতা অনেক সময় বনরক্ষীদের উপর প্রভাব খাটিয়ে বনের প্রাকৃতিক সম্পদ লুটের ধান্ধায় তৎপর হয়ে ওঠে। তাই প্রভাবশালীদের কথা অনুযায়ী কাজ না করলে সুন্দরবনে পেশাজীবির কাজ করতে পারেন না বনসংলগ্ন এলাকার অনেক পরিবার। তবে, পেশাজীবির কাজ করতে গিয়ে যারা বন ধংসের খেলায় মেতে উঠেন তাদেরসহ প্রভাবশালী চক্রের লাগাম টানতে না পারলে সুন্দরবন হুমকির মুখে পড়তে পারে। এছাড়া এ পর্যন্ত বহুবার আগুনের ঘটনা ঘটলেও বনবিভাগ শুধু মাত্র তদন্ত কমিটি করেই দায় সেরেছেন কিন্তু সুনির্দিষ্ট ভাবে কাউকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে পারেননি তারা। এছাড়া প্রভাবশালী চক্রের সংশ্লিষ্টতা থাকলেও কখনোই তাদের আইনের আওতায় আনতে দেখা। অথচ সুন্দরবনের কোন ঘটনা ঘটলে মাঝ খান থেকে অযথা হয়রানির শিকার হন এলাকার সাধারণ মানুষ।
বনসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা প্রভাষক মো. কামাল হোসেন তালুকদার বলেন, পুর্ব বনের চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগর, কলমতেজী ও নাংলী এলাকায় প্রবেশ করলে বনের কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে তেমন কোন গাছপালা দেখা যায় না। চোখে পড়ে শুধু ঘাস আর লতাপাতা। সংশ্লিষ্ট এলাকার বনরক্ষীদের ম্যানেজ করে স্থানীয় কিছু লোক বছর জুড়ে তাদের পালিত মহিষ গুলোকে জঙ্গলে ঘাস খাওয়ান। ওই মহিষগুলো দেখাশোনার কাজে নিয়োজিত রাখালদের বিড়ি-সিগারেটের ফেলে দেওয়া ফিল্টারের মাধ্যমেও অনেক সময় সুন্দরবনে আগুনের ঘটনা ঘটতে পারে। পাশাপাশি বনে অবৈধ যাতায়াত বন্ধে বনরক্ষীদের সর্বদা কঠোর নজরদারী থাকা উচিত।
এছাড়া স্বার্থান্বেষী মহল সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে আগুন নিয়ে খেলা করে। অন্যদিকে, সুন্দরবন সুরক্ষার কাজে নিয়োজিত সুন্দরবনসহ ব্যবস্থাপনা সংগঠন (সিএমসির) শরণখোলা রেঞ্জেরসহ সভাপতি ও শরণখোলা উপজেলা কৃষকলীগের সভাপতি মো. আব্দুল ওয়াদুদ আকন বলেন, বনে আগুন দেয়া একটি বড় ধরণের নাশকতা। তাই দুর্বৃত্তায়নের হাত থেকে সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হলে বনবিভাগের জনবল বৃদ্ধিসহ বনরক্ষীদের আধুনিক বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি ২৪ ঘন্টা কঠোর নজরদারীসহ প্রভাবশালী চক্রকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তবে, চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বনসংরক্ষক (এসিএফ) মো. এনামুল হক বলেন, এবারের অগ্নিকান্ডে সুন্দবনের তেমন ক্ষতি হয়নি। তবে বনের কিছু অংশের লতা-পাতা পুড়ে গেছে। খরব পেয়ে তাৎক্ষনিক বনবিভাগ ও ফায়ার সার্ভিস যৌথ চেষ্টা চালিয়ে আগুন নেভাবো গেঝে। পাশাপাশি উর্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ইতোমধ্যে ৩ সদস্যের একটি তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে এবং বনের ওই এলাকায় নজরদারী বৃদ্ধি করা হয়েেেছ। আগুনের কারণ অনুসন্ধান করে আগামী সাত কর্ম দিবসের মধ্যে উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে একটি প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে।
তবে, বন সংলগ্ন জনবসতি এখন সুন্দরবনের জন্য অনেকটা হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ ব্যাপারে সুন্দরবন পুর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্তকর্তা (ডিএফও) মুহম্মদ বেলায়েত হোসেন জানান, শীঘ্রই সুন্দবনের জনবল সংকট দুর করে বনরক্ষীদের আরো দক্ষ করে গড়ে তোলার জন্য তাদের ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করা হবে। তাছাড়া মরে যাওয়া ভোলা নদী খননসহ সীমানায় কাঁটা তারের বেড়া দেয়ার জন্য একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে। পাশাপাশি আগুনসহ চোরা কারবারীদের গতি বিধির উপর নজর রাখতে সুন্দরবনের বিভিন্ন স্থানে ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া পুর্বে অগ্নিকান্ডের সকল ঘটনায় দোষীদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। আশা করি ওসব অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবে।