দেবীর মাথায় রাজ মুকুট পরিয়ে নরেন্দ্র মোদীর পূজা

22

>>গোটা শ্যামনগর ছিল নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি:ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী শ্যামনগর উপজেলার ঈশ্বরীপুর গ্রামে অবস্থিত যশোরেশ্বরী কালি মাতা মন্দির পরিদর্শন করেছেন। শনিবার সকাল দশটায় হেলিকপ্টারযোগে তিনি ঈশ্বরীপুর এ সোবহান মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে পৌঁছে জিপ-এ করে প্রায় এক কিলোমিটার দুরের মন্দিরে আসেন।
পরবর্তীতে বেলা সাড়ে ১০টার দিকে মন্দিরের নির্ধারিত কক্ষে প্রবেশ করে শক্তির দেবী মা কালির পূজা দিয়ে সেখানে প্রার্থনা করেন। এসময় তিনি তার পক্ষ থেকে সরবরাহকৃত হিরা ও স্বর্ণের মিশ্রনে প্রস্তুতকৃত রাজ মুকুট নিজ হাতে দেবীর মাথায় পরিয়ে দেন।

আরও খবর>>যশোরেশ্বরী কালীমন্দিরে কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণের প্রতিশ্রুতি মোদির

এরআগে বেলা দশটার দিকে এ সোবহান বিদ্যালয় মাঠের হেলিপ্যাডে নরেন্দ্র মোদীকে বহনকারী হেলকপ্টার পৌঁছালে স্থানীয় সংসদ সদস্য এসএম জগলুল হায়দার, সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল ও জেলা পুলিশ সুপার মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান তাকে ফুল দিয়ে অভ্যর্থনা জানান।
এদিকে যশোরেশ্বরী মন্দিরে পৌঁছালে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে প্রবেশদ্বারে ফুল দিয়ে বরণ করে নেন মন্দিরের সেবায়েত পরিবারের সদস্য কৃষ্ণা চট্রোপাধ্যায়। এসময় তিনি নরেন্দ্র মোদীর কপালে দিল্লী থেকে নিয়ে আসা রক্তচন্দন তিলক লাগিয়ে দেন। নরেন্দ্র মোদী কালি মুর্তির মাথায় নিজ হাতে হিরা ও স্বর্ণের সমন্বয়ে তৈরি রাজ মুকুট পরিয়ে দেন। পূজা শেষে মন্দিরের প্রধান পুরোহিত নরেন্দ্র মোদীকে উত্তরীয় পরিয়ে দেন।
প্রায় দশ মিনিটের পূজা ও প্রার্থনা শেষে নরেন্দ্র মোদী দেবীকে প্রদক্ষিণ করে মন্দিরের বাইরে এসে মন্দির ঘুরে দেখেন এবং বিশ্রামাগারে পৌঁছে অপেক্ষামান সেবায়েত কমিটির সদস্যসহ স্থানীয়দের সাথে কথা বলেন।
পরবর্তীতে মন্দিরের পূজায় অংশগ্রহণকারীদের সাথে ছবি তুলে তিনি যশোরেশ্বরী মন্দির থেকে বের হয়ে পৌনে ১১টার দিকে টুঙ্গিপাড়ার উদ্দেশ্যে হেলিকপ্টারে যাত্রা করেন।
এদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শনের পর যশোরেশ্বরী মন্দির এর গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যাবে উল্লেখ করে স্থানীয়রা উচ্ছ্বসিত। ইতিহাসের স্বাক্ষী এই মন্দির ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শনের পর তা বিশে^র কাছ পরিচিতি পাবে বলেও তাদের ধারণা। এক সাথে যশোরেশ^রী মন্দিরকে কেন্দ্র করে গোটা এলাকায় উন্নয়নের ছোয়া লাগবে-উল্লেখ করে স্থানীয়রা জানিয়েছেন, নরেন্দ্র মোদীর পরিদর্শনের পর বিশে^র নানা প্রান্তের ধর্মপ্রাণ মানুষের আনাগোনা বাড়বে।
উল্লেখ্য জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বাংলাদেশ সফররত ভারতের প্রধানমন্ত্রী অনেক আগে থেকেই শ্যামনগরের ঈশ্বরীপুর গ্রামের যশোরেশ্বরী কালি মন্দির পরির্দশনের আকাঙ্খার কথা জানিয়েছিলেন। যার অংশ হিসেবে টুঙ্গিপাড়ায় জাতির জনকের সমাধিস্থলে শ্রদ্ধা জানাতে যাওয়ার প্রাক্কালে তিনি ইতিহাসের স্বাক্ষী যশোরেশ্বরী মন্দির পরির্দমনে আসেন।
