দেশের সড়ক -মহাসড়কে ঝুঁকিপূর্ন অবস্থায় রয়েছে হাজার হাজার সেতু-কালভার্ট

10

বাংলাদেশে বেশিরভাগ সেতুগুলো সাধারনত নির্মাণের ত্রুটি বা অতিরিক্ত ভারবাহী ট্রাকের কারনে ক্ষতিগ্রস্ত হয় , আবার যানবাহনের দুর্ঘটনা ঘটলেও অনেক সময়  সেতু-কালভার্ট ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে যায় ৷ যথাযথ রক্ষনাবেক্ষনে  অভাবে এবং সঠিক  সময়ে    মেরামত না করায় অনেক সেতু ই ঝুঁকিপূর্ন বা বিপদজনক হয়ে পড়ে ৷   দেশজুড়ে সড়ক-মহাসড়কে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে হাজার হাজার সেতু-কালভার্ট।

বন্যা, নকশা ও নির্মাণত্রুটি, গাড়ির ধাক্কা, অতিরিক্ত ওজনের গাড়ি চলাচলসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগের কারণেই সেতু-কালভার্টগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

যদিও সড়ক ও জনপথ অধিদফতর সংশ্লিষ্টদের দাবি, সেতু যে কারণেই ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠুক না কেন তা মেরামতের উদ্দেশ্যে তথ্য সংগ্রহের কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে। সওজ অধিদফতর সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সওজ অধিদপ্তর দেশের কোন সেতু কী অবস্থায় রয়েছে তা জানতে একটি সফটওয়্যার চালু করেছে। ‘ব্রিজ মেইনটেন্যান্স ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ বা বিএমএমএস নামের এ সফটওয়্যারের মাধ্যমে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) সহায়তায় আওতাধীন সেতুগুলোর হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত নতুন-পুরনো মিলিয়ে ২১ হাজার ৪৯২টি সেতুর হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। ওসব সেতুকে এ, বি, সি ও ডি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে। তার মধ্যে এ ক্যাটাগরিতে থাকা সেতুর সংখ্যা ১৩ হাজার ৫৩৩টি।

এসব সেতু ভালো অবস্থায় রয়েছে। বি ক্যাটাগরিতে রয়েছে ২ হাজার ৯৩৩টি সেতু। সেগুলো হালকা ক্ষতিগ্রস্ত আর ‘মেজর এলিমেন্টাল ড্যামেজ’ থাকা সেতুগুলোকে সি ক্যাটাগরিতে ফেলা হয়েছে। এ ধরনের সেতুর সংখ্যা ৩ হাজার ৯৩০। আর ‘মেজর স্ট্রাকচারাল ড্যামেজ’ থাকা সেতুগুলোকে ডি ক্যাটাগরিতে ফেলা হয়েছে। সওজ অধিদপ্তরের নেটওয়ার্কে থাকা ডি ক্যাটাগরির সেতুর সংখ্যা ১ হাজার ৯০। সি ও ডি ক্যাটাগরিতে থাকা ৫ হাজার ২৬টি সেতু ও কালভার্ট রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। আর জাতীয় মহাসড়কেই ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় থাকা ৭৫২টি সেতুর অবস্থান। আঞ্চলিক মহাসড়কে ঝুঁকিপূর্ণ সেতু রয়েছে ১ হাজার ১৯৩টি। আর দেশের জেলা মহাসড়কগুলোতে বাকি ৩ হাজার ৮১টি সেতুর অবস্থান।

সূত্র জানায়, ঢাকার পোস্তগোলা সেতু চলতি বছরের জুনে সদরঘাটে লঞ্চডুবির ঘটনায় উদ্ধারকাজে অংশ নিতে আসা একটি জাহাজের ধাক্কায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারপর থেকে সেতুটি দিয়ে সীমিত পরিসরে যানবাহন চলছে। এখনো ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথে থাকা সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

