কলারোয়ায় প্রধানমন্ত্রীর ঘর পেতে দিতে হয়েছে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা 

এবিসি বাংলা ডেস্কএবিসি বাংলা ডেস্ক
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  08:50 PM, 10 August 2021

সিরাজুল ইসলাম, সাতক্ষীরা:মুজিববর্ষে একজন মানুষও গৃহহীন থাকবে না-প্রধানমন্ত্রীর এই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জেলার কলারোয়া উপজেলার জয়নগর ইউনিয়নেও ঘর পেয়েছেন হতদরিদ্ররা। তবে এই ঘর পেতে প্রত্যেককে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা উৎকোচ দিতে হয়েছে এক ইউপি মেম্বারকে। বিষয়টি ফাঁসের পর তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগে জানা যায়ম উপজেলার জয়নগর ইউনিয়নের খোর্দ্দ বাটরা এলাকায় ১৭টি ঘর প্রদানে ৬নং ওয়ার্ড সদস্য স্থানীয় বজলু মেন্বরের মাধ্যমে এই খাত থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। বর্তমানে ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বিচার প্রার্থী এক গৃহবধূকে বিয়ে করে যেমন আলোচনায় এসেছেন, তেমনি প্রধানমন্ত্রীর ফ্রি ঘর প্রদানে বজলু মেন্বরের আর্থিক সুবিধা গ্রহণ ও নানা অনিয়ম এখন এলাকার মানুষের মুখে মুখে। সরকার প্রতিটি ঘর নির্মাণে ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়েছে।
উপজেলার খোর্দ্দ বাটরা গ্রামের তবিবর মোড়লের ছেলে মোখলেছুর রহমান জানান, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা জানতে পেরে আমি স্থানীয় ৬নং ওয়ার্ড মেন্বর বজলুর সাথে যোগাযোগ করি। তিনি আমাকে ২০ হাজার টাকা দিতে বলেন। আমি আমার বোনের একটা গরু বিক্রি করে বজলু মেন্বরের হাতে এককালিন ২০ হাজার টাকা তুলে দিই। ঘর প্রদানের তালিকায় আমার নাম আসে। তিনি আরও বলেন, আমার জানামতে আরও ৩জনের নিকট থেকে ঘর প্রদানের জন্য নগদ টাকা গ্রহণ করেছেন কিন্তু আমি তাদের নাম বলবো না। তিনি আরও অভিযোগ করে বলেন, কে কার কাছ থেকে টাকা নিয়েছে তা তদন্তে এসে সাংবাদিকরাও জেনেছেন কিন্তু রহস্যজনক কারণে চেপে গেছেন। যেকারণে দুর্নীতিবাজরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠে। তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানান।
কলারোয়ার গাজনা গ্রামের মৃত নেছার আলীর ছেলে সাইদুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘর দেয়ার কথা শুনে আমি একটি ঘরের জন্য বিভিন্ন জায়গায় কথা বলতে থাকি। এক পর্যায়ে আমার মেঝো ভাই আরিজুল জানায়, ঘর পেতে গেলে টাকা লাগবে। তখন সে আমাকে বলে ২০ হাজার টাকা দিতে। আমি ১৯ হাজার টাকা জোগাড় করে তার হাতে তুলে দিই। পরে তালিকায় আমার নাম আসে। তবে আমার মেঝো ভাই টাকা নিয়ে কার কাছে দিয়েছিল তা আমি বলতে পারবো না। বর্তমানে আমি একটি ঘর পেয়ে ওই ঘরেই বসবাস করছি।
