কৃষিজমি ও পরিবেশ রক্ষায় পোড়া ইটের ব্যবহার বন্ধের উদ্যোগ

29

এবিসি নিউজ ডেস্ক : দেশে বাড়িিঘর  তৈরিতে পোড়া ইট ব্যবহারে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে কৃষিজমি। ফলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় হুমকির আশঙ্কা বাড়ছে। কারণ ইট বানাতে জমির ওপরের উর্বর মাটি তুলে নেয়ায় কৃষি উৎপাদন কমে যাচ্ছে।

এমন পরিস্থিতি পরিবেশ সুরক্ষা এবং জমি বাঁচাতে ব্লক ব্যবহার বাধ্যবাধকতার আওতায় আনা হবে। সেই লক্ষ্যে পোড়ামাটির ইটের ব্যবহার স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে সংশোধন করা হচ্ছে ‘ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন আইন’। সরকার ২০২০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে প্রচলিত ধারার পোড়া ইট উৎপাদন বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, চলতি বছর থেকে সরকারি কাজে আর পোড়া ইট ব্যবহার করা হবে না। ইটের বিকল্প হিসেবে সরকারি কাজে ব্যবহার করা হবে কংক্রিট ব্লক বা বিকল্প ইট। সেজন্য ইতিমধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সব মন্ত্রণালয় ও সংশ্নিষ্ট অধিদপ্তরে সরকারি নির্মাণকাজে বিকল্প ইট ব্যবহারের নির্দেশনা দিয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে। ওই নির্দেশনা অনুযায়ী, এখন থেকে সরকারের যে কোনো নির্মাণকাজে বিকল্প হিসেবে ব্লক ইট ব্যবহার করতে হবে। কারণ গৃহনির্মাণ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (এইচবিআরআই) উদ্ভাবিত বিকল্প ইট পরিবেশবান্ধব ও অর্থসাশ্রয়ী। ওই ইট ব্যবহারে মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থা কী ব্যবস্থা নিয়েছে তা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানতে চেয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়সহ বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে জানিয়েছে, মন্ত্রণালয়ের বেশিরভাগ কাজ গণপূর্ত বিভাগ করছে। ওই বিভাগকে ব্লক দিয়ে সব কাজ করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তাছাড়া গণপূর্ত বিভাগও ইতিমধ্যে তালিকায় ১৮টি উপকরণ অন্তর্ভুক্ত করেছে। সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় সরকার বিভাগও দ্রুত তালিকায় ব্লক অন্তর্ভুক্ত করতে যাচ্ছে।

সূত্র জানায়, দেশে প্রতি বছর আড়াই হাজার কোটি পোড়ামাটির ইট তৈরি হয়। তাতে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টন মাটি ব্যবহার করতে ৩ হাজার ৮০০ হেক্টর জমি হারিয়ে হচ্ছে। তাছাড়া ওই মাটির তৈরি ইট পোড়াতে ৫০ লাখ টন কয়লা, ৩০ লাখ টন কাঠসহ বিভিন্ন জ্বালানি ব্যবহার করা হচ্ছে। অথচ ইটভাটা থেকে ২ কোটি টন কার্বন নির্গত হচ্ছে। ওই হিসাবে দেশে নির্গত মোট কার্বনের ২০ শতাংশ ইটভাটা থেকে উৎপন্ন হচ্ছে।

বর্তমানে বছওে দেশে ইটের যে চাহিদা রয়েছে, তা পূরণে ৩০০ কোটি ব্লকের প্রয়োজন হবে। ৫টি ইটের চাহিদা একটি ব্লকে মিটছে। একটি ব্লকে ৩৫ টাকা ব্যয় হয়। বর্তমানে প্রতিটি ইটের দাম ১২ টাকা। পোড়া ইটের চেয়ে ব্লকে উৎপাদন ব্যয় ৪০ শতাংশ কম হয়। দেশে বর্তমানে ১৬টি ব্লক কারখানায় উৎপাদন হচ্ছে। ইতিমধ্যে বিল্ডিং টেকনোলজি অ্যান্ড আইডিয়াস ও গ্রিন ভিস্তা রিয়েল এস্টেটসহ কয়েকটি আবাসন কোম্পানি পোড়া ইট বন্ধ করে ব্লক ব্যবহার করে ভবন তৈরি করছে।

