ত্রাণে মধ্যবিত্তের হাত

লজ্জায় ফেলছে ফটোসেশন

বিশেষ প্রতিবেদকবিশেষ প্রতিবেদক
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  12:58 PM, 07 May 2022
ফাইল ছবি

ক্যামেরা কেড়ে নিচ্ছে মধ্যবিত্তের লজ্জা। দান-অনুদান বা ত্রাণের দিকে হাত বাড়াতেই চারপাশ থেকে মুহুর্মূহুভাবে জ্বলে ওঠে ক্যামেরার ফ্লাশ। সামান্য ত্রাণ বিতরণেও ছবি তোলার মহড়া চলে। ছাপা হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকসহ গণমাধ্যমে। লজ্জা নিবারণের আপ্রাণ চেষ্টাও করেন অনেকে কিন্তু ক্যামেরার চোখ ফাঁকি দেয়ার সাধ্যি আছে কার ? এ পরিস্থিতি মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জন্য চরম লজ্জার-মনে করেন সমাজ সচেতন মহল।

 

ঈদুল ফিতর মুসলিম সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। ঈদ মানে সাম্য, সৌহার্দ্য ও আনন্দের। কিন্তু সেই আনন্দ মধ্যবিত্ত পবিবার ঘিরে ছড়িয়েছে বিষাদের ছায়া। বৈশ্বিক মহামারি করোনা সবচেয়ে বেশি বিপাকে ফেলেছে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের। পরিস্থিতি বিবেচনায় করোনা দূর্যোগের শুরু থেকেই সরকার নানাভাবে সহযোগিতা করে আসছে। সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা, সংগঠন ও ব্যক্তি পর্যায় থেকেও বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে সাহায্যের হাত।

আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠন বিতরণ করছে ঈদ উপহার। কেউ দিয়েছে শিশুদের নতুন পোশাক, কেউ আবার বিতরণ করেছেন খাদ্য-সামগ্রী।
শুক্রবার বেলা তখন ১১টা। যশোর শহরের নীলরতন ধর সড়কে দলীয় কার্যালয় থেকে ঈদ উপহার হিসেবে চাল, ডাল, তেল, সেমাই ও দুধ বিতরণ শুরু করে মৈত্রী ভলান্টিয়ার্স। বৃহস্পতিবার রাতেই প্রেস মিডিয়াকে বিষয়টি অবহিত করেছিল সংগঠনটি। বলা হয়েছিল সংগঠনটি দুইশ’ পরিবারের হাতে তুলে দেবে ঈদ উপহারের খাদ্য সামগ্রীর প্যাকেট। শুক্রবার যথা সময়ে বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয় কিন্তু বিতরণ শেষে দেখা যায় বেশকিছু প্যাকেট থেকে গেছে। সংগঠনটির আহবায়ক অ্যাডভোকেট মাহমুদ হাসান বুলু দৈনিক কল্যাণকে জানান, বিতরণ শেষ হয়নি, বিকেলে ফের শুরু হবে। সকালে বিতরণ অনুষ্ঠানের একটি ছবিতে দেখা যায়, বেশকিছু নারী-পুরুষ হাত বাড়িয়ে উপহার সামগ্রী নিচ্ছেন কিন্তু উল্টো দিকে মুখ। ছবি দেখে ধারণা করা যায়, তারা ‘লজ্জা’ ঢাকার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তাদের সেই লজ্জা ঢাকার চেষ্টায় ছাই ফেলছে চারপাশে তাক করে থাকা ক্যামেরা।
যদিও এ চিত্র নতুন না। দান-অনুদান বা ত্রাণ বিতরণে ফটোসেশনের রেওয়াজ অনেক আগেই চলে আসছে। বিশেষ করে মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের একচেঁটিয়া প্রভাব বিস্তারের পর ত্রাণ দাতাদের অধিকাংশ প্রচারে বিশ^াসী হয়ে উঠেছেন। বিষয়টি এরকম, দান করবো কিন্তু মানুষ জানবে না, তা তো হতে পারে না। প্রচারের উদ্দেশ্যে প্রেস মিডিয়া কর্মীদের পেছনে মোটা অংকের খরচ করার কথাও শোনা যায়। অনেক ত্রাণ দাতা ব্যক্তি, সংগঠন, প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা প্রচারের লক্ষ্যেই মিডিয়ার পেছনে অর্থ খরচ করেন। যা বর্তমানে নিয়মে রুপ নিয়েছে। এমন কথাও শোনা যায়, ত্রাণ মূল্যের চেয়ে মিডিয়ার জন্য বড় অংকের বাজেট রাখা হয়। যদিও ঢালাওভাবে না। এখনো অনেকেই আছেন, যারা সারাবছর দান করেন কিন্তু এসব দানের খবর পরিবারের সদস্যরাও জানতে পারেন না।

