জলাশয়ে ফের ঝাঁক ছুটবে বিলুপ্তপ্রায় কাকিলার

এবিসি বাংলা ডেস্কএবিসি বাংলা ডেস্ক
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  06:53 PM, 01 September 2021

জলাশয় জুড়ে আবারও ঝাঁক ছুটবে বিলুপ্তপ্রায় মাছ কাকিলার। বিএফআরআই’র বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম প্রজনন পদ্ধতি উদ্ভাবন করায় ফের প্রাচুর্য ফিরবে স্বাদে ভরপুর মাছটির। বাংলাদেশ মৎস গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) যশোর স্বাদু পানির উপকেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা কাকিলার কৃত্রিম প্রজনন কলাকৌশল উদ্ভাবনে সফল হয়েছেন। পুকুরের মতন বদ্ধ জলাশয়েও মাছটির চাষাবাদ কৌশল নিয়ে এখন কাজ চলছে।

সূচের মতন লম্বাটে এই মাছটি ‘নিডল ফিস’ প্রজাতির। বাঙলায় এটি কাকিলা, কাকলে, কাইক্কা, গাংটুরি, কাইলাসহ বিভিন্ন নামে পরিচিত।
একটা সময় ছিল যখন প্রাকৃতিক জলাশয়ে মাছটি মিলতপ্রচুর পরিমাণে। কিন্তু জলবায়ুর প্রভাব, প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও মানবসৃষ্ট নানা কারণে বাসস্থান ও প্রজনন ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মাছটির। ফলে প্রাচুর্যতাও কমে গেছে ব্যাপক হারে। কিন্তু বদ্ধ পরিবেশে অভ্যস্ত করে ও কৃত্রিম প্রজনন কলাকৌশল উদ্ভাবন হওয়ায় মাছটির হারানো প্রাচুর্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
শিগগিরিই বদ্ধ জলাশয়ে বিলুপ্তপ্রায় এই মাছটির চাষাবাদও শুরু হবে। কাকিলার কৃত্রিম প্রজনন উদ্ভাবনের সাথে সম্পৃক্ত বিজ্ঞানীরা বলছেন, দ্রুতই বদ্ধ পরিবেশে অর্থাৎ পুকুরের মতন জলাশয়েও এটির চাষ করা যাবে। আর বদ্ধ পরিবেশে এটি চাষ কৌশল উদ্ভাবন চলছে। গবেষক দলের সদস্য উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শরীফুল ইসলাম জানান, পুকুরেও অচিরেই শুরু হবে কাকিলা মাছের চাষাবাদ। কৃত্রিম প্রজনন পদ্ধতি উদ্ভাবনের পর এখন পুকুরে মাছটির চাষাবাদ কৌশল নিয়ে কাজ চলছে।
জানা যায়, নদী, খাল-বিল, বাওড়ের মতো জলাধারগুলোয় এটির প্রাকৃতিক উৎপাদন এখন প্রায় শুন্যের কোঠায়। ফলে মাছটির দর্শন এখন দূর্লভ প্রায়। কিন্তু বাংলাদেশ মৎস গবেষণা ইনস্টিটিউটের যশোরে কর্মরত বিজ্ঞানীরা মাছটির কৃত্রিম প্রজনন উদ্ভাবন করেছেন। এখানকার স্বাদু পানির উপ- কেন্দ্রের বিজ্ঞানীদের ৩ বছরের নিবিড় গবেষণায় এই সাফল্য ধরা দিয়েছে।
কাকিলার প্রজনন উদ্ভাবনে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা জানান, মাছটির প্রজননের জন্য পিজি (পিটুইটারি গ্লান্ড) হরমোন ব্যবহার করা হয়। গত ১৮ আগস্ট পুকুর থেকে মাছ ধরে ৪ জোড়া বাবা-মা মাছ নির্বাচন করে হ্যাচারির চৌবাচ্চায় রাখা হয়। সেখানে নির্দিষ্ট সময় ধরে ঝর্ণাধারায় রেখে সেগুলোকে দেওয়া হয় নির্দিষ্ট একটি মাত্রার হরমোন ইনজেকশন । পরে মা-বাবা মাছকে একসাথে একটি চৌবাচ্চায় রেখে ঝর্ণাধারা দিয়ে সেখানে কচুরিপানা রাখা হয়। এর প্রায় ৪৮ ঘণ্টা পর মা মাছ ডিম ছাড়ে। ডিমের ভেতরে বাচ্চার বিভিন্ন দশা ও উন্নয়ন অনুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হয়। ডিম ছাড়ার প্রায় ৯০ থেকে ১০০ ঘণ্টার মধ্যে নিষিক্ত ডিম থেকে বাচ্চা বের হয়।
