কুমিল্লায় মন্দিরে হামলা ভাংচুর:বিজেবি মোতায়েন

সম্প্রীতি বিনষ্টের সাথে স্বাধীনতা বিরোধীরা জড়িত, মন্দিরে হামলাকারীরা পার পাবে না-হুঁশিয়ারী দিলেন ওবায়দুল কাদের

এবিসি বাংলা ডেস্কএবিসি বাংলা ডেস্ক
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  11:43 PM, 13 October 2021

কুমিল্লার একটি পূজামণ্ডপ থেকে পবিত্র কোরআন উদ্ধারের ঘটনায় ওই এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। মঙ্গলবার রাতে নগরীর নানুয়ার দিঘিরপাড়ের একটি দুর্গাপূজার মণ্ডপে হনুমান মূর্তির কোলে পবিত্র কোরআন শরিফ রাখার একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

এ ঘটনায় বুধবার সকাল থেকে বিক্ষুব্ধ মানুষ নানুয়ার দিঘিরপাড়ে জড়ো হয়ে মিছিল করেন। পরে ওই এলাকায় কয়েক হাজার মানুষ জড়ো হয়ে দুটি মণ্ডপে ভাঙচুর চালায় । পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ারশেল ও ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে । এতে প্রায় আটজন সাধারন পথচারী আহত হয়।ছবি সংগৃহীত

বুধবার সকাল থেকেই দিনভর এই ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুক, ইউটিউবেও চলছে পক্ষে-বিপক্ষে নানা আলোচনা সমালোচনা।

অনেকেই বলছেন, পবিত্র কোরআন শরীফ অবমাননার এমন ঘটনা সত্যি হলে নিঃসন্দেহে তা ধর্মপ্রান মুসলিমদের জন্য প্রতিবাদের বিষয়।

আবার অনেকেই এমন ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি হুমকির মুখে ফেলতে কোন কুচক্রি মহলের ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেও সন্দেহ পোষণ করছেন।

সকাল থেকেই ফেসবুক জুড়ে ঘটনার ব্যখ্যায় অনেক বিচ্ছিন্ন ভিডিও দেখা যাচ্ছে। বুধবার সন্ধ্যায় কুমিল্লা শহরের নানুয়ারদীঘি এলাকার আলোচিত ঐ পূজামণ্ডপের পাশের কাজি তানিম নামের এক যুবক তার ফেসবুক আইডিতে লিখেছেন ঘটনার আদ্যোপান্ত ।

যুবকের বর্নিত পুরো ঘটনা সময়ের কণ্ঠস্বরের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

”কুমিল্লায় পূজা মণ্ডপে মূর্তির সাথে কুরআন রাখার ঘটনা আমার এলাকার। আমার বাসার পাশেই মণ্ডপ। জানালা থেকেই সব দেখা যায়।

কুরআন শরীফটা কাল রাতেই কেউ সেখানে রাখছে (রেখেছে) । যখন কেউ ওই মণ্ডপে ছিলনা তখন। এটা একটা আবাসিক এলাকা। আর এই মণ্ডপটা অস্থায়ী। শুধু দুর্গা পূজা উপলক্ষে ১০ দিনের জন্য বানানো হয়।

পূজা শেষ হবার পরেই আবার মণ্ডপ ভেঙে ফেলা হয়। এখানে রাতে মানুষ থাকে না। আর নানুয়া দীঘির পারে রাতে এমনিতেও মানুষ সহজে বাইরে বের হয় না। এমনকি কোনো প্রশাসনের লোকও কাল রাতে মণ্ডপ পাহারা দেয়ার জন্য সেখানে ছিল না। কারণ এই মণ্ডপ কখনো কোনো সমস্যা হয় নাই।

তবে কাল রাতে কয়েকবার পুলিশের গাড়ি এসে পুরা এলাকা ঘুরে গেছে। এক জায়গায় কয়েকজন ছেলেকে এক সাথে দাড়িয়ে থাকা অবস্থায় দেখলেই জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। হয়তো প্রশাসনের আগে থেকে কিছু ধারণা ছিল। কারণ এর আগে এতো বছরে কখনোই এই এলাকার পূজায় পুলিশ আসে নাই।

