প্রথম ‘বাংলা ব্যাকারণ’ গ্রন্থের রচয়িতা মহান সাধক উইলিয়াম কেরি’র ২৬০তম জন্মবার্ষিকী


  প্রকাশিত হয়েছেঃ  04:39 PM, 16 August 2021

প্রথম ‘বাংলা ব্যাকারণ’ গ্রন্থের রচয়িতা মহান সাধক উইলিয়াম কেরি’

।। জেমস আব্দুর রহিম রানা।।

  ‘ যদি ঈশ্বরের কাছ থেকে বড় কিছু আশা কর, তবে ঈশ্বরের জন্য বড় কিছু কর’ এই মহান উক্তির জনক, প্রথম ‘বাংলা ব্যাকারণ’ গ্রন্থের রচয়িতা উইলিয়াম কেরি’র আজ ২৬০ তম জন্ম বার্ষিকী।
১৭৬১ সালের ১৭ আগস্ট ‘মহাত্মা উইলিয়াম কেরি’, ‘মহান সাধক উইলিয়াম কেরি’, এবং ‘ক্রুশের দাস উইলিয়াম কেরি’ জন্মগ্রহন করেন।
যুগে যুগে যাদের অবদানে বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়েছে, পরিপূর্ণতা লাভ করেছে, তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন উইলিয়াম কেরি। তারই প্রাণান্ত প্রচেষ্টায় বাংলা ভাষায় রচিত হয়েছিল বাংলা ভাষার প্রথম দিককার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলী।
ইংল্যান্ডের নর্দাম্পটন সায়ারের আন্তঃপাতী পারলাডস-পারি নামক গ্রামের এডমন্ড কেরী নামের এক দরিদ্র তাঁতি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে জড়িত থাকলেও আর্থিক অনটনের কারণে তাকে পড়াশোনা করাতে পারেননি। কাজ শিখতে পাঠিয়ে দেন পাশের গ্রাম হ্যাকলটনের ক্লার্ক নিকলসন নামক এক মুচির কাছে। তখন উইলিয়াম কেরির বয়স মাত্র ১২ বছর। এতো অল্প বয়সে রোজগারে নেমে পড়লেও তার মনে সবসময়ই পড়াশোনা শেখার প্রতি এক দুর্বার বাসনা ছিল। ঠিক করলেন কাজ ও পড়াশোনা দুটোই একসঙ্গে করবেন। সম্পূর্ণ নিজের প্রচেষ্টায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন পার করলেন তিনি সাফল্যের সঙ্গে।
শুধুমাত্র পড়তে হবে তাই পড়া, এমন কোনো মনোভাব ছিল না তার মধ্যে। তিনি জানার জন্য, শেখার জন্য পড়তেন। এরই প্রমাণ রাখলেন তখন, যখন তিনি স্থির করলেন যে, যে ভাষা থেকে ইংরেজি বাইবেল অনুবাদিত হয়েছে অর্থাৎ প্রাচীন হিব্রু ভাষা জানা চাই। পিছপা হলেন না কেরি। চেষ্টা করে রপ্ত করলেন পৃথিবীর কঠিনতম ভাষাটিকে। এরপর আয়ত্ত করলেন গ্রিক ভাষা। কারণ ততোদিনে তার মনে গ্রিক ভাষার বাইবেল পড়ার ইচ্ছা জেগেছে।
বিভিন্ন ভাষায় অসংখ্যবার বাইবেল পাঠ করে উইলিয়াম কেরির অন্তরে বাইবেলের বাণীগুলো গেঁথে গেলো। তার মন প্রভু যীশু খ্রীষ্টকে প্রচারের জন্য বিচলিত হয়ে উঠলো। তারই প্রেরণায় তারা কজন বন্ধু মিলে একটি মিশন গড়ে তুললেন। সেই মিশনেরই প্রতিনিধি হিসেবে জন টমাস নামক এক বন্ধুকে সঙ্গে করে সপরিবারে জাহাজযোগে বাংলাদেশে অর্থাৎ ভারতে আসেন কেরি।
