গণমাধ্যমকর্মীদের সুরক্ষা বিষয়ে আর্টিকেল নাইনটিনের গভীর উদ্বেগ

22
ARTICLE 19: Freedom of expression and free flow of information under threat

গনমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের জের ধরে নারায়নণগঞ্জে দৈনিক বিজয় পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার ইলিয়াস হোসেনকে (৫২) প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা প্রকাশ করেছে আর্টিকেল নাইনটিন। মত প্রকাশের স্বাধীনতার সুরক্ষায় কাজ করা আন্তর্জাতিক এই মানবাধিকার সংস্থা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে জড়িত সকলের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচার নিশ্চিতের জোর দাবি জানিয়েছে।

গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার আদমপুর জিওধারা এলাকায় অবৈধ গ্যাস সংযোগের ছড়াছড়ি। অভিযোগ আছে টাকার বিনিময়ে অবৈধ সংযোগ দিয়ে মাসিক ভিত্তিতে টাকা আদায় করতেন জনৈক তুষার মিয়া (২৮)। এ নিযে সংবাদ প্রকাশের পাশাপাশি এলাকায় সোচ্চার ছিলেন সাংবাদিক ইলিয়াস হোসেন। এ নিয়ে দ্বন্দ্বের জের ধরে ১১ অক্টোবর ২০২০ তারিখ রাতে বন্দর উপজেলার আদমপুর এলাকায় প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে সাংবিাদিক ইলিয়াস হোসেনকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী জুলেখা বেগম বন্দর থানায় আটজনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা করেছেন। পুলিশ এ পর্যন্ত প্রধান আসামি তুষার মিয়াসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে।

আর্টিকেল নাইনটিন বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক ফারুখ ফয়সল এ প্রসঙ্গে বলেন, সরকার জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পরিসরে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের সুরক্ষা প্রদানের অঙ্গীকার করলেও বাস্তবতা বদলায়নি। আমরা জানতে পেরেছি যে, জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে সাংবাদিক ইলিয়াস বন্দর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন। এ জিডির প্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনী কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

ফারুখ ফয়সল বলেন, বাংলাদেশে বিচারহীনতার একটা সংস্কৃতি চলছে। এতে ধারণা জন্মেছে যে, সাংবাদিকদের নির্যাতন এমনকি হত্যা করলেও কিছু হয় না। সরকারি দলের সঙ্গে জড়িত মাফিয়া এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশ, প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর সফট টার্গেটে (সহজ লক্ষ্যে) পরিণত হয়েছেন সাংবাদিকরা। এই প্রবণতা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও এর কর্মীদের সুরক্ষার বিষয়টিকে নাজুক করে দিয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

তিনি ইলিয়াস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে সাংবাদিক ও মতপ্রকাশকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

ইলিয়াস হোসেন ২০২০ সালে বাংলাদেশে নিহত দ্বিতীয় সাংবাদিক। এর আগে ৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ তারিখে ঢাকার ধামরাই উপজেলা প্রেসক্লাবের সহসভাপতি ও বিজয় টিভির প্রতিনিধি জুলহাস উদ্দিনকেও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। আর্টিকেল নাইনটিনের তথ্যমতে, ১৯৯৬ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ৩৫ জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৮টি হত্যা মামলার বিচার সম্পন্ন হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো বিচার সম্পন্ন হওয়া ৮টি মামলার মধ্যে ৫টি মামলার বিচারের রায়কে নিহত সাংবাদিকদের পরিবারের সদস্যরা প্রত্যাখান করেছেন ।

ধর্ষণ বিরোধী সমাবেশে হামলার নিন্দা :

দেশব্যাপী ধর্ষণবিরোধী চলমান আন্দোলনের সময় বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ মিছিলে ও অবস্থান কর্মসূচিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাধা ও প্রশাসনের বাইরের দুর্বৃত্তদের হামলার ঘটনাতেও আর্টিকেল নাইনটিন দৃঢ়ভাবে নিন্দা জানায়।

ফারুখ ফয়সল বলেন, আমরা সরকারকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, প্রতিবাদ-সমাবেশের অধিকার বাংলাদেশের সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকার। তাছাড়া এ ধরনের দমননীতি ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে জেনেভাতে তৃতীয় ইউনিভার্সাল পিরিওডিক রিভিউতে (ইউপিআর) আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বাংলাদেশ নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক চুক্তি, ১৯৬৬-এ অনুস্বাক্ষরকারী দেশ। এই চুক্তির ২১ অনুচ্ছেদে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এ অধিকার প্রয়োগের ওপর আইনসম্মত ব্যতিক্রম ব্যতিরেকে এবং একটি গণতান্ত্রিক সমাজে জাতীয় নিরাপত্তা অথবা জননিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, জনস্বাস্থ্য অথবা নৈতিকতা, অথবা অন্যের অধিকার ও স্বাধীনতা সংরক্ষণের স্বার্থে যা আবশ্যক এবং যেরূপ অবশ্য প্রয়োজন সেরূপ ব্যতীত, কোনো বাধা-নিষেধ আরোপ না করার কথা বলা হয়েছে।

আর্টিকেল নাইনটিন সরকারকে সংবিধান স্বীকৃত নাগরিকের সভা সমাবেশ করার অধিকার নিশ্চিত করা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জনগণের নাগরিক-রাজনৈতিক অধিকার চর্চায় বাধা দেওয়া থেকে বিরত রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানায়।