সূত্র আরো জানায়, কংক্রিট ব্লক হচ্ছে বালু বা পাথরের গুঁড়া ও সিমেন্টমিশ্রিত বিকল্পভাবে তৈরি ইট। পোড়ামাটির ইটের বিকল্প হিসেবে যথাযথ প্রযুক্তিতে তৈরি হচ্ছে ব্লক, থার্মাল ব্লক, ইন্টারলকিং ব্লক ও কমপ্রেসড স্টাবিলাইজড আর্থ ব্লক। ওসব ব্লক দেশের বিভিন্ন এলাকায় সীমিত পরিসরে তৈরি শুরু হয়েছে। পরীক্ষামূলক যশোরের কপোতাক্ষ নদের বালু ও সিমেন্ট ব্যবহার করে ব্লক তৈরি করা হচ্ছে। তবে দেশের বিভিন্ন নদীর বালু দিয়ে ব্লক ইট তৈরি হলে কৃষিজমি যেমন বাঁচবে, তেমনি বন্ধ হবে পরিবেশদূষণ।

ইটের চেয়ে ব্লকে ওজন কম হওয়ায় ভূমিকম্পের ঝুঁকিও কম। সহজ প্রযুক্তি ও স্বল্প শ্রমে এটা তৈরি করা যায়। এই ইট শব্দ ও তাপ নিরোধক, পরিবেশবান্ধব, ভূমিকম্প সহনীয় ও ব্যয়সাশ্রয়ী। ফলে ব্লক ব্যবহারে উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। বর্তমানে ব্লক দিয়ে বিশ্বের সব দেশেই অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে। ৫০ বছর আগে চীন পোড়ামাটির ইট উৎপাদন নিষিদ্ধ করেছে। ব্লকের ব্যবহার বাড়াতে ইতিমধ্যে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে।

এদিকে চাহিদা অনুযায়ী সারাদেশে ২৫০টি ইটভাটা প্রয়োজন। কিন্তু দেশে এক হাজারেরও বেশি ইটভাটা রয়েছে। আগামী ৩ বছরে এগুলো বন্ধ করা হলে ২০ শতাংশ দূষণ কমবে। ইটভাটাগুলোকে প্রথম বছরে ২০ শতাংশ ব্লক উৎপাদন করতে হবে। পরের বছর ৫০ শতাংশ। পরবর্তী বছরে সম্পূর্ণভাবে ব্লক উৎপাদনে যেতে হবে। বর্তমানে সারাদেশে প্রতিবছর প্রায় দুই হাজার ৬০০ কোটি ইট ব্যবহার হয়। তবে আবাসন ব্যবসায়ীরা ব্লক ব্যবহারে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

অন্যদিকে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব আবদুল্লাহ আল মোহসীন চৌধুরী জানান, ‘ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন আইন’ সংশোধনের জন্য খসড়া করা হয়েছে। এখন আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠকে খসড়া চূড়ান্ত করা হবে।

এ প্রসঙ্গে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন জানান, গণপূর্ত বিভাগের সব কাজে ব্লক ব্যবহার করা হবে। এ বছর থেকেই সরকারি কাজে ব্লক ছাড়া পোড়া ইট ব্যবহার করা হবে না। কয়েক ধাপে ব্লকের ব্যবহার শুরু করে ২০২০ সালের মধ্যে পোড়া ইটের ব্যবহার বন্ধ করা হবে। ব্লক ব্যবহারে সবাইকে তাগিদ দেয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে অনেক ভবন ব্লক দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। আর ব্লকের ব্যবহার বৃদ্ধিতে এখন চাহিদা বাড়ছে।