দেশের অন্যতম ব্যস্ত মহাসড়ক ঢাকা-চট্টগ্রাম-টেকনাফ। বছর তিনেক আগে ঢাকা-চট্টগ্রাম অংশ চার লেনে হয়েছে। নতুন করে নির্মিত হওয়ায় এ অংশে একটিও ঝুঁকিপূর্ণ সেতু নেই। তবে মহাসড়কটির চট্টগ্রাম-টেকনাফ অংশে ঝুঁকিপূর্ণ সেতুর সংখ্যা ১৭টি। ওই তালিকায় কক্সবাজারের চকরিয়ায় ৩০০ মিটার দীর্ঘ মাতামুহুরী সেতুও রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ওই সেতুটি জাপানের অর্থায়নে পুননির্মাণ করা হচ্ছে। যার কাজ ২০২১ সালে শেষ হওয়ার কথা।

তাছাড়া ঢাকা-সিলেট-তামাবিল জাতীয় মহাসড়কও চার লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়ে সরকার এগুলেও তা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ওই মহাসড়কটিতে ঝুঁকিপূর্ণ সেতু ও কালভার্টের সংখ্যা ৫১টি। একইভাবে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ৪০টি, জয়দেবপুর-জামালপুর মহাসড়কে ২০টি, ঢাকা-রংপুর-পঞ্চগড় মহাসড়কে ১০৭টি, সিরাজগঞ্জ-রাজশাহী মহাসড়কে ৪টি, রাজবাড়ী-খুলনা মহাসড়কে ৪৮ ও ঢাকা-বরিশাল-পটুয়াখালী মহাসড়কে ৫৫টি ঝুঁকিপূর্ণ সেতু রয়েছে। দেশের প্রধান ৮টি জাতীয় মহাসড়কের এ চিত্র। বাকি জাতীয় মহাসড়ক, আঞ্চলিক ও জেলা মহাসড়কে বিদ্যমান সেতুগুলোর অবস্থা আরো নাজুক।

সূত্র আরো জানায়, দীর্ঘদিন ধরেই নড়বড়ে অবস্থায় রয়েছে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের শেরপুর সেতু। সওজ বিভাগ সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী রিতেশ বড়ুয়ার মতে, ওই সেতুটি অনেক পুরনো। ভারী যানবাহন যেমন ওই সেতু দিয়ে চলাচল করছে, তেমনি ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত গাড়িও চলছে। কয়েক দফায় সেতুটির স্ল্যাব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সওজ মেরামতের মাধ্যমে সেতু যান চলাচলের উপযোগী রাখার চেষ্টা করছে। আর ঝুঁকিপূর্ণ হলেও বর্তমানে এ সেতু দিয়ে যানবাহন চলাচল করছে।

এদিকে এ প্রসঙ্গে সওজ’র পরিকল্পনা, নিরীক্ষণ ও মূল্যায়ন সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবু হেনা মোহাম্মদ তারেক জানান, শুরুতে জাইকার সহায়তায় সেতুগুলোর হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। বর্তমানে নিজস্ব অর্থায়নে এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। এ কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য হলো সেতুগুলোর হেলথ মনিটরিং। সেতুগুলোর বর্তমান অবস্থা নিরূপণ করা।

সেতুগুলোর বাস্তব অবস্থা জেনে সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণ বা সংস্কারে কী ধরনের অর্থ ব্যয় হবে, এ কার্যক্রমের মাধ্যমে তার একটা ধারণাও পাওয়া যাবে। তাতে পরবর্তী সময়ে সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত কিংবা পুননির্মাণের মতো সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণ করা যাবে। আর সফটওয়্যারে সেতুর তথ্য হালনাগাদের প্রক্রিয়াটি চলমান থাকবে। একটা সেতু যে কোনো সময় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। হয়তো আজ ভালো, দুদিন পর প্রাকৃতিক কিংবা মানবসৃষ্ট কারণে কোনো সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হলো। তা যেন তাৎক্ষণিকভাবে কর্তৃপক্ষ ওয়াকিবহাল থাকতে পারে সেজন্যই বিএমএমএস সফটওয়্যারের এ উদ্যোগ।