যশোর শহরের বাসিন্দা তাপস দাস। তিনি সহায় সম্পত্তি হারিয়ে এখন পথে পথে ঘুরছেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন স্থানে ত্রাণ দেয়া হয় কিন্তু লজ্জায় হাত পেতে নিতে পারি না। অথচ পরিবার নিরব অভাব-অন্টনে দিন পার করছে।
রাজনীতি কর্মী ইউনুস আলী দফাদার বলেন, দিনে দিনে দেনায় জর্জরিত হচ্ছি। মেয়ের লেখাপড়ার খরচ যোগাতে পারছি না। মাঝে-মধ্যে হতাশায় ডুবে থাকছি। কি করবো ভাবতে পারছি না।
প্রেস মালিক রানা জানান, সুদে টাকা গুণতে গিয়ে সর্বস্ব হারিয়ে ফেলেছি। এখন প্রেসটা ছাড়া কিছুই নেই। সব বিক্রি করেও দেনা শোধ হবে না-যোগ করেন রানা।
দৈনিক সংবাদের বিশেষ প্রতিনিধি রুকুন-উদ-দৌল্লা বলেন, মধ্যবিত্তের ঘরে অর্থ সংকট প্রকট হচ্ছে। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতি দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিয়েছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ দুঃসহ অর্থসঙ্কটের মধ্যে জীবন যাপন করছেন। অর্থ সঙ্কট উচ্চবিত্তদের ছুঁতে পারে না। ঠিক উল্টো পাশে অবস্থান করা নিন্মবিত্তরা চেয়েচিন্তে হলেও দুবেলা খেতে পারছেন। এ সুযোগ মধ্যবিত্ত শ্রেণির নেই। তাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে ‘লজ্জা’র এক অলঙ্ঘনীয় দেয়াল। রোজগার বন্ধ কিন্তু নিয়মিত সংসারের জন্য খাদ্যসহ নিত্য পণ্য কেনাকাটা করতে হয়, গুণতে হয় বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ বিল। সেই সাথে বাচ্চাদের লেখাপড়া ও কোচিং ফিস দিতে গিয়ে মধ্যবিত্তরা দেনার জালে জড়িয়ে পড়ছে।
তিনি বলেন, এরই মধ্যে সঞ্চয়পত্রে হাত পড়েছে মধ্যবিত্তের। মেয়াদপূর্তির আগেই সঞ্চয়পত্র ভেঙ্গে ফেলছেন। অনেকের সঞ্চয়পত্র নেই। তাই তাদের ভেতরে অব্যক্ত কান্নাগুলো গুমরে মরছে। এ থেকে ধারণা করা যায়, মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ ভাল নেই-যোগ করেন এই প্রবীণ সাংবাদিক ও বীরমুক্তিযোদ্ধা রুকুন-উদ-দৌল্লা।

এদিকে, সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা যায়, দেশে কমবেশি ২৫ শতাংশ মানুষ উচ্চবিত্তের কাতারে অবস্থান করছেন। করোনাভাইরাস সবকিছু স্থবির করে দিলেও উচ্চবিত্তের কোনো সংকট নেই। অতি দরিদ্রের তালিকায় রয়েছে ৪০ শতাংশ মানুষ। এ শ্রেণির মানুষ উচ্চবিত্তের সহযোগীতা, সরকারি-বেসরকারি সংস্থার ত্রাণ ও ভ্যান-রিকশা চালিয়ে দু’বেলা খেতে পারছেন।
কিন্তু সবচেয়ে বিপাকে আছেন দেশের ৩৫ শতাংশ মানুষ। যারা মধ্যবিত্তের সম্মান নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে আসছিলেন। কিন্তু করোনা এ শ্রেণির মানুষের কপালে বয়ে এনেছে চরম দুর্ভোগ। তাদের না আছে সাহায্য পাওয়ার সুযোগ, না আছে ভাল রোজগারের ব্যবস্থা। মধ্যবিত্ত সমাজ যে অদৃশ্য ‘আত্মমর্যাদা’ ধারণ করেন, তা থেকে বেরিয়ে আসা প্রায় অসম্ভব। তারা চাইলে ফুটপাতে যেনতেন কোনো ব্যবসা যেমন খুলে বসতে পারছেন না, তেমনি পান না সম্মানের কোনো কাজ। এ শ্রেণির মানুষ আত্মীয়-স্বজনের কাছে হাত পাততেও চরম লজ্জাবোধ করেন।

