পূবালী ব্যাংক নিলামে তুলছে কেয়া লিমিটেড কসমেটিকসের সম্পত্তি

41

অনাদায়ী খেলাপি ঋণ পরিশোধ না করায় কেয়া কসমেটিকসের বিরুদ্ধে এবার কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে পূবালী ব্যাংক লিমিটেড।

সম্প্রতি কেয়া কসমেটিকসের বিভিন্ন অবকাঠামোসহ কারখানার মালামাল, ভবন ও যন্ত্রপাতি নিলামে তোলার বিজ্ঞাপন দিয়েছে ব্যাংকটি।

পূবালী ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী কেয়া কসমেটিকসের বিভিন্ন বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স রয়েছে। এসব অ্যাপার্টমেন্টে বেশ পরিমাণে বিদেশি রাষ্ট্রদূতরা বসবাস করেন। এসব সম্পত্তির মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ২৭০ কোটি টাকা। আগ্রহী ক্রেতাদের আগামী ২৪ মের মধ্যে আবেদনের অনুরোধ করেছে পূবালী ব্যাংক।

জানা গেছে, নিলামের তফসিলের মধ্যে রয়েছে কেয়া গ্রুপের ফ্ল্যাগশিপ সংস্থা কেয়া কসমেটিকস লিমিটেড, কেয়া ইয়ার্ন মিলস লিমিটেড এবং এর প্রতিষ্ঠাতা আবদুল খালেক পাঠান ও তার পরিবারের সদস্যদের সম্পত্তি।

এ প্রসঙ্গে পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাফিউল আলম খান চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, সময়মতো কেয়া কসমেটিকস খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যর্থ হয়েছি। তাই আমরা কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছি। ব্যাংকের যে কোনো টাকা উদ্ধারে কঠোর হওয়া আমাদের দায়িত্বের একটি অংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী খেলাপি ঋণ আদায়ে কিছু বিধান আছে। আমরা সে অনুযায়ী কাজ করছি।

কেয়া গ্রুপের চিফ ফিন্যান্সিয়াল অফিসার হুমায়ুন কবির বলেন, মহামারির কারণে আমরা সময়মতো লোনের টাকা পরিশোধ করতে পারিনি। আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। ব্যাংকের সঙ্গে আমাদের কিছুটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। আশা করছি, তারা নিলামের এই বিজ্ঞাপন প্রত্যাহার করে নেবে।

একটি কোম্পনি কত দ্রুত বাজারে উঠে আসতে পারে ও পতনের শিকার হয় তার একটি উল্লেখযোগ্য প্রমাণ হলো কেয়া গ্রুপ। ৯০ এর দশকে কেয়া গ্রুপের মালিক আব্দুল খালেক পাঠানের হাত ধরে কোম্পানিটির যাত্রা শুরু হয়। সাবান ও ডিটারজেন্ট পাউডারের মাধ্যমে ২০০০ সালের দিকে কেয়া গ্রুপ দেশের শীর্ষ স্থানীয় একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। তবে পরিকল্পনাহীনতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে এর পতন হতেও বেশি সময় লাগেনি।

এর আগে, ২০১৮ সালেও অনাদায়ী খেলাপি ঋণ পরিশোধ না করার দায়ে কেয়া কসমেটিকসের গাজীপুরের কারখানার মালামাল, ভবন ও যন্ত্রপাতি নিলামে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিল রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক লিমিটেড। সে বছরের ২৬ জুন কোম্পানিটির সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে ঋণের অর্থ আদায়ের ঘোষণা দেয় ব্যাংকটি।

এ ছাড়া ২০১৭ সালের ২০ আগস্ট রাজধানীর সেগুনবাগিচা এলাকা থেকে কেয়া গ্রুপের মালিক আবদুল খালেক পাঠানকে গ্রেফতার করে দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তারা। কেয়া ইয়ার্ন মিলস লিমিটেডের নামে কৃষি ব্যাংক থেকে ১১১ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাতের মামলায় তাকে গ্রেফতার  করা হয় ৷

১৯৮৪ সাল থেকেই রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করছেন আবদুল খালেক পাঠান। ব্যবসার পরিসর বাড়াতে ঋণ নেন অন্যান্য ব্যাংক থেকেও। এখন পর্যন্ত কেয়া গ্রুপের কাছে বিভিন্ন ব্যাংকের ঋণের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি সাউথইস্ট ও পূবালী ব্যাংকের ঋণই দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি। কোনো কোনো ব্যাংকের ঋণ খেলাপি হয়ে গেলে পুনঃতফসিলের মাধ্যমে নিয়মিত রাখার চেষ্টা করছে গ্রুপটি।

কেয়া গ্রুপের কাছে সবচেয়ে বেশি ঋণ রয়েছে সাউথইস্ট ব্যাংকের। ২০১৭ সাল শেষে গ্রুপটির কাছে সাউথইস্টের ঋণ ছিল ৯৬৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ফান্ডেড ৪৪৬ কোটি ও নন-ফান্ডেড ৫১৮ কোটি টাকা।

সাউথইস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এম কামাল হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, কেয়া গ্রুপকে আমরা ঋণ দিয়েছিলাম মূলত তুলার ওপর। তুলা আমদানি করে সুতা উৎপাদন ও সে সুতায় তৈরি পোশাক রফতানির জন্যই কেয়া গ্রুপকে আমরা এ ঋণ দিয়েছিলাম। গ্রুপটিকে দেয়া অর্থ ও ব্যাংকের কাছে জামানত থাকা সম্পদের মধ্যকার ব্যবধান এখন কাছাকাছি।

