গান স্যালুটে বিদায়:পূর্ণ মর্যাদায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের শেষকৃত্য সম্পন্ন

51

>>সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রয়াণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শোক
এবিসি ডেস্ক:
গান স্যালুটে কিংবদন্তিকে জানানো হল বিদায়। কেওড়াতলা মহাশ্মশানে পূর্ণ মর্যাদায় সম্পন্ন হল সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের (Soumitra Chatterjee) শেষকৃত্য। চোখের জলে বাংলার শেষ ম্যাটিনি আইডলকে বিদায় জানালেন অসংখ্য অনুরাগী। খবর সংবাদ প্রতিদিন

‘অশনি সংকেত’ আগেই মিলেছিল। শনিবার থেকেই সম্পূর্ণ লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল কিংবদন্তি অভিনেতাকে। রবিবার বেলা ১২.১৫ মিনিট নাগাদ বেলভিউ হাসপাতালের তরফে ঘোষণা করা হয়, শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। নিজের কমরেড, নিজের সহযোদ্ধাকে হারিয়ে শোকাতুর হয়েও সৌমিত্রকন্যা পৌলমী বসু বলেন, “কষ্ট পাবেন না। বাবাকে আদর্শ মেনেই আমরা জীবনকে সেলিব্রেট করব।” পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) বলেন, “সারা বিশ্ব চলচ্চিত্র জগতের মহান প্রতিভাবান বরণীয় স্মরণীয় মানুষকে হারাল।” টুইটারে শোকজ্ঞাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (Narendra Modi) এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah)।

 

>>সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রয়াণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শোক
এদিকে
ভারতের বাংলা অভিনয় জগতের কিংবদন্তী অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আজ রোববার (১৫ নভেম্বর) এক শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিভাবান এই শিল্পীর মৃত্যুতে অভিনয় জগতে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হলো। তিনি আরও বলেন, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় তার সৃষ্টিশীল কর্মের মধ্য দিয়ে মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের শোক
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। নিজের সবচেয়ে প্রিয় অভিনেতাদের একজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তিনি ছিলেন একাধারে অভিনেতা, নাট্যকার, কবি ও চিত্রকর। ৬০-এর দশক থেকে আমৃত্যু তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বি অভিনেতা ছিলেন। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী দক্ষ এই অভিনয় শিল্পী তার অসাধারণ অভিনয় নৈপুন্যের জন্য উপ-মহাদেশের মানুষের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবেন।’

রবিবার (১৫ নভেম্বর) বিকালে গণমাধ্যমে পাঠানো শোক বিবৃতিতে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে বিএনপির মহাসচিব এসব কথা বলেন। কিংবদন্তি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বর্ণাঢ্য জীবনের ইতি ঘটিয়ে রবিবার (১৫ নভেম্বর) বেলা সোয়া ১২টা নাগাদ শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

বিএনপির মহাসচিব উল্লেখ করেন, ‘গুণী এই অভিনেতার অভিনয় দেখে দর্শকরা এতোটাই বিমুগ্ধ হতেন যে, তার অভিনয়কে বাস্তবতা-জ্ঞান করতেন। তিনি তার উত্তরসূরী অভিনেতা-অভিনেত্রীদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।’

‘এই কুশলী অভিনেতা ব্যক্তিগত জীবনেও ছিলেন সহৃদয়, উদারচেতা ও বিনীত স্বভাবের অধিকারী’ উল্লেখ করে ফখরুল বলেন, ‘বাংলা সিনেমা জগতে তিনি ছিলেন একজন উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। এই অভিনয় শিল্পীর ইন্তেকালে উপ-মহাদেশে অভিনয় জগতে যে শূন্যতার সৃষ্টি হলো তা সহজে পূরণ হবার নয়। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে আমি গভীরভাবে শোকাহত।’

এদিকে, খ্যাতিমান এই অভিনেতার মৃত্যুতে বিএনপির সাংস্কৃতিক সংগঠন জাসাসের সহ-সভাপতি শায়রুল কবির খান শোক প্রকাশ করেছেন।
এবিসি অনলাইন এক্টিভিস্ট ইউনিটির শোক(abc online activist unity)
অভিনয় জগতের কিংবদন্তী অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রয়াণে গভীর শোক ও শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন এবিসি এক্টিভিস্ট ইউনিটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ। বিবৃতিতারা হলেন কেন্দ্রীয় সভাপতি সুনীল ঘোষ, সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান, বোর্ড কমিটির এমডি সাংবাদিক সাবিরা ইসলাম, এবিসি বাংলা ৭১’র নির্বাহী সম্পাদক এলিজা রহমান, উপদেষ্টা পরিষদের সভাপতি চিন্মময় চক্রবর্তী, আহমেদ জাহাঙ্গীর, উপদেষ্টা পরিষদের জনসংযোগ বিষয়ক সম্পাদক মিন্টু দত্ত, কেন্দ্রীয় সহ সম্পাদক সুমন ঘোষ, আইন বিষয়ক সম্পাদক এড. টিটো মোহন দে, প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক এমএ মাসুদ, মিঠুন আচার্য্য, চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক উজ্জল দে, কেন্দ্রীয় সহ সাংগঠনিক সম্পাদক এসকে সুমন, রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার মুনিরুজ্জামান মুন্না, আপেল মাহমুদ, সোহাগ পাঠক প্রমুখ।