ধারণা থাকলে রাতে কেন পুলিশ মণ্ডপ পাহারা দেয় নাই সেটাও একটা প্রশ্ন।

কাল রাতে পূজা মণ্ডপ খালি ছিল সম্পূর্ন। রাত প্রায় ৩-৪ টার দিকেই মণ্ডপ খালি করে সব বাতি নিভিয়ে দেয়া হয়। সকালে পূজা শুরু হবার আগেই কুরআন শরীফটা এলাকা বাসীর নজরে পরে।

তখনও পুরোহিত আসে নাই।

পুরোহিত আসার পর পুরোহিত নিজে অনুরোধ করেছে যাতে এই কুরআন শরীফটা সরিয়ে নেয়া হয়। কিন্তু এলাকাবাসী সেটা না করে প্রশাসনকে খবর দিয়ে পুজাই বন্ধ করে দেয়ার চেষ্টা করেছে।

হিন্দুরা এটায় বাধা দেয়ায় প্রথমে বাইরে থেকে লোকজন এনে পুরা মণ্ডপ ভাঙ্গছে (ভেঙ্গেছে) , প্রতিমা ভেঙে দীঘিতে ফালাইয়া দিসে (ফেলে দিয়েছে) , এরপর যেই হিন্ধুরেই সামনে পাইছে (পেয়েছে ) তারেই পিটাইছে ( তাকেই পিটিয়েছে )।

পাশ্ববর্তী কিছু মাদ্রাসা কমিটির লোকেরা এটায় নেতৃত্ব দিসে (দিয়েছে ) । এরপর পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়ার জন্য ব্যবস্থা নিছে (নিয়েছে ) ।

এই মণ্ডপটাতে হিন্দুদের থেকে মুসলিমরা বেশি যায়। বছরের পর বছর ধরে আমাদের এলাকায় হিন্দু মুসলিম একসাথে মিলে মিশে থাকে। পূজায় হিন্দু মুসলিম একসাথে আনন্দ করে। কখনো কোনো সমস্যা হয় নাই। এলকায় বিপুল পরিমাণে হিন্দু লোকজন বসবাস করে। যাদের বেশিরভাগই স্থানীয়। সবাই এক সাথে বসবাস করে। আর এটাই কিছু মানুষ এর সমস্যার কারণ হয়ে দাড়াইছে। ইচ্ছা করে এই কাজটা করা হইছে (হয়েছে) দুই সম্প্রদায়কে আলাদা করার জন্য। বড় কোনো ষড়যন্ত্রের পূর্বাভাস মনে হচ্ছে।

আর কুরআন শরীফটা রাখছেও (রেখেছেও) এমন ভাবে যেন সবার চোখে পরে। একদম সামনের দিকে হনুমান মূর্তির কোলের উপর।

আর পূজার জন্য তৈরি করা মূর্তির উপর কুরআন রাখা হয় নি। মণ্ডপ এর বাইরের দিকে রাস্তার পাশে দর্শনের জন্য রাখা আলাদা মূর্তি রাখা হয়েছিল। যেটার কাছে যে কেউ যেতে পারবে।

হিন্দুরা তো এতো বলদ না যে এভাবে কুরআন রাখবে। এটা যে কেউ ইচ্ছা করে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগানোর উদ্দেশ্যে করসে সেটা সহজেই বুঝা যায়। কিন্তু ক্ষেপা পাবলিককে এটা বুঝবে কে। তারা একটার পর একটা গুজব ছড়াইয়া (ছড়িয়ে) যাচ্ছে।

কুরআন নাকি দুর্গার পায়ের নিচে রাখছে (রেখেছে) , কুরআন রেখে পূজা হইছে (হয়েছে ) , পুরোহিতকে বলার পরও পূজা বন্ধ হয় নাই। এইগুলো বলে বলে মানুষকে আরো বেশি উসকে দিচ্ছে।

অথচ কালকে রাতের পর এখানে আর পূজা হয় নি।

সকালের পরিস্থিতি যেমন ছিল প্রশাসন যদি শক্ত না হতো তাহলে রামু ট্র্যাজেডির মত ভয়াবহ কিছু হতে পারত। প্রশাসনের আন্তরিক চেষ্টার জন্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়া সম্ভব হয়।

