চলচ্চিত্রে আপত্তিকর দৃশ্য দেখানো হলেও পুলিশ মামলা কেন করবে ?

31

বাংলাদেশের নাটক-সিনেমায় পুলিশের চরিত্র খারাপ দেখানো যাবে না, মন্ত্রী -আমলাদের দুর্নীতিবাজ বলা যাবে না , ধর্মীয় বিষয়ক কোনও ব্যক্তির নামে খারাপ বলা যাবে না ৷ তাহলে   স্বাধীনভাবে সংস্কৃতি চর্চার কাজ করা কি কঠিন হয়ে উঠছে ? অথচ ভারতীয় সিনেমায় পুলিশ ,মন্ত্রী রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে সমালোচনা করে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হচ্ছে ,এমনকি সেই দেশের সরকারকেও নিন্দা জ্ঞাপন করাও হয়   অনেক সিনেমা-নাটকের সংলাপে ৷ সমালোচনা করাটা সহজ কিন্তু সমালোচনা  সহ্য করার মানসিকতা নেই অনেকেরই ৷

অ্যাপে রিলিজ করা একটি সিনেমার কিছু সংলাপ ও দৃশ্যের জন্য একজন পরিচালক ও একজন অভিনেতাকে আটকের পর অনেকে বলছেন – বাংলাদেশে নাটক, সিনেমা কিংবা সাহিত্যে পুলিশের চরিত্র নিয়ে স্বাধীন ভাবে কাজ করাই কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

নবাব এলএলবি নামের চলচ্চিত্রটির অর্ধেক অংশ আই থিয়েটার নামের একটি অ্যাপে মুক্তি দেয়া হয়েছে গত ষোলই ডিসেম্বর।

প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী সেন্সর বোর্ডে সিনেমাগুলোকে সেন্সর সার্টিফিকেট নেয়ার বিধান থাকলেও এ সিনেমাটির ক্ষেত্রে তা হয়নি – অ্যাপে মুক্তি দেয়ার কারণে।

কিন্তু সেখানেই একটি দৃশ্যে অশ্লীল ভাষা প্রয়োগের কারণে পর্নগ্রাফি আইনের লঙ্ঘন হয়েছে বলে মনে করছেন পুলিশ।

কিন্তু এ অভিযোগে সরাসরি পরিচালক ও অভিনেতাকে আটক না করে আলোচনা করেও এর সমাধান করা যেতো বলে মনে করছেন তরুণ নির্মাতা ও লেখক আশফাক নিপুন।

তিনি বলেন, “আর্ট-কালচার তো ফুল-লতাপাতা দিয়ে বানাতে পারবোনা। আশেপাশের পরিবেশ ও বাস্তবতা নিয়েই ছবি বানাতে হবে। এখন যদি বিভিন্ন কমিউনিটি যদি আমাকে এমবার্গো দেয়ার চেষ্টা করে যে আপনি কিছু করতে হলে পারমিশন নিতে হবে বা পছন্দ না হলে জেলে পাঠাতে পারবো – এটা এ্যালার্মিং।”

তার আশংকা – এটা শুরু হলো পুলিশ দিয়ে, কিন্তু সামনে হয়তো বিচারকরা বলবেন বা ডাক্তাররা বলবেন তাদের চরিত্রগুলো নিয়ে।

“তখন তো কারো গল্পই বলা যাবেনা। আমরা যে কতটা কূপমণ্ডূকতার দিকে যাচ্ছি এটা তারই প্রমাণ। অথচ নাটক, চলচ্চিত্র, সাহিত্য বা ওয়েব কনটেন্টে থাকা চরিত্রগুলো তার পুরো কমিউনিটিকে প্রতিনিধিত্ব করেনা। সেখানে নিতান্তই ব্যক্তি চরিত্র ফুটে ওঠে”।

তিনি বলেন, গল্পের প্রয়োজনে চরিত্র আসে অর্থাৎ যখন একজন ব্যবসায়ী খারাপ এমন চরিত্র দেখানো হয়, তার মানে এই নয় যে পুরো ব্যবসায়ী সম্প্রদায় খারাপ।

চলচ্চিত্রটিতে কী এমন দেখানো হয়েছে যে পর্নোগ্রাফি আইনে তাদের বিরুদ্ধে মামলা এবং দ্রুত গ্রেপ্তার করা হল৷ বিডিনিউজ তাদের প্রতিবেদনে লিখেছে, ‘‘এই নির্মাতা ও অভিনেতার বিরুদ্ধে পুলিশের পক্ষ থেকে রমনা থানায় দায়ের করা মামলায় বলা হয়, ‘নবাব এলএলবি’ নামের ওই চলচ্চিত্রে ধর্ষণের শিকার এক নারী বিচারের আশায় থানায় গেলে কর্তব্যরত কর্মকর্তা (অভিনেতা শাহীন মৃধা) তাকে (ভিকটিম) অরুচিকর, বিকৃত প্রশ্ন করেন, যাতে পুলিশকে অত্যন্ত খাটো করে দেখানো হয়েছে৷ এতে পুলিশের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে৷”

চলচ্চিত্রে পুলিশের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন শাহীন মৃধা ও ধর্ষণের শিকার নারীর চরিত্রে ছিলেন অর্চিতা স্পর্শিয়া৷

চলচ্চিত্র অনুরাগী, বিশ্লেষক ও সাংবাদিকসহ অনেকেই এই ঘটনায় নিজেদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন৷ অনেকেই বিদেশি চলচ্চিত্র ও টিভি অনুষ্ঠানের উদাহরণ দিয়ে একে বাংলাদেশের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অসহিষ্ণু আচরণ হিসেবে দেখছেন৷

সাংবাদিক আমিন আল রশীদ লিখেছেন, ‘‘এইসব পুলিশ ও বিচারসংশ্লিষ্টরা জীবনেও স্টার ওয়ার্ল্ডের জনপ্রিয় শো ‘জিমি কিমেল লাইভ’ দেখেননি৷ দেখলে জানতেন, শুধু পুলিশ নয়, খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্টকে লাইভ অনুষ্ঠানে গালাগাল করলেও তা নিয়ে মামলা হয় না বা কাউকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হয় না৷” তিনি মনে করেন শুধু ভারতের বাংলা ও হিন্দি সিনেমায়ও পুলিশকে নিয়ে যেসব রসিকতা ও গালাগাল করা হয়, তা নিয়ে মামলা হলে বছরে জনাবিশেক পরিচালককে জেলে যেতে হতো৷