উপজেলার মানিকনগর গ্রামের স্বামী পরিত্যাক্তা অসুস্থ জোহরা বেগম জানান, দরিদ্ররা ঘর পাবে এমন খবর শুনে আমি একটি ঘর পাওয়ার জন্য চেষ্টা করতে থাকি। তখন আমি উপজেলা চেয়ারম্যানের কাছে ও মানিকনগরের সাংবাদিক আব্দুর রহমানের কাছে বলি। তারা বলেন আমি একটি ঘর পাবো। এরপর তালিকায় নাম আসে। কিন্তু বজলু মেন্বর ফোন করে আমার কাছে বলে তুমি খুব গরীব মানুষ। তাই কম করে তুমি ১৫ হাজার টাকা দিবা। আমি টাকা দিতে অস্বীকার করলে সে আমাকে ধমকাতে থাকে। তার সঙ্গে আরও এক মেন্বর টাকা চায়। সব শেষে ঘরের মেঝেতে শুধু ইট দিয়ে প্লাস্টার করবে জেনে আমি বালি দিতে বলি। তখন আমার কাছ থেকে জোর জুলুম করে বজলু মেন্বর ১৫শ’ টাকা নেয়। বালি এনে আমার ঘরে কম করে দিয়ে আরও অনেক ঘরে সেই বালি দিয়েছে বলে জানান জোহরা খাতুন।
জয়নগর ইউনিয়নের খোর্দ্দ বাটরা গ্রামের মৃত গোলাপ রহমান গাজীর ছেলে আব্দুল ওহাব জানান, আমি ভূমিহীন দীনমজুর। জায়গাজমি না থাকায় আমি একটি ঘর পাওয়ার চেষ্টা করি। আমার ভাগ্নে হুমায়ুনের মাধ্যমে স্থানীয় বজলু মেন্বরের সাথে কথা বলে ভাগ্নের মাধ্যমে বজলু মেন্বরের হাতে ১৫ হাজার টাকা তুলে দিই। তখন তালিকায় আমার নাম আসে। যদিও মেন্বরের দাবি ছিল ২০ হাজার টাকা। আমার কাছে টাকা না থাকায় অন্যের নিকট থেকে ধার করে এনে এই টাকা মেন্বরকে দিয়েছিলাম। আর বলেছিলাম এতে যদি হয় ভাল, না হলে কিছুই করার নেই।
তিনি আরও বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দরিদ্র কৃষক দিনমজুর ভুমিহীনরা ঘর পাওয়ার কথা থাকলেও এলাকার প্রায় প্রত্যেকটি ঘর দেয়ার নামে আর্থিক সুবিধা নেয়া হয়েছে। তিনি এঘটনার সুষ্ঠ তদন্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
এদিকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে ঘরের তালিকা করার অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযুক্ত ইউপি মেম্বার বজলুর রহমান জানান, তালিকা প্রণয়নে কোন ধরণের অনিয়ম হয়নি। কারোর কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করা হয়নি। সামনে নির্বাচন, তাই এলাকার কিছু মানুষ অপপ্রচার চালাচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, তালিকা প্রণয়নে ইউপি সদস্যের কোন হাত নেই। চেয়ারম্যান, পিআইও, নায়েব ও ইউএনওরা একত্রিত হয়ে তালিকা তৈরি করেন। সবশেষে তিনি বলেন, আমি বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত। তাই আমাকে প্রতিপক্ষরা ঘায়েল করতে এধরণের অভিযোগ তুলেছে। তারা এরআগে আমার নামে মিথ্যা মামলাও দিয়েছে।
এবিষয়ে কলারোয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সুলতানা জাহান জানান, উপরোক্ত অভিযোগের বিষয়ে আমিও শুনেছি, তবে ঘর দেয়ার ক্ষেত্রে তালিকা প্রণয়ন, লে আউট দেওয়াসহ সকল কার্যক্রম তৎকালিন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মৌসুমী জেরিন কান্তা ও এসিল্যান্ড নিজেই করতেন। যা কলারোয়ার অনেকেই জানেন। আর্থিক সুবিধা নেয়ার বিষয়ে আমার কোন কিছুই জানা নেই। তবে এধরণের ঘটনা ঘটে থাকলে তা তদন্ত পূর্বক জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি করেন তিনি।
সার্বিক বিষয়ে কলারোয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জুবায়ের হোসেন চৌধুরি জানান, উপজেলার খোর্দ্দ বাটরা এলাকায় সরকারি ১৭টি ঘর প্রদানে অনিয়মের বিষয়ে আমি অবহিত হয়েছি। একজন ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে আর্থিক সুবিধা গ্রহণের বিষয়টি জেনে তদন্ত কার্যাক্রম অব্যাহত আছে।

 

 

খুলনা বিভাগ

আপনার মতামত লিখুন :