পুরো বিষয়টা ভালো ভাবে তদন্ত করে দেখা উচিত। এর পিছনে যেই থাকুক তার বিচার দাবি করছি। যদি কোনো হিন্দুও এই কাজ করে থাকে তাহলে তার বিচার হোক।
কিন্ত একজনের দোষের জন্য পুরো সম্প্রদায়কে দোষী করা কোনো ভাবেই ঠিক না।

যেই এই কাজ এর সাথে জড়িত তার আসল উদ্দেশ্য ছিল এলাকার এত বছর ধরে চলে আসা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করা। তার উদ্দেশ্য যেন কোনো ভাবেই সফল না হয় এলাকার সকল মুসলিম ভাইদের কাছে অনুরোধ তারা যেন হিন্দু পরিবার গুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।”

প্রসঙ্গত, আলোচিত এই ঘটনায় কুমিল্লার পূজা উদযাপন কমিটির সম্পাদক নির্মল পাল বলেন, শহরের নানুয়ারদীঘি এলাকার একটি পূজামণ্ডপের প্রতিমায় কোরআন রাখার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশ গিয়ে তা সরিয়ে নেয়। কিন্তু এরপর পরই একদল ব্যক্তি বেশ কিছু পূজামণ্ডপে হামলার চেষ্টা চালায়।

তার অভিযোগ, পূজা বানচালের জন্য পরিকল্পিতভাবে কোরআন রেখে এ ঘটনা ঘটিয়ে তারাই এখন শহরজুড়ে পূজাবিরোধী বিক্ষোভ করছে। কয়েকটি মণ্ডপে হামলার চেষ্টা হয়েছে কিন্তু পুলিশের বাধায় ভেতরে ঢুকতে না পারলেও গেইট বা সামনের স্থাপনা ভাংচুর করেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, বেলা ১১টার দিকে হঠাৎ কোরআন অবমাননা হয়েছে, এমন খবর ছড়িয়ে পড়ে শহর জুড়ে।

তিনি বলেন, “এর আগে ১০টার পর নানুয়ারদীঘির মণ্ডপে কোরআন নজরে পড়লে দ্রুত পুলিশকে জানানো হয় এবং পুলিশ তখনি এসে কোরআনটি সরিয়ে নেয়। কিন্তু খবরটি খুব দ্রুত ছড়ানো হয় এবং কয়েকটি মাদ্রাসার লোকজন ছাড়াও স্থানীয় অনেকে প্রতিবাদ করতে শুরু করেন। এক পর্যায়ে সেখান থেকে মণ্ডপগুলোতে হামলা করা শুরু হলে পুলিশ ব্যবস্থা নেয়”।

পবিত্র কুরআন অবমাননার অভিযোগে উদ্ভুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছেন জেলা পুলিশ সুপার ফারুক আহমেদ।

বুধবার বিকালে তিনি বলেন, আমরা টহল দিচ্ছি। আগে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করি। কয়টি মণ্ডপে হামলার চেষ্টা হয়েছে এ মূহুর্তে বলতে পারছি না। পরিস্থিতি ঠিক হলে আমরা বিস্তারিত জানাবো।

এদিকে কুমিল্লায় পবিত্র কুরআন অবমাননা সংক্রান্ত ঘটনার সঙ্গে যেই জড়িত থাকুক তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. ফরিদুল হক।

এক বিবৃতিতে প্রতিমন্ত্রীর উদ্ধৃতি দিয়ে একটি জরুরি ঘোষণায় বলা হয়, কুমিল্লায় পবিত্র কুরআন অবমাননা সংক্রান্ত খবর আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। খবরটি খতিয়ে দেখার জন্য ইতোমধ্যে আমরা স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ প্রদান করেছি।

‘ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যে যে কেউ এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকুক তাদেরকে অবশ্যই আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কেউ আইন হাতে তুলে নেবেন না। সবাইকে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য অনুরোধ করা হলো। সূত্র:প্রকাশিত সংবাদের লিংক

এদিকে এঘটনায় আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের হুঁশিয়ারী দিয়ে বলেছেন নির্বাচনকে সামনে রেখে স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তি যে ষড়যন্ত্র করছে তা বরদাস্ত করা হবে না। মন্দিরে হামলায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে। সূত্র:বিডিনিউজ

আপনার মতামত লিখুন :