কাল রোববার পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশ

52

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে আট পর্বের ম্যরাথন ভোটগ্রহণ শেষে বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণা হতে যাচ্ছে রবিবার, ২রা মে। গত দশ বছর ধরে রাজ্যে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্যটি দখলে রাখতে পারবে, না কি তাদের হঠিয়ে কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপি প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসবে, সে দিকেই এখন সারা দেশের নজর।

বস্তুত পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গেই ভোট গোনা হবে দেশের আরও চারটি রাজ্যে – তামিলনাডু, কেরল, পন্ডিচেরি ও আসামেও। কিন্তু সর্বভারতীয় স্তরেও মিডিয়ার যাবতীয় মনোযোগ যেন শুধু পশ্চিমবঙ্গেই কেন্দ্রীভূত।

গত দেড়-দুমাস ধরে হুইলচেয়ারে ঘুরে প্রচার চালিয়ে যাওয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বনাম দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জুটির মেগা-জনসভা আর রোড শো-গুলো যেভাবে জাতীয় চ্যানেলগুলোতে কভারেজ পেয়েছে, তার তুলনাও বিরল।

কিন্তু ভারতের গণতন্ত্রে যে কোনও রাজ্যেই প্রতি পাঁচ বছর পর পর বিধানসভা নির্বাচন হয়ে থাকে, পশ্চিমবঙ্গেও সেরকমই একটা রুটিন ভোটপর্ব হচ্ছে।

তা সত্ত্বেও কেন এত গুরুত্ব পাচ্ছে এই নির্বাচন? কী নির্ভর করছে এই ভোটের ওপর? ইংরেজিতে বললে ‘হোয়াট ইস অ্যাট স্টেক’?

ভারতের সুপরিচিত টিভি ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার সাগরিকা ঘোষ তো এবারের এই ভোটকে পলাশীর যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করতেও দ্বিধা করছেন না।

১৭৫৭ সালে রবার্ট ক্লাইভের সেনা যেভাবে নবাব সিরাজউদ্দোল্লার বাহিনীকে পরাস্ত করে বাংলার ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল, সেভাবেই এই নির্বাচন অন্তত পশ্চিমবঙ্গের আগামী দিনের গতিপথ নির্ধারণ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে বলেই তাঁর অভিমত।

আসলে প্রায় ৯ কোটি জনসংখ্যার রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে এই ভোট শুধু যে ২৯৪ জন বিধায়ক বা জনপ্রতিনিধিকে নির্বাচন করবে তাই নয়। পর্যবেক্ষকরা প্রায় সবাই এক বাক্যে বলছেন রাজ্যের সাম্প্রদায়িক, সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিক চরিত্রেও সম্ভবত একটা বড়সড় পরিবর্তনের দিশা দেখাতে পারে এই ভোট।

সেটা কীভাবে, তারই সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ থাকছে এই প্রতিবেদনে।

অটুট থাকবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি?
ভারতের জনসংখ্যায় মুসলিমদের যে শতকরা হার, তার তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে সেই অনুপাত প্রায় দ্বিগুণ – তিরিশ শতাংশের কাছাকাছি। তবে রাজ্যের মুসলিমরা গোটা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে সমানভাবে ছড়িয়ে আছেন তা নয়, মূলত মালদা, মুর্শিদাবাদ, নদীয়া বা দক্ষিণ ২৪ পরগণার মতো চার-পাঁচটি জেলাতেই তাদের ঘনত্ব বেশি।

দেশভাগ ও স্বাধীনতার পরবর্তী সাত দশকে পশ্চিমবঙ্গে বিচ্ছিন্নভাবে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা যে হয়নি তা নয়। কিন্তু মোটের ওপর এই রাজ্যটি ভারতে হিন্দু-মুসলিমের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্যই পরিচিত।

 

কিন্তু দক্ষিণপন্থী ও হিন্দুত্ববাদী শক্তি বিজেপির উত্থান পশ্চিমবঙ্গের সেই সামাজিক চালচিত্রকে বদলে দেবে কি না, এই আশঙ্কা কিন্তু অনেকের মধ্যেই আছে।

ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক ইসলামের গবেষক কিংশুক চ্যাটার্জির কথায়, ”অন্যান্য রাজ্যের অভিজ্ঞতা দেখলে এটা মনে করার যথেষ্ঠ কারণ আছে যে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এলে এখানে সাম্প্রদায়িক পরিবেশ মোটেই আর আগের মতো থাকবে না!”

পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচনে বিজেপি নেতৃত্ব আগাগোড়া যেভাবে ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি ও প্রচারণা চালিয়ে এসেছে, তাতে এই ধারণা আরও বদ্ধমূল হয়েছে।

বিজেপির ছোট-বড়-মাঝারি নেতারা ক্রমাগত বলে গেছেন, মমতা ব্যানার্জি এতদিন ভোটে জিতেছেন ‘স্রেফ রোহিঙ্গা আর বাংলাদেশিদের ভোটে’। মুসলিম কথাটা উচ্চারণ না-করলেও তারা যে এর মাধ্যমে আসলে কী বলতে চেয়েছেন, সেটা কারও বুঝতেই অসুবিধা হয়নি।

কলকাতায় পার্ক সার্কাস অঞ্চলে জন্ম থেকে বেড়ে উঠেছেন অধ্যাপক রওশন জাহানারা।

তাঁর আশঙ্কা হল, ”বিজেপি বলেই রেখেছে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এলে তারা এখানে এনআরসি চালু করবে। মুসলিমদের নিশানা করে আসামে এনআরসি অভিযান চালিয়ে যেভাবে তারা সে রাজ্যে হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে পাকাপাকি বিভাজন সেরে ফেলেছে, একই জিনিস যে এখানেও হবে না তার গ্যারান্টি কোথায়?”

সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে রাজ্যে যে একটা ‘পোলারাইজেশন’ বা মেরুকরণ অনেকটাই সারা, তাতেও কোনও ভুল নেই।

তবে এই পরিস্থিতির জন্য ক্ষমতাসীন তৃণমূল নেতৃত্বকেও দায়ী করছেন অনেকেই।

বামপন্থী নেতা সুজন চক্রবর্তীর কথায়, ”বিভিন্ন জনসভায় ইনশাল্লাহ বলে ভাষণ শুরু করা, মুসলিমদের জন্য আলাদা হাসপাতাল বা শুধুমাত্র ইমামদের জন্য সরকারি ভাতা – এগুলো মমতা ব্যানার্জিই এ রাজ্যে চালু করেছেন।”

”সেই খেলাটাই বিজেপি এখন আরও অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছে, কারণ তারা এ খেলার অনেক পুরনো খেলোয়াড়!”

ভোটের ফলাফলে বিজেপি গরিষ্ঠতা পাক বা না-পাক, তাই পশ্চিমবঙ্গে সেই সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন যে ইতিমধ্যেই সারা – সে বিষয়ে সন্দেহ নেই কোনও।

বিপন্ন হবে বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতি?
ভারতের যে কোনও রাজ্যের ভোটে সাধারণত বেশি গুরুত্ব পায় উন্নয়ন, চাকরি-বাকরি, গরিবি হঠাও-এর নানা প্রতিশ্রুতি এবং অবশ্যই ধর্ম। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ভোটে এবারে একটি ব্যতিক্রমী ইস্যু নিয়ে তুমুল চর্চা হয়েছে, আর সেটা হল সংস্কৃতি।

ভারতের নানা হিন্দি-ভাষাভাষী অঞ্চলের মতো পশ্চিমবঙ্গেও ‘জয় শ্রীরাম’ বলে সম্ভাষণ করাটা বাঙালিদের মানায় কি না, তর্কবিতর্ক হয়েছে তা নিয়েও।

মূলত উত্তর ও মধ্য ভারতের গোবলয়ের দল বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে একটি বিজাতীয় সংস্কৃতি আমদানি করতে চাইছে, রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের বাংলায় এখানকার নিজস্ব ভাষা-শিল্প-মননের সঙ্গে যার কোনও মিল নেই – এ কথা তৃণমূল বলে আসছে অনেকদিন ধরেই।