কেরিকে প্রথম যে সমস্যাগুলোর সম্মুখীন হতে হয়, তার মধ্যে প্রথম ও প্রধান ছিল দরিদ্রতা। এ থেকে মুক্তির জন্য তিনি কলকাতা থেকে ২০ মাইল দূরে টাকির কাছে এক জঙ্গলে চাষাবাদের কাজ শুরু করেন। মালদহে এক নীলকর সাহেবের ম্যানেজার হিসেবেও বেশ কিছুদিন কাজ করেন। কিন্তু এতে করে তার এই দেশে আসার মূল লক্ষ্য পথভ্রষ্ট হতে থাকে। তাই তিনি ১৮০০ সালে কলকাতার শ্রীরামপুর মিশনে যোগদান করেন এবং জনগণের মধ্যে প্রভু যীশু খ্রীষ্টের প্রচার পুনরায় শুরু করেন।
ঐ একই সালে ভারতের তৎকালীন গর্ভনর লর্ড ওয়েলেসলি ভারতে আগত ইংরেজ রাজ কর্মচারীদের এদেশীয় ভাষায় শিক্ষাদানের জন্য ‘ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ’ নামে একটি কলেজ স্থাপন করেন। কলকাতায় থাকাকালীন কেরি শুধুমাত্র চাকরি না করে বাংলা ও সংস্কৃতির উপর পড়াশোনা করেন এবং স্বভাবজাতভাবেই বাংলাভাষাকে রপ্ত করে ফেলেন। তার এই পাণ্ডিত্যের কথা জানতে পেরে লর্ড ওয়েলসলি কেরিকে কলেজের বাংলা ও সংস্কৃত বিষয়ের প্রধান অধ্যাপক রূপে মাসিক এক হাজার টাকা বেতনের চাকরি প্রস্তাব করেন। প্রভু যীশু খ্রীষ্ট প্রচারণায় ব্যস্ত কেরি প্রথমে এ ব্যাপারে বেশ উদাসীন থাকলেও শিক্ষা প্রসারের কথা ভেবে ১৮০১ সালের ৪ মে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে যোগদান করেন।
উইলিয়াম কেরি ছিলেন অসাধারণ পরিশ্রমী, জ্ঞান পিপাসু মানুষ। সরাদিন কলেজে ছাত্রদের শিক্ষাদান, জনগণের মধ্যে প্রভু যীশু খ্রীষ্টকে প্রচার শেষে গভীর রাত পর্যন্ত জেগে তিনি হিন্দি, গুজরাটি, তামিল, তেলেগু, মারাঠি ও সংস্কৃত ভাষা রপ্ত করেছিলেন। আশ্চর্য হলেও সত্য যে এই উইলিয়াম কেরিই ১৮০১ খিস্টাব্দে প্রথম ‘বাংলা ব্যাকারণ’ গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। এ ব্যাকারণ গ্রন্থটিতে তিনি পদ, সন্ধি, অব্যয় প্রভৃতি আলোচনা ছাড়াও যুক্তবর্ণ ও শব্দ গঠন সম্পর্কে আলোচনা করেছিলেন। এছাড়া কলকাতার আশপাশের চলিত ভাষা নিয়ে ‘কথোপথন’ নামক একটি ভাষা রচনা করেছিলেন তিনি। এগুলো ছাড়াও তার সম্পাদিত ‘ইতিহাসমালা’ ও সঙ্কলিত ‘বাংলা ইংরেজি অভিধান’ বাংলা ভাষাভাষীদের বাংলাচর্চার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখে।