এদিকে নরেন্দ্র মোদীর সফরকে ঘিরে গোটা শ্যামনগরকে নিরাপত্তার চাদরে মুড়িয়ে ফেলা হয়। বাংলাদেশের এসএসএফ ও ভারতের এসপিআর ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর এ সফরকে নিয়ন্ত্রণ করে। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে যশোরেশ^রী মন্দির এলাকায় দেড় হাজার পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও র‌্যাবসহ আরও প্রায় পাঁচ শতাধিক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদ্য উপস্থিত ছিলেন। নরেন্দ্র মোদীকে নিরাপত্তা দিতে গোটা শ্যামনগরে জেড ক্যাটাগরির নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। হেলিপ্যাড থেকে মন্দির পর্যন্ত সড়ক সংস্কারসহ সড়কের দু’পাশে দুই দেশের সরকার প্রধান জাতীয় পতাকা আর জাতির জনক শেখ মুজিবর রহমানের ছবি স্থাপন করা হয়। এছাড়া সড়কের দু’পাশে থাকা জলাকারের মধ্যে বিশেষ পদ্ধতিতে নৌকা তৈরি করে সেখানে দুই দেশের সরকার প্রধানের ছবি লাগানো হয়। এরআগে মন্দিরসহ মন্দিরের সীমানা প্রাচীর সংস্কার ও রং করা হয়। এমনকি নরেন্দ্র মোদীর সফরকে ঘিরে মন্দিরের চারপাশের যাবতীয় অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করে সৃবিস্তৃত চাতাল তৈরি করা হয়। হেলিকপ্টার অবতরণের জন্য মন্দির থেকে প্রায় এক কিলোমটিার দুরবর্তী ঈশ্বরীপুর এ সোবহান ম্যাধমিক বিদ্যালয় মাঠে চারটি হেলিপ্যাড নির্মাণ করা হয়।
এদিকে নরেন্দ্র মোদী যশোরেশ্বরী মন্দির পরির্দশনকালে তাৎক্ষণিকভাবে দেবীর মাথায় রাজ মুকুট পরিয়ে দিলেও বিশেষ অনুদান প্রদান করবেন বলে নির্ভরযোগ্য সুত্র জানিয়েছে। এছাড়া মন্দিরকে কেন্দ্র করে একটি ট্রাষ্ট গঠনসহ মন্দিরের পাশে একটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের বিষয়ে ভারতীয় দূতাবাসকে নির্দেশ দিয়েছেন বলেও অসমর্থিত কয়েকটি সুত্র জানিয়েছে।
সানতন ধর্মালম্বীদের বিশ্বাস দেহ ত্যাগের পর দেবী সতীবালার শরীর যে ৫১ খন্ড হয়ে যায় তার পাঁচ টুকরা বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। যার মধ্যে ঈশ^রীপুর গ্রামে (পীঠস্থানে) সতীর করকমল বা পানি পদ্ম পতিত হয়। তারা আরও মনে করেন পানি পদ্মকে ঘিরে দেবীর পূজা করার জন্য অনরি নামের এক ব্রাম্মন প্রথম এখানে শতদ্বারযুক্ত মন্দির নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে ধনুকর্ণ নামের এক ক্ষত্রিয় নৃপতি ভগ্ন মন্দির সংস্কার করেন এবং এক সময়ে এসে রাজা লক্ষন সেন মন্দিরটি পুনরায় সংস্কার ও চন্ড ভৈরবের ত্রিকোণ মন্দির নির্মাণ করেন। কালের আবর্তে ষোড়শ শতকের শেষদিকে বার ভুইয়াঁর অন্যতম রাজা প্রতাপাদিত্য ইছামতি ও যমুনা নদীর সঙ্গমস্থল ধুমঘাটে রাজধানী গড়ে তোলার সময়ে মন্দিরটি খুঁজে পান। দেবীকে ভাগ্যদেবতা মেনে তিনি মন্দিরটি পুনঃনির্মাণ করেন এবং যশোর এলাকা হওয়ার কারণে মন্দিরটিকে যশোরেশ্বরী কালি মন্দির নাম দেন। তার সময় থেকে প্রতাপাদিত্যের মন্ত্রগুরু ও দেওয়ান চট্রোপাধ্যায় অধিকারী পরিবার পুরুষাক্রমে মন্দিরের সেবকের দায়িত্ব পালন করছেন।
স্থানীয়রা জানান, মন্দিরের মুল ভবনের বাইরে বিশালাকার আয়তনের জায়গা থাকলেও কালের আবর্তে স্থানীয় প্রভাবশালীরা তার সিংহভাগ দখল করে নিয়েছে। মন্দিরের পুকুর পর্যন্ত এখন আর মন্দিরের দখলে নেই। ক্রিড়া সংগঠনের কার্যালয়, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আর সবজি ক্ষেত গড়ে তুলে মন্দিরে প্রবেশের একটি পাশ সম্পুর্ণ দখল করে নিয়েছে স্থানীয়রা।