নিজের লেখা গান গেয়ে সাড়া ফেলেছেন ইনামুল

*আলমসাধু চালক হয়েও বিশ্বের ১৯৫টি দেশের নাম তার মুখস্থ

এবিসি বাংলা ডেস্কএবিসি বাংলা ডেস্ক
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  12:35 PM, 04 September 2021
নিজের লেখা গান গেয়ে সাড়া ফেলা ইনামুল

একটি কোম্পানির আলমসাধু চালিয়ে সংসার চালান। কিন্তু নেশা তার গান। তাৎক্ষণিক যেকোনো বিষয়ের উপর ছন্দ মিলিয়ে গান তৈরি করতে পারেন। এখন পর্যন্ত তার নিজের লেখা ও সুরে প্রায় অর্ধশত আঞ্চলিক গান পরিবেশন করে সাড়া ফেলেছেন এলাকায়। ইতোমধ্যে তার গাওয়া কয়েকটি গান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। সেই সাথে বিশ্বের ১৯৫টি স্বাধীন দেশের নাম মুখস্থ বলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। সংসারের শত অভাব অনটন ভুলে মনকে ভালো রাখতে সবসময় গান নিয়েই থাকেন তিনি। অদম্য প্রতিভার সেই মানুষটি যশোরের বাঘারপাড়ার রায়পুর ইউনিয়নের ভাতুড়িয়া গ্রামের মোনছের আলী মোল্যার ছেলে ইনামুল কবির।

‘সোনার বাংলা স্বাধীন হইলো গো, শুধু সোনার মানুষটি রইল না। বঙ্গবন্ধুকে ওরা বাঁচতে দিল না।’ ‘শোনেন দেশের জনগণ, করি আমি নিবেদন, করোনার টিকা দিয়া অবশ্যই প্রয়োজন’ এই রকম প্রায় অর্ধশত গান নিজে নিজে তৈরি করে গেয়েছেন ইনামুল কবির। শুধু গান নয়, মাঝে মাঝে বিনোদনও দিয়ে থাকেন তিনি। আর্থিক সমস্যা আর অভাব অনটনের কারণে অনেকটা দিশেহারা তিনি। এভাবে ছন্দ মিলিয়ে গান গাওয়া বাদ দেয়ার জন্য তার মেয়ে নিষেধ করেছেন। কিন্তু গান তাকে ছাড়ে না। নিরিবিলি থাকলেই শুরু করে দেন গান। এরই সূত্র ধরে ছন্দ মিলিয়ে পুনরায় আবার গান গেয়েছেন ইনামুল কবির। ‘ও আমি গান বাজনা আর গাব না, ও গান গাতি হয় সব গাটির খায়ে, তার থেকে বড় কথা হলো বারন দেছে আমার মায়ে’। এই গানটি ফেসবুকে পোস্ট করা মাত্রই মুহুর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়। ফেসবুক ব্যবহারকারীরা এভাবে ছন্দ মিলিয়ে শত শত গান উপহার দেয়ার জন্য মন্তব্য করেছেন।

এবিষয়ে কথা হয় ইনামুল কবিরের সাথে। তিনি বলেন, অল্প বয়সে সংসারের হাল ধরার কারণে ৮ম শ্রেণি পাশ করার পর আর পড়াশোনা করতে পারিনি। দেনা পরিশোধ করতে জায়গা জমি সব বিক্রি করে দিয়েছি। এখন ভিটা মাটি আর জরাজীর্ণ একটা আধাপাকা ঘরে পরিবারের ৪ সদস্য নিয়ে বসবাস করর্ছি। মানসিক টেনশন আর আর্থিক সমস্যার কারণে মন ভালো রাখতে নিজে নিজে গান বানিয়ে সেগুলো গেয়ে মানুষদের শুনায়। শিল্পী নকুল কুমার বিশ^াসের ভক্ত আমি। তার গাওয়া অনেকগুলো গান গাইতে পারি। তাকে দেখেই যেকোনো বিষয়ের উপর ছন্দ মিলিয়ে গান তৈরি করা শিখতে পেরেছি। শিল্পী নকুল দাদা যদি পারেন, তাহলে আমি কেন পারবো না এই কথা মাথায় রেখে ২০/২৫ বছর ধরে গান গাওয়া শুরু করেছি। আমি বড় কোনো শিল্পী হতে চাই না। মানুষের দোয়া ভালোবাসা পেলে অবশ্যই আরো নতুন কিছু উপহার দিতে পারবো। গানগুলো ছেলে ইলিয়াজ ফেসবুকে আপলোড করে। গানশুনে কিছু দিন আগে চৌগাছা থেকে কয়েকজন ছুটে আসেন। কয়েকটি গান তারা ভিডিও করে নিয়ে গিয়েছেন। তিনি আরো বলেন, অভাবের সংসার। মুস্কান কোম্পানির মাল ডেলিভারি গাড়ি (আলমসাধু) চালাই। দিন ওয়ারি পারিশ্রমিক দেয় কোম্পানি। চাল-ডাল সব কিনে খেতে হয়। করোনাকালে অনেক কষ্টে দিন পার করছি। কিছু খাদ্য সামগ্রী হলে কয়েকদিন ভালোভাবে খেয়ে বাঁচতে পারতাম।
খাজুরা এলাকার বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন জানিয়েছেন, আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করে ইনামুল ভাই গান গেয়ে থাকেন। তাঁর গাওয়া সকল গান শুনি। গানগুলো ভালো লাগে। আমি তার একজন ভক্ত। আশাপাশের ভিতর এমন ছন্দ মিলিয়ে গান গাওয়া লোক নেই।

শালবরাট এলাকার বাসিন্দা ফয়সাল আহম্মেদ জানিয়েছেন, ইনামুল চাচার ভিতর যে এত মেধা লুকিয়ে ছিলো, আমাদের জানা ছিলো না। বিশে^র ১৯৫টি দেশের নাম মনে রাখা, তাৎক্ষণিক যেকোনো বিষয়ের উপর ছন্দ মিলিয়ে গান গাওয়া যে কারোর পক্ষে সম্ভব না। তাঁর গাওয়া গানগুলো ফেসবুকে ভাইরাল হচ্ছে। অনেক সাড়াও পড়ছে। এভাবে করতে থাকলে ইনামুল চাচা ভালো জায়গায় পৌঁছে যাবে বলে আমার বিশ্বাস।
বাঘারপাড়া শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক মুন্সি বাহার উদ্দীন বলেন, অবশ্যই ইনামুল প্রশংসার দাবিদার। ইতোমধ্যে ফেসবুকের মাধ্যমে তার গাওয়া কয়েকটি গান শুনেছি। তার ভিতরে এতো প্রতিভা আছে আমাদের জানা ছিল না। তার মতো অনেকেই গ্রাম অঞ্চলে রয়েছে। এগুলো তুলে ধরতে হবে। তিনি আরো বলেন, ইনামুল কোনো ধরণের সহযোগিতা চাইলে শিল্পকলা একাডেমির পক্ষ থেকে করা হবে।
রায়পুর ইউপি চেয়ারম্যান মঞ্জুর রশিদ স্বপন জানান, আমার ইউনিয়নের ছেলে ইনামুল। শুনেছি গান গেয়ে ফেসবুকে ভালো একটা জায়গা করে নিয়েছেন। আমি নিজেও তার গান শুনেছি। ভালো প্রতিভা আছে তার ভিতর। তিনি আরো বলেন, ইনামুলকে সকল ধরণের সহযোগিতা করা হবে।

আপনার মতামত লিখুন :