বাংলা গদ্যের গঠনের গোড়ার দিকে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বিভিন্ন বাঙালি পণ্ডিতকে  নানাবিধ সাহায্য ও অর্থানুকুল্য দিয়ে কেরি বাংলা গ্রন্থ রচনায় সক্রিয় সহযোগতি করেছেন। এছাড়া ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতমণ্ডলীর দ্বারা রচিত গ্রন্থমালায় বাংলা গদ্যের যে পরিচয় পাওয়া যায় তার নেপথ্যেও ছিলেন কেরি।
১৮৩৪ সালের ৯ই জুন ৭৩ বছর বয়সে জীবনাবাসন ঘটে বাংলা ব্যাকারণের পথিকৃৎ উইলিয়াম কেরির।
উইলিয়াম কেরি তার লিখিত বিভিন্ন চিঠিপত্রে বাংলা ভাষার ঐশ্বর্যের কথা উচ্ছাসিতভাবে লিখেছেন। ভালোবেসেছেন এই ভাষাকে, এই  দেশকে। দুঃখ, কষ্ট ও দরিদ্রতাকে যেমন তিনি জয় করেছিলেন ঠিক তেমনি কারায়ত্ত করেছিলেন এই ভাষার প্রতিটি বর্ণকে। পণ্ডিত  ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দোপধ্যায় বলেছেন – ‘উইলিয়াম কেরিকে বাদ দিয়ে বাংলা সাহিত্যের কথা চিন্তাও করা যায় না।”
পূর্ণেন্দু পত্রী তার ‘কলকাতার প্রথম’ এ লিখেছেন “এই ইংরেজ মিশনারি, কিন্তু বাংলা-অন্তপ্রাণ। বাংলার ভাষা, বাংলার ছাপা হরফ, বাংলার সাহিত্য, বাংলার গাছ-গাছালি, সব কিছুর জন্যেই তাঁর মনে অগাধ মায়া-মমতা” তিনি সনির্বন্ধ মিনতি করেছেন। তিনি অনুরোধ করেছেন। তিনি কষ্টসহকারে এগিয়ে চলেছেন। তিনি প্রতিকুল অবস্থায় অটলভাবে এগিয়ে গিয়েছেন। তিনি ক্লান্তিকরভাবে উপদেশ দিয়েছিলেন প্রচার করিছেন – নবযুগসৃষ্টিকর বার্তা, “ঈশ্বরের থেকে মহৎ বিষয় প্রত্যাশা কর, . . . ঈশ্বরের জন্য মহৎ বিষয় প্রচেষ্টা কর” (Expect Great things from God, Attempt great things for God’)
একজন সুসমাচার প্রচারক হিসাবে কেরি সাহেবের পথ উন্মুক্ত হলো। কিন্তু তিনি কোথায় যাবেন? কিন্তু ঈশ্বর কেরি সাহেবের জন্য ইন্ডিয়ার দিকে মনোযোগ করালেন। তাই ঈশ্বর কেরি সাহেবের সাথে সাক্ষাৎ করাবার জন্য ড: টমাসকে পাঠালেন, যিনি ইন্ডিয়াতে থাকতেন। কেরি সাহেব এই লোকটার উৎসাহে এবং পরামর্শে প্রভাবিত হলেন আর একজন সুসমাচার প্রচারক হিসেবে এ দেশে আসতে সিদ্ধান্ত নিলেন। নতুন হওয়া মিশনারি সোসাইটির চেয়ারম্যান আর অন্যান্য লোকেরা কেরি সাহেবকে ইন্ডিয়াতে একজন মিশনারি হিসাবে যাওয়ার জন্য প্রার্থনা এবং আর্থিক সহায়তার জন্য প্রতিশ্রুতি দিলেন। ৩৩ বছর বয়স কেরি সাহেব একজন মিশনারি হিসাবে ইন্ডিয়াতে যেতে সিদ্ধান্ত নিতে থাকলেন।