গবেষণায় বলা হয়েছে, এনিয়ে খুব বেশি গবেষণার দরকার পড়ে না। একটু সমাজ সচেতন যারা, তারা বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারেন। বিশ্লেষকদের মতে, ‘কাউকে কিছু না বলতে পারা’ মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের স্বভাব। তারা মনে করেন, লজ্জা বিকিয়ে বেঁচে থাকার কোনো অর্থ হয় না।
চলতি এপ্রিলের ৪ তারিখ অভাবের যন্ত্রণায় আত্মহত্যার পথ বেছে নেন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের টেক্সাটাইল বিভাগের শিক্ষার্থী অন্তু রায়। খুলনার ডুমুরিয়ার গুটুদিয়া ইউনিয়নে নিজ বাড়িতে দিবালোকে গলায় ফাঁস আত্মহত্যা করেন এই মেধাবী ছাত্র। কুয়েটের ড. এমএ রশিদ হলে তার বেশকিছু টাকা বকেয়া পড়েছিল। কিন্তু তার পরিবার দিতে পেরেছিল মাত্র ৩ হাজার টাকা।
সাম্প্রতিক সময়ে মেধাবী শিক্ষার্থীদের সরকার যেমন অর্থ সহায়তা করছে তেমনি বেসরকারি সংস্থা, প্রতিষ্ঠান এমনকি ব্যক্তি পর্যায় থেকেও লেখাপড়ার ভার নিচ্ছেন।

কিন্তু মেধাবী হয়েও অন্তু কেন আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন এমন প্রশ্নোত্তরে কলেজ অধ্যক্ষ মোজাম্মেল হক বলেন, মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ অভাবের কথা কারোর সাথে শেয়ার করতে পারে না। তারা মনে করে ভিক্ষার চেয়ে মৃত্যু শ্রেয়। মেধাবী শিক্ষার্থী অন্তুর ক্ষেত্রেও তেমটি ঘটে থাকতে পারে-যোগ করেন মোজাম্মেল। তিনি এইও বলেন, যারা দান-অনুদান দেন তাদের ৯৫ ভাগ মানুষ মনে করেন প্রচার করাটা খুবই জরুরী। তারা একবারও ভাবেন না, প্রচারের কারণে মধ্যবিত্তের বুকে কতটা রক্তক্ষরণ ঘটে। এরজন্য রাজনীতিকরা অনেকাংশে দায়ী-যোগ করেন মোজাম্মেল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম গণমাধ্যমকে বলেছেন, সমাজ এখন রুপান্তরকামী। দ্রুত বদলাচ্ছে সবকিছু। পুঁজিবাদী সমাজের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছেন না মধ্যবিত্তরা। তিনি মনে করেন, এ উত্তরণে সমাজ ও রাষ্ট্রের কিছু সুনির্দিষ্ট দায়দায়িত্ব নিতে হবে ।

তবে যশোরের বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতাদের অনেকে মনে করেন, সামান্য দান-অনুদান বিতরণে ফটোসেশন করাটা ঠিক না। এরফলে মধ্যবিত্তদের মনোকষ্ট বেড়ে যায়। তাদের লজ্জায় পড়তে হয়। রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিসহ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উপলব্ধি করতে হবে। সব অনুষ্ঠানে প্রেস মিডিয়ার সরব উপস্থিতি নিস্প্রয়োজন-যোগ করেন তারা।

অর্থনীতি

আপনার মতামত লিখুন :