বিজেপির জাতীয় স্তরের শীর্ষ নেতাদের তারা ‘বহিরাগত’ বলে আক্রমণ করেছেন, প্রধানমন্ত্রী মোদী পর্যন্ত বাংলা বলার চেষ্টায় কীভাবে বিকৃত উচ্চারণে ‘সুনার বাংলা’ বলেছেন তা নিয়েও ব্যঙ্গবিদ্রূপ হয়েছে।

তৃণমূলের সিনিয়র এমপি কাকলি ঘোষদস্তিদার বলছিলেন, ”মনে রাখতে হবে এই দলটা কলকাতার বুকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মূর্তি পর্যন্ত ভেঙেছে।”

”বাঙালির কাছে দুর্গাপূজার কী মাহাত্ম্য, সেটা না-বুঝে রামনবমীতে ত্রিশূল মিছিল বের করেছে। তাদের নেতারা এসে গুজরাটি অ্যাকসেন্টে বাংলায় ভাষণ দেওয়ার হাস্যকর চেষ্টাও করে গেছেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস পশ্চিমবঙ্গের মানুষ কিছুতেই এই সংস্কৃতিকে গ্রহণ করবেন না।”

বিজেপি অবশ্য এই ‘বহিরাগত তত্ত্ব’কে খারিজ করে দিয়ে আগাগোড়াই দাবি করে এসেছে, তৃণমূলই বরং আঞ্চলিকতাবাদে বিশ্বাসী – আর তাদের আস্থা একটা জাতীয় সর্বভারতীয় সংস্কৃতিকে।

পশ্চিমবঙ্গে দলের মুখপাত্র শমীক ভট্টাচার্য বলছিলেন, ”বিজেপি একটা বাইরের দল, এ কথা এ রাজ্যে কেউই আর বিশ্বাস করেন না। কালিম্পং থেকে কাকদ্বীপ, ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস থেকে পাড়ার চায়ের দোকান, সর্বত্র কান পাতলেই শুনবেন বিজেপিকে এ রাজ্যের সর্বস্তরের মানুষ কীভাবে গ্রহণ করে নিয়েছেন!”

তবে এটাও ঠিক, টালিগঞ্জের সিনেমাপাড়ার জনাকয়েক তারকা ভোটের আগে বিজেপি শিবিরে নাম লেখালেও পশ্চিমবঙ্গের শিল্প-সাহিত্য জগতের রথী-মহারথীরা সেভাবে কিন্তু কেউই বিজেপির মতাদর্শের সঙ্গে প্রকাশ্যে একাত্মতা জানাননি।

বিজেপির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তারা কলকাতার সংস্কৃতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র কফি হাউসেরও দখল নিতে চায়।
বহু বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদ, যারা এককালে বামপন্থীদের ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তারা তৃণমূলের সভায় হাজিরা দিলেও বিজেপিকে কিন্তু এড়িয়েই চলেছেন।

কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের আমজনতা এই তথাকথিত বিজেপি ব্র্যান্ডের সংস্কৃতিকে কতটা গ্রহণ করেছেন, সে প্রশ্নেরও জবাব মিলবে রবিবারেই।

শিল্পের হাল কি আদৌ ফিরবে?
লন্ডন স্কুল অক ইকোনমিকসের অধ্যাপক মৈত্রীশ ঘটক তার এক সাম্প্রতিক নিবন্ধে দেখিয়েছেন, স্বাধীনতার পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মাথাপিছু উপার্জন সারা দেশের জাতীয় গড়ের তুলনায় কীভাবে ক্রমশ কমেছে।

১৯৬০র দশকেও পশ্চিমবঙ্গ ছিল দেশের সবচেয়ে ধনী তিনটি রাজ্যের অন্যতম – বাকি দুটো ছিল মহারাষ্ট্র ও গুজরাট। কিন্তু আশির দশক থেকেই বাকি দেশের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গবাসীর রোজগারপাতি হু হু করে কমতে শুরু করে।