এরপর অনেকে অনেক পরিকল্পনা করতে থাকায় এবং কিছু কিছু বাধার কারনে দেরি হলেও সমস্ত উদ্বেগ আর ভয় কাটিয়ে কেরি সাহেব ও তার পরিবার এবং ড: টমাস সাহেবকে নিয়ে জাহাজে  চড়েন ১৩ই জুন ১৭৯৩। অশান্ত বিক্ষুব্ধ সমুদ্র আর একঘেয়ে সমুদ্র জীবনে, কেরি এবং তার স্ত্রী দুজনেই সমুদ্র-পীড়ায় ভোগেন। তার ছেলেরা সুস্থ থাকলেও, সমুদ্রের উপর একঘেয়ে জীবন তাদের অস্থির করে তোলে। তারা এক সময় প্রচণ্ড  ঝড় ও উত্তাল তরঙ্গের মধ্যে পড়ে। তবু ভয় আর আশা হতাশার দোলায়মান অবস্থায় তারা এই বিক্ষুব্ধ অবস্থা পার হয়ে শেষ পর্যন্ত নভেম্বর মাসের গোড়ার দিকে হুগলি নদীর মোহনায় ঢোকেন। কেরি সাহেবের সাথে ছিল তার স্ত্রী (ডরোথী), তার চার ছেলে (ফেলিক্স, উইলিয়াম,  পিটার, জবেজ ) ও তার স্ত্রীর বোন (কিটি) । এদের কেউই কিন্তু সুসমাচার প্রচারে ভারতের লোকদের জয় করতে কেরি সাহেবের আগ্রহে অংশীদার হয়নি। তার বন্ধুরা এবং তার চিন্তার বিষয়ে যা তার বিদেশী মাটিতে পা রাখতে ছিল অস্থির। তার সাথে ছিল অল্প কিছু টাকা যা তাকে সমর্থন দিতে পারে। কিন্তু কেরি ছিলেন অত্যন্ত আগ্রহী এবং আশান্বিত। তিনি জাহাজে দীর্ঘ সমুদ্র যাত্রাকালে বাংলা ভাষা শিখতে শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি হিন্দি, ফার্সি, সংস্কৃত, মারাঠি ভাষা শিখেছিলেন।  ইন্ডিয়াতে অবতরণের পর কিছুদিন যেতেই তিনি ভারতের লোকদের কাছে প্রচার শুর করেন আর বাংলায় শাস্ত্র অনুবাদ শুরু করেন। একথা অবশ্যই ঠিক যে ঈশ্বর তাকে একাজের জন্য ভাষাগুলো ভালোবাসতে প্রস্তুত করেছিলেন।
ইন্ডিয়াতে প্রথম বছরেই তার পরিবারের সবাই একের পর এক জ্বর ও আমাশায় অসুস্থ হয়ে পরেন। তার পাঁচ বছরের ফুটফুটে ছোট ছেলে পিটার অকালে পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়। কোনো হিন্দু কিংবা মুসলমান কবর খোঁড়তে চাইলো না তাই কেরি সাহেব নিজেই অসুস্থ ও দুর্বল অবস্থায় নিজের ছেলের জন্য কবর খোঁড়তে শুরু করলেন। এক পর্যায় দুজন লোক তাকে সাহায্য করলেন আর বহু কষ্টে অবেশেষে চোখের জলে পিটারকে সমাহিত করা হয় আর আর ঐ লোকদেরকে কেঁদে কেঁদে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন।
কেরি সাহেবের সাত বছর কঠোর পরিশ্রমে অবশেষে কৃষ্ণ পাল নামে একজন ভারতীয় যিনি খ্রীষ্টকে গ্রহণ করলেন এবং অনেক বিরুদ্ধতার মুখে তাকে বাপ্তিস্ম দেওয়া হয়ছিল। কৃষ্ণ পাল ছিলেন প্রথম ভারতীয় বিশ্বাসী এবং তার পেশা ছিল কাঠের কাজ করা। কৃষ্ণ পাল এবং কেরির ছেলে ফীলিক্সকে একই দিন বাপ্তিস্ম দেওয়া হয়েছিল। পরে কৃষ্ণ পাল প্রথমে কোলকাতা ও পরে আসামে প্রথম বাঙ্গালী মিশনারি হয়েছিলেন। তিনিই প্রথম বাংলায় ধর্ম সংগীত লেখেন।