কেয়ার রফতানি আয় থেকে প্রতি মাসেই কিছু কিছু অর্থ সমন্বয় করে ব্যাংকের টাকা আদায় করা হচ্ছে। কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করে এ বছরের মধ্যেই আমাদের ১৮০ কোটি টাকা পরিশোধ করার কথা রয়েছে। কেয়া গ্রুপের কারখানায় নতুন মেশিনারি আমদানির জন্য আমরা কিছু বিনিয়োগ করেছি। আশা করছি, গ্রুপটি ঘুরে দাঁড়াবে এবং ব্যাংকের দায় পরিশোধে সক্ষম হবে।

ঋণ পরিশোধ না করার কারণে একসময় ব্যাংকগুলো কেয়া গ্রুপকে আর অর্থায়ন করতে রাজি হচ্ছিল না। এতে ব্যবসা পরিচালনা করতে সমস্যায় পড়ে গ্রুপটি। কোনো উপায় না দেখে খালেক পাঠান রাজধানীর গুলশানের বাড়ি ও কারখানার জমি পূবালী ব্যাংকের কাছে বন্ধক রেখে ঋণ নেন। গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কেয়া গ্রুপের কাছে পূবালী ব্যাংকের পাওনা ৫৮১ কোটি টাকা। বড় অংকের এ বিনিয়োগ নিয়ে বিপাকে আছে ব্যাংকটি।

জানতে চাইলে পূবালী ব্যাংকের এমডি মো. আব্দুল হালিম চৌধুরী বলেন, কেয়া গ্রুপ এখন আপসের পথে আছে। এর আগে আবদুল খালেক পাঠান বর্তমান মানসিকতায় থাকলে গ্রুপটি এতটা খারাপ পরিস্থিতিতে পড়ত না। কেয়া গ্রুপকে দেয়া ঋণের বিপরীতে গুলশানের বাড়ি, কারখানাসহ পর্যাপ্ত জামানত পূবালী ব্যাংকের কাছে জমা আছে। গ্রুপটিকে দায় পরিশোধের জন্য ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় দেয়া হয়েছে। আমাদের কাছে জামানত থাকা কেয়া গ্রুপের বেশকিছু শেয়ার বিক্রি করে ঋণের সঙ্গে সমন্বয় করেছি। আশা করছি, বাকি অর্থও আদায় করা সম্ভব হবে।

ব্যাংকের ঋণে আবদুল খালেক পাঠান গুলশানের বিলাসবহুল ওই বাড়ি নির্মাণ করেছেন কিনা, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে কৃষি ব্যাংকের ১১১ কোটি টাকার ঋণ আত্মসাতের ঘটনার সময় বাড়িটির নির্মাণ চলছিল। গুলশান ২-এর ৫৯ নম্বর সড়কে এক বিঘা জমির ওপর খালেক পাঠানের সাদা রঙের ১৩ তলা বাড়িটি অবস্থিত। সরেজমিন দেখা যায়, সুবিশাল ভবনের উপরে হেলিপ্যাড। প্রতি তলার আয়তন আট হাজার বর্গফুট। সে হিসাবে ভবনটির মোট আয়তন ১ লাখ ৪ হাজার বর্গফুট। বাড়িটিতে খালেক পাঠান ছাড়াও বেশ কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রদূতরা ভাড়া নিয়ে থাকছেন।

ব্যাংকের টাকায় বাড়ি নির্মাণের পাশাপাশি ইউরোপ-আমেরিকায় ঋণের অর্থ পাচারের অভিযোগও আছে কেয়া গ্রুপের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। যদিও এ অভিযোগ অস্বীকার করেন আবদুল খালেক পাঠান।  তিনি বলেন, লোকে এ ধরনের অনেক কথাই বলে। এসব শোনা কথায় কান দিতে নেই। আমি বিদেশে কীভাবে অর্থ পাচার করেছি সেটার প্রমাণ দিক। আমি ৬০০ টাকা মূলধন নিয়ে ব্যবসা করা উদ্যোক্তা। চাইলেই আমি দেশের বাইরে পালিয়ে যেতে পারতার কিন্তু আমি যাইনি। আর কখনো যাবও না। আমি সৎভাবে ব্যবসা করেছি এবং এভাবেই ব্যবসা করে যেতে চাই। আমার কাছে নগদ অর্থের সংকট থাকায় অনেক আগে গুলশানে কিনে রাখা জমিতে বাড়ি করতে পারিনি। ১০-১২ বছর ধরে একটু একটু করে বাড়িটি করেছি। উপায় না দেখে ব্যাংকের কাছে বাড়িটি বন্ধক রেখে ব্যবসার জন্য টাকা চেয়েছিলাম। কিন্তু ব্যাংক ৩১৫ কোটি টাকা দেয়ার কথা বলে ২১৫ কোটি টাকার বেশি দেয়নি। বাড়ির কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পর এখন ব্যাংকের নজর এর ওপর পড়েছে। এ কারণে তারা আমাকে অসহযোগিতা করেছে যাতে কৌশলে বাড়িটি দখল করতে পারে।

সাউথইস্ট, পূবালী ছাড়াও ডাচ্-বাংলা, ন্যাশনাল, স্ট্যান্ডার্ড, ব্যাংক এশিয়া ও ইউনিয়ন ক্যাপিটাল থেকেও ঋণ নিয়েছেন আবদুল খালেক পাঠান। ব্যাংকঋণ বাড়তে থাকার মধ্যেই ২০১১ সালে ব্যবসায়িকভাবে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন তিনি।