গবেষক দলের সদস্য ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শরীফুল ইসলাম বলেন, পদ্মা নদী থেকে কাকিলা ব্রুড (মা-বাবা মাছ) মাছ সংগ্রহ করা হয়। সেখান থেকে বিশেষ পদ্ধতিতে অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করে যশোরে আনা হয়। এরপর সেগুলো যশোরের স্বাদু পানি উপ-কেন্দ্রের পুকুরে ছাড়া হয়। আর সেগুলোকে খাওয়ানো হয় হ্যাচারিতে উৎপাদিত কার্প জাতীয় মাছের জীবিত পোনা ও নানা জলাশয় থেকে সংগৃহীত জীবিত ছোট মাছ । এভাবে পুকুরের আবদ্ধ পরিবেশে অভ্যস্ত করা হয় কাকিলা ব্রুডগুলোকে। এর পরে চলতি বছরের মে মাস থেকে কৃত্রিম প্রজননের উদ্দেশ্যে উপ-কেন্দ্রের হ্যাচারিতে নির্দিষ্ট সংখ্যক মা-বাবা মাছকে প্রয়োগ করা হয় বিভিন্ন ডোজের হরমোন ইনজেকশন। এক্ষেত্রে অনুসরণ করা হয় বৈজ্ঞানিক সব প্রটোকল। এভাবে কয়েকবার বিভিন্ন ডোজের ট্রায়াল দেয়া হলেও মাছের প্রজনন সফলতা আসেনি। কিন্তু অবশেষে ২৫ আগস্ট প্রজননকৃত মাছের ডিম থেকে পোনা বের হয়। ফলে কাকিলা মাছের কৃত্রিম প্রজননে সফলতা আসে।
গবেষক দলের প্রধান ও বিএফআরআই যশোর স্বাদু পানির উপ-কেন্দ্র প্রধান ড. রবিউল আউয়াল হোসেন জানান, কাকিলার দেহ লম্বা ও সামান্য চাপা। মাছটি প্রায় সিলিন্ডার আকৃতির। এগুলো লম্বায় ২৫ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার হয়। পরিণত পুরুষ মাছের মাথার শীর্ষে লাল চূঁড়া দেখতে পাওয়া যায়। আর যার জন্য স্ত্রী ও পুরুষ মাছ সহজেই আলাদা করা যায়। তিনি আরও জানান, পুরুষ মাছের দেহ স্ত্রী মাছের তুলনায় অধিক সরু ও আকারে একটু ছোট হয়। এটি শিকারী মাছ। মূলত ছোটমাছ খেয়ে থাকে। প্রাকৃতিক ও প্রবহমান জলাশয়ে বিশেষ করে নদীতে ও বর্ষাকালে প্লাবিত অঞ্চলে প্রজনন করে। পরিণত মাছেরা ভাসমান জলজ উদ্ভিদ নেই এমন স্থানে বসবাস করলেও জলজ উদ্ভিদের পাতার নীচে ও ভাসমান শেকড়ে এদের স্ত্রীরা ডিম পাড়ে। কাকিলা মাছের কৃত্রিম প্রজনন বাংলাদেশ এই প্রথম। বিশ্বের কোথাও এ মাছের কৃত্রিম প্রজননের কোন তথ্য পাওয়া যায়নি।
গবেষক দলের সদস্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শিশির কুমার দে বলেন, কাকিলা মাছের প্রজনন ট্রায়ালের সময় চৌবাচ্চার পানির গড় তাপমাত্রাছিল ২৮.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমান ছিল ৪.৫ মিলিগ্রাম বা লিটার ও পিএইচ ছিল ৭.৬।
জানা যায়, প্রতি ১০০ গ্রাম খাবার উপযোগী কাকিলা মাছে ১৭.১ শতাংশ প্রোটিন, লিপিড ২.২৩ শতাংশ, ফসফরাস ২.১৪ শতাংশ ও ০.৯৪ শতাংশ ক্যালিসিয়াম রয়েছে। যা অন্যান্য ছোট মাছের তুলনায় অনেক বেশি।

আপনার মতামত লিখুন :