বাংলা ভাষায় বাইবেল অনুবাদ করে কেরি গুরুদায়িত্ব পালন করেন। এতে খ্রীষ্টিান ধর্মপ্রচারক হিসাবে কেরির আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ হয়েছিল। লর্ড ওয়েলেসলির নবগঠিত কলেজকে কেন্দ্র করেই তাঁর কর্মক্ষেত্রের বিস্তার ঘটে। তিনি এখানে প্রথম ভাষা প্রবর্তনের গৌরব অবশ্যই লাভ করবেন। শুধু তাই নয়, তিনিই প্রথম ঐ কলেজে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপকের পদ অলঙ্কৃত করেন। এই সময় তিনি, পাঞ্জাবী, ওড়িয়া, মাদ্রাজী, মারাঠী, তেলেগু প্রভৃতি ভাষা শিক্ষা করেন। তাছাড়া গ্রিক, ল্যাটিন ও হিব্রু তিনি জানতেন। এই তিনটি ভাষা ও অন্যান্য ভাষাগুলোতে তিনি ব্যাকরণ রচনা করেছিলেন। ফোর্ট উইলিয়ম কলেজে এসে তাঁর কাজকর্মেও অনেক সুবিধা হয়েছিল এবং বাংলা শিক্ষিত ইংরেজ বলে তাঁর যথেষ্ট সম্মান ও প্রতিপত্তিও বৃদ্ধি পেয়েছিল। তুলানামূলক হিসাবে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে কেরির প্রাপ্ত খ্যাতি ও স্বীকৃতি প্রচারক হিসেবে তাঁর খ্যাতি ও স্বীকৃতিকে ম্লান করে দিয়েছিল। তাঁর জীবিতকালেই ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের গৌররেব যুগ গেছে।
তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যেও ক্ষেত্রে নানারকম পরীক্ষা করেছিলেন। তারই ফলে তাঁর ‘কথোপকথন’, ‘ইতিহাস মালা’ প্রভৃতি পুস্তক তিনি রচনা করেন। বাংলা প্রবাদ বাক্যের সঙ্কলন তাঁর অভিনব কীর্তি। তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি তাঁর রচিত অভিধান। দুটি গ্রন্থই দুটি করে খন্ডে সমাপ্ত। অভিধান ২ খণ্ডের দাম তৎকালে – ২০০ টাকা।
ফোট উইলিয়াম কলেজের প্রতিষ্ঠাতা লর্ড ওয়েলেসলিকে সম্বোধন করে উইলিয়াম কেরি সংস্কৃত ভাষায় এক বক্তৃতা দেন। তাঁর এই ভাষণে নিজের সম্বন্ধে তিনি একশটি মূল্যবান তথ্য প্রকাশ করেন।
“হিন্দুদের মধ্যে দীর্ঘকাল বাস করিয়া আমি এখন বৃদ্ধ হইয়াছি। . . . বঙ্গীয় ভাষা এখন আমার মাতৃভাষার মতই আয়ত্ব হইয়াছে। এই সুদীর্ঘকাল এদেশবাসীদের সহিত এখানে (বঙ্গ দেশ) এবং এই সাম্রাজ্যেরেও ঘনিষ্ঠতার ফলে আমার এখন সকল বিষয় জানিবার সুযোগ হইয়াছে, যাহা ইতিপূর্বে কদাচিৎ কাহারও হইয়াছে কিনা সন্দেহ। আমি এখন নিঃসংশয়েই বলিতে পারি যে, এদেশের রীতিনীতি, আচার ব্যবহার সংস্কার এবং হৃদয়াবেগের সহিত আমি এমনই পরিচিত হইয়াছি যে, সময়ে সময়ে নিজেকেই এদেশী বলিয়া সন্দেহ হয়।”