”টপ থ্রি’ থেকে নামতে নামতে এই শতাব্দীর গোড়ায় পশ্চিমবঙ্গ এসে ঠেকেছিল দশ নম্বরে, আর দশ বছর আগে রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেস যখন ক্ষমতায় আসে তখন র‍্যাঙ্কিং ছিল ১১। আজ আরও কমে পশ্চিমবঙ্গ ১৪তে এসে নেমেছে।

পশ্চিমবঙ্গে বড় কলকারখানা নেই, বৃহৎ শিল্প সংস্থাগুলো এ রাজ্যে লগ্নি করতে ভরসা পায় না – প্রধানত এই কারণগুলোকেই এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী করা হয়ে থাকে।

বস্তুত চৌত্রিশ বছরের বাম জমানায় পশ্চিমবঙ্গর কখনওই ‘শিল্পবান্ধব’ বলে বিশেষ সুনাম ছিল না। কমিউনিস্ট শাসিত রাজ্যে শিল্পপতিরাও ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়াতে বড় একটা সাহস পেতেন না।

কিন্তু এক যুগ আগে নন্দীগ্রাম ও সিঙ্গুরে কৃষিজমি রক্ষার আন্দোলন করে ক্ষমতায় আসা মমতা ব্যানার্জি সেই অনাস্থাকেই অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে চপ-তেলেভাজা ছাড়া অন্য কোনও শিল্প নেই, এ কথা আজকাল লোকের মুখে মুখে ফেরে।

ঠিক এই জায়গাটাতেই একটা ঢালাও পরিবর্তন আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিজেপি নেতৃত্ব। প্রধানমন্ত্রী মোদী যেমন তার প্রচারে বারবার বলেছেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলেই পশ্চিমবঙ্গে ‘আসল পরিবর্তন’ আসবে, রাজ্য ‘সোনার বাংলা’ হবে।

বিজেপিকে শিল্পপতিরা ভরসা করেন, তাই তারা পশ্চিমবঙ্গ শাসন করলে এ রাজ্যে বিনিয়োগের তুফান বয়ে যাবে, রাজ্যের যুবকরা চাকরি পাবেন – এই ছবিটাই তারা তুলে ধরতে চেয়েছেন।

কিন্তু বিষয়টা এত সরল, তা মোটেই বিশ্বাস করেন না কলকাতার সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্সেসের কর্ণধার ড. পার্থ চ্যাটার্জি।

রাজ্যে তার জনসভাগুলোয় প্রধানমন্ত্রী মোদী ‘সোনার বাংলা’ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন

তিনি বলছেন, ”বিজেপি ক্ষমতায় এলেও রাজ্যের অর্থনীতি রাতারাতি বদলে যাবে কিংবা মানুষের হাতে হঠাৎ প্রচুর টাকাপয়সা চলে আসবে এটা ভাবার কোনও কারণ নেই। শিল্পপতিরা তখনই বিনিয়োগে আকৃষ্ট হবেন যখন মুনাফার ভালো সম্ভাবনা থাকবে।”

”কিন্তু সেটা শুধু একটা সরকার পাল্টালেই হবে না, তার জন্য জোরালো একটা সামাজিক ভিত্তিও থাকতে হবে – যেটা আজকের পশ্চিমবঙ্গে নেই, খুব শিগগিরি হবে বলেও মনে হয় না।”

তবে রবিবারের নির্বাচনী ফলাফল যদি রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলের ইঙ্গিত দেয়, তাহলে পশ্চিমবঙ্গের রুগ্ন শিল্প-মানচিত্রে একটা ওলটপালট করে দেখানোর চেষ্টা হয়তো অবশ্যই হবে।

‘ডাবল ইঞ্জিন থিওরি’ কি বাংলায় চলবে?
বিগত প্রায় পাঁচ দশকে কোনও ‘সর্বভারতীয় দল’ পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা দখল করতে পারেনি। ১৯৭৭ সালে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে বামপন্থীরা রাজ্যে সরকার গঠন করার পর থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় পুরো সময়টাই বরং এমন দলই পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় ছিল – যাদের বিরোধীরা তখন দিল্লির মসনদে।