উল্লেখ্য, দুই বাংলার জনপ্রিয় অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় রোববার স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটে কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর।

গত ৬ অক্টোবর থেকে কলকাতার বেলভিও হাসপাতালে করোনায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন উপমহাদেশের কিংবদন্তী অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। তিন দিন পর থেকেই অবস্থার অবনতি হতে থাকে। মাঝে কিছু দিন তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল থাকলেও গত সপ্তাহ থেকে ফের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ অকেজো হতে শুরু করে। রাখা হয় পূর্ণ লাইফ সাপোর্টে।

ক্রমশ অবস্থার উন্নতি হলেও কিন্তু অন্যান্য বহু শারীরিক সমস্যায় জর্জরিত ছিলেন বর্ষীয়ান এই তারকা। একটা সময়ে ক্যানসারেও আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি। জানা যায়, তার মস্তিষ্কে স্নায়ুর সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে। প্রবলভাবে বাড়ে শরীরে অক্সিজেনের চাহিদাও। অন্যদিকে অবনতি হয় কিডনির।

১৯৩৫ সালের ১৯ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলায় জন্মগ্রহণ করেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের। বাবা মোহিত চট্টোপাধ্যায় ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী। তার দাদার নাটকের দল ছিল। বাড়িতে নাট্যচর্চার পরিবেশ ছিল। ছোটবেলা থেকেই নাটকে অভিনয় শুরু করেন তিনি।

কলকাতার সিটি কলেজ থেকে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা শেষ করে সৌমিত্র ভর্তি হন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর করেন। কলেজের শেষ বর্ষে হঠাৎ একদিন মঞ্চে শিশির ভাদুড়ীর নাটক দেখে জীবনের মোড় ঘুরে যায় তার। তিনি পুরোদস্তুর নাটকে মনোনিবেশ করেন।

বড়পর্দায় তার সর্বপ্রথম কাজ বিশ্ব বিখ্যাত নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের ‘অপুর সংসার’ ছবিতে নাম ভূমিকায়, যা ১৯৫৯ সালে নির্মিত হয়। এর আগে রেডিওর ঘোষক ছিলেন সৌমিত্র এবং মঞ্চে ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় করতেন।

সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে ১৪টি ছবিতে অভিনয় করেন শক্তিমান এই অভিনেতা। পরবর্তীকালে মৃণাল সেন, তপন সিংহ, অজয় করের মতো পরিচালকদের সঙ্গেও কাজ করেছেন। সিনেমা ছাড়াও নাটক, যাত্রা ও টিভি ধারাবাহিকে অভিনয় করেছেন। লিখেছেন নাটক-কবিতা লিখেছেন, নাটক পরিচালনাও করেছেন। আবৃত্তিকার হিসেবেও তার পরিচিতি ছিল।

ছয় দশকের বেশি সময় বিনোদনের সঙ্গে যুক্ত ছিল সৌমিত্র। উল্লেখযোগ্য ছবির মধ্যে আছে- অপুর সংসার, ক্ষুধিত পাষাণ, দেবী, স্বরলিপি, তিনকন্যা, পুনশ্চ, অতল জলের আহ্বান, অভিযান, বর্ণালী, প্রতিনিধি, চারুলতা, আকাশকুসুম, মনিহার, হঠাৎ দেখা, অজানা শপথ, অরণ্যের দিনরাত্রি, বসন্ত বিলাপ, অশনি সংকেত, দত্তা, জয় বাবা ফেলুনাথ, দেবদাস, গণদেবতা ও হীরক রাজার দেশে।

তার নায়িকা হিসেবে দেখা গেছে সুচিত্রা সেন, সুপ্রিয়া দেবী, শর্মিলা ঠাকুর, অপর্ণা সেন, মাধবী মুখার্জি, তনুজাসহ অনেক কিংবদন্তি অভিনেত্রীকে।

ভারত সরকার সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে ২০০৪ সালে ‘পদ্মভূষণ’ ও ২০১২ সালে ‘দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার’ দিয়ে সম্মানিত করেছে। এছাড়াও ২০১৭ সালে তিনি ফ্রান্স সরকার কর্তৃক ‘লিজিওন অব অনার’ লাভ করেন। পশ্চিমবঙ্গ সরকার একই বছরে তাকে ‘বঙ্গবিভূষণ’ পুরস্কার প্রদান করে। তবে ২০১৩ সালে এই পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মরদেহে শেষ চুম্বন দেন কন্যা পৌলমীর।