কেরির বক্তৃতার এই অংশটুকু এইজন্য মুল্যবান যে, তাঁর স্বরূপটি তাঁর নিজ বক্তব্যেও মধ্যে ফুটে উঠেছে এবং এর চেয়ে সত্য কথা তাঁর সম্বন্ধে আর কেউই বলতে পারতনা। এখানেই তাঁর এদেশে আসার বাসনা, ধর্মপ্রচারের এষণা, শিক্ষার প্রতি অনুরাগ যাবতীয় ব্যাপারের মূল সুত্রটি রয়েছে। অবশ্য প্রথমদিকে কেরির মধ্যেও কিছু কিছু সঙ্কীর্নতা ছিল। কিন্তু একথাও স্বীকার করতে হয় যে, এদেশের সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে তাঁর কল্যাণ হস্ত সর্বদাই প্রসারিত ছিল। সতীদাহ নিবারণ ব্যাপারে বৃদ্ধ বয়সেও যতখানি সক্রিয় অংশ গ্রহণ করেছিলেন, তা ভাবলে বিস্মত হতে হয়। সারা জীবন ধরে নানা ভাষা ও জ্ঞান বিজ্ঞানের অনুশীলন করতে করতে এই অনুসন্ধিৎসু মহৎ প্রাণের সমাপ্তি ঘটে ১৮৩৩ খ্রীষ্টাব্দের ৯ই জুন।
যখন কেরি ১৮৩৪ সালে ৭৩ বছর বয়সে মারা যান। তিনি চল্লিটি ভাষায় শাস্ত্রের অনুবাদ এবং ছাপানো দেখে যান। তিনি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের অধ্যাপকের পদে ছিলেন। তিনি শ্রীরামপুরে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি মিশনারিদের জন্য ইন্ডিয়ার দ্বার উন্মুক্ত দেখে গেছেন। তিনি সহমরণ-প্রথা (স্বামীর চিতায় বিধবার আগুণে পুড়ে মরা) আইন নিষিদ্ধ দেখে গেছেন। তিনি খ্রীষ্টের প্রতি মন পরিবর্তনকারীদের দেখে গেছেন।
কেরি সাহেব তার মৃত্যুশয্যায় তার একজন মিশনারি বন্ধুকে উদ্দেশ্য করে বলে ওঠেন, “ড, ডাফ! তুমি কেরির প্রশংসা করছ, যখন আমি চলে যাব, তখন কেরির প্রশংসা করো না – তুমি কেরির ঈশ্বরের প্রশংসা করো” তিনি এমনও বলেছিলেন যে আমি যখন থাকবো না, তখন আমার কথা বোল না। আমার স্বর্গস্থ পিতার কথা বোলো। তাঁর নাম নিয়ে মাতামাতি হোক এটা তিনি চাননি, চেয়েছিলেন, ‘শুধু মনে রেখো আমার কাজ কে, আমাকে নয়’। তার মর্মর মূর্তি বা তার নাম দিয়ে কিছু হোক এ তিনি চাননি। নামে নয় কাজে তিনি বেঁচে থাকতে চেয়েছিলেন।
অনেকেরই মতে, মিশনসমুহের মিনিস্ট্রিতে একটি “অনন্য ব্যক্তিত্ব, সমকালীন ব্যক্তি এবং উত্তরসূরি উভয়ের থেকে অধিকতর উচ্চে” এটা ছিল কেরির প্রতীক উপাধি। 

 

© লেখক :  জেমস আব্দুর রহিম রানা।(সাহিত্যিক ও গণমাধ্যমকর্মী )

সহ-সম্পাদক, এবিসি বাংলা ৭১ ডটকম,
প্রধান প্রতিবেদক, সাপ্তাহিক পল্লী কথা,
স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক নাগরিক ভাবনা ও সদস্য – বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম বিএমএসএফ।
মোবাইল : 01300832868,
ইমেইল : ranadbf@gmail.com

অন্যান্য

আপনার মতামত লিখুন :