‘কেন্দ্রের বঞ্চনা’ পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য রাজনীতিতে হয়ে উঠেছিল একটি জনপ্রিয় ন্যারেটিভ। কেন্দ্রীয় সরকার কীভাবে পশ্চিমবঙ্গকে বঞ্চিত করে চলেছে সেটা প্রথম বলতে শুরু করেন বামপন্থীরা, পরে মমতা ব্যানার্জিও কমবেশি সেই একই হাতিয়ার রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছেন।

মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন তাঁর জনসভাগুলোয় জ্যোতি বসু নিয়ম করে ‘কেন্দ্রের বঞ্চনা’র কথা বলতেন

অথচ কেন্দ্রে আর রাজ্যে একই দলের সরকার ক্ষমতায় থাকলে দেশের সেই বিশেষ রাজ্যটার কতই না উন্নতি হতে পারে, গুজরাট-সহ বিভিন্ন রাজ্যের দৃষ্টান্ত দিয়ে পশ্চিমবঙ্গকে ঠিক সেটাই দেখাতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছে বিজেপি। তাদের ভাষায় যার নাম ‘ডাবল ইঞ্জিন’ তত্ত্ব।

প্রধানমন্ত্রী মোদী থেকে শুরু করে বিজেপির সব নেতা বারে বারে বলেছেন, কেন্দ্রে আর রাজ্যে একই দলের ইঞ্জিন থাকলে সে রাজ্যের রেলগাড়ি চলবে দ্বিগুণ গতিতে, উন্নয়ন হবে শনৈ শনৈ। কিন্তু প্রশ্ন হল, পশ্চিমবঙ্গ এই কথা কতটা বিশ্বাস করছে?

তৃণমূলের প্রবীণ নেতা ও এমপি সৌগত রায়ের সাফ জবাব, ”একদমই করছে না। যে দলের নীতিই হল এয়ার ইন্ডিয়া থেকে শুরু করে ভারত পেট্রোলিয়াম – রাষ্ট্রের সব সম্পদ পারলেই বেচে দাও, তারা যে এ রাজ্যে ঢুকলে পশ্চিমবঙ্গের সর্বস্ব আম্বানি-আদানিদের হাতে তুলে দেবে এটা মানুষ ভাল করেই জানে।”

অবিকল বামপন্থীদের সুরে তৃণমূলও এখন তাই বলছে, পশ্চিমবঙ্গ কখনওই ‘দিল্লি’কে বিশ্বাস করতে পারেনি – কারণ তাদের বিশ্বাস করা যায় না!

বিজেপির তাত্ত্বিক নেতা ও এবারের ভোটে প্রার্থী হওয়া স্বপন দাশগুপ্তরও স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, এ রাজ্যের বাঙালিদের মধ্যে একটা ‘বিদ্রোহী সত্তা’ চিরকালই কাজ করেছে।

তিনি বলছিলেন, ”বামপন্থীদের প্রভাব মাত্র কয়েকটি রাজ্যেই সীমিত, কাজেই তাদের জাতীয় দল কখনওই বলা যায় না। এবং সেই সাতাত্তর সাল থেকেই পশ্চিমবঙ্গ কখনওই কোনও জাতীয় দলে আস্থা রাখতে পারেনি, সম্ভবত তাদের মধ্যে একটা অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট মানসিকতা কাজ করেছে।”

”কিন্তু এতদিনে সেটা পাল্টাতে যাচ্ছে, সেই ইঙ্গিত কিন্তু একেবারে স্পষ্ট!”

কাজেই পশ্চিমবঙ্গও অবশেষে ভারতের জাতীয় রাজনীতির তথাকথিত ‘মূল ধারা’য় গা ভাসাবে, না কি আরও একবার ভরসা রাখবে একটি নিজস্ব আঞ্চলিক দলের ওপর – সেই প্রশ্নেরও জবাব এনে দেবে রবিবারের রায়।