করোনাকালে অনলাইনে জমজমাট আমের বাজার

56

Last Updated on

করোনা দুর্যোগে মানুষের হাতে হাতে আম পৌঁছে দিতে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে অনলাইন প্লাটফর্মে আমের বিকিকিনি। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপসহ সব ধরনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে রাজশাহী অঞ্চলের অনেক তরুণ উদ্যোক্তা অনলাইনের মাধ্যমে আম বিক্রি শুরু করছেন। এতে একদিকে যেমন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে অন্যদিকে চাষিরা পাচ্ছেন ফসলের ন্যায্য মূল্য। আর ভোক্তারা অল্প সময়ের মধ্যে পাচ্ছেন চাহিদা অনুযায়ী ফরমালিনমুক্ত সুস্বাদু ও পরিচ্ছন্ন আম।

একটি বেসরকারি টেলিভিশনের নিউজ প্রেজেন্টার ছিলেন সিয়াম রেজওয়ান। চাকরি ছেড়ে দেশের বাড়ি রাজশাহীতে এসে যোগ দিয়েছেন ট্রাভেল এজেন্সির ব্যবসায়। করোনাভাইরাসের দুর্যোগে আপাতত সে ব্যবসা বন্ধ। হুট করেই শখের বসেই শুরু করেন আমের ব্যবসা। অনলাইনের মাধ্যমে ও পরিচিতদের কাছে এ পর্যন্ত তিনি ৫০ মণ আম সরবরাহ করেছেন।

সিয়াম রেজওয়ান জানান, কিছুদিন আগেও আমার অবস্থা ছিল যে, কেউ যদি লখনা আম নিয়ে এসে বলতো এটা হিমসাগর, আমি তা-ই বিশ্বাস করতাম। আমের কোনো জাত চিনতাম না। কিন্তু সেই আমি হুট করে একদিন ফেসবুকে শখের বসে অনলাইনে আম বেচাকেনার স্ট্যাটাস দিয়ে ফেলি। তারপর থেকেই আমার ফেসবুক ফলোয়ার ও বন্ধুরা আমাকে মেসেঞ্জারে নক করে আমের অর্ডার দেন।

”ব্যাপক সাড়া পাই। তখন আমি বাগান ঘুরে ঘুরে দেখেশুনে গাছের আম কিনে নিই। গাছ থেকে আম কিনে সেখানেই প্যাকিং করে কুরিয়ারের মাধ্যমে পাঠাই।”

সিয়াম রেজওয়ান জানান, কুরিয়ারে আম পাঠানোর কারণে দুই একজনের আম কিছুটা নষ্ট হয়ে গেছে। এখানে তো আমার কোনো হাত নেই। কুরিয়ার সেবাটা আরেকটু উন্নত হলে আরো ভালো সেবা দেওয়া সম্ভব হতো।

শুধু সিয়াম রেজওয়ান না, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁয় কয়েকশো তরুণ উদ্যোক্তা আম ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। অনলাইনে অর্ডার নিয়ে তারা বাগান থেকে আম পেড়ে, সেখানেই প্যাকিং করে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পৌঁছে দেন ভোক্তার কাছে। হাটে বাজারে আম বেচাকেনার ফলে কয়েকহাত ঘুরে সেই আম পৌঁছাতো ভোক্তাদের কাছে। অনলাইনে কেনাবেচার জন্য এখন তা অনেকটাই কমে গেছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ছাত্র মনু মোহন বাপ্পা। সদ্য তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। লকডাউনের ছুটিতে চলে গেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুরের বসনইল গ্রামে। গ্রামে থেকে আম ব্যবসা করছেন। অনলাইনেই বিক্রি করছেন বেশিরভাগ আম। রেইনবো ম্যাঙ্গো স্টেশন নামে তার একটি ফেসবুক পেজ রয়েছে। দেশের বিভিন্নস্থানে এ পর্যন্ত তিনি অনলাইনে ৩০ মণ গোপালভোগ ও খিরসাপাত আম বিক্রি করেছেন।

বাপ্পা জানান, আমাদের নিজস্ব ১০০ বিঘা আমের বাগান রয়েছে। তারপরও খিরসাপাত আর ল্যাংড়ার ৬০০ টির মতো গাছের শুধু আম কিনে নিয়েছি। এ ছাড়া ফজলি, আম্রপালি, বারি-৪ আর আশ্বিনা আম রয়েছে পর্যাপ্ত।

তিনি বলেন, স্থানীয় চাষীদের কাছ থেকেও আম কিনে থাকি। ফলে চাষীরাও লাভবান হন। কারণ চাষীদের হাটে আম নিয়ে গেলে খাজনা দিতে হয়। আবার দামও কম পান। আড়তদাররা আবার সেই আম বিক্রি করেন আম ব্যবসায়ীদের কাছে। সেই আম কয়েক হাত ঘুরে যেত ভোক্তার কাছে। ফলে বাধ্য হয়ে ব্যবসায়ীদের আমে ফরমালিন দিতে হয়। অনলাইনে বিক্রির ফলে সরাসরি বাগান থেকে আম প্যাকেট হয়ে ভোক্তার কাছে পৌঁছে যায়। ফলে টাটকা ফরমালিনমুক্ত আম পেয়ে যান ভোক্তারা।

মনু মোহন বাপ্পা জানান, শুধু রহনপুরেই ৩০টির মতো অনলাইনে আম বেচাকেনার ফেসবুক পেজ রয়েছে। যার মধ্যে ১০টা পেজ থেকে সরাসরি আম বাগান থেকে লাইভ করে ক্রেতাদের গাছ থেকে আম পাড়া ও প্যাকেটিং করে দেখানো হয়। অনেকে ফেসবুক মেসেঞ্জার, ইমো ও হোয়াটসঅ্যাপে লাইভ করেন। ফলে ক্রেতারা টাটকা আম পান।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক ছাত্র রাশেদুল ইসলাম। তার অনলাইন ম্যাঙ্গো শপ নামের একটি ফেসবুক পেজ রয়েছে। এ পর্যন্ত তিনি অনলাইন ও পরিচিতদের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাড়ে পাঁচ টন আম বিক্রি করেছেন। এ মৌসুমে তার ১৫০ টন আম বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে তার। তার অধীনে ফিল্ড পর্যায়ে ১২ জন ও দেশের বিভিন্ন জেলায় ৩০ জন কাজ করছেন।

রাশেদুল ইসলাম বলেন, আমি পাঁচ বছর ধরে আম ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত আছি। আমি অর্ডার নিয়ে সরাসরি বাগানীদের কাছে অর্ডার পৌঁছে দিই। বাগান থেকে সরাসরি আম পাড়া হয়। তারপর প্যাকেট করে পৌঁছে দেওয়া হয় ভোক্তাদের কাছে। পরিবহনের কাজে একটি কুরিয়ার সার্ভিস সহায়তা করে। এ ছাড়া বেশি আম হলে নিজস্ব যানবাহনে আম পরিবহন করা হয়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাগরইল গ্রামের আমচাষী সায়েম জানান, আমার মোটামুটি ১০০টির মতো আমের গাছ রয়েছে। আগে আম পেড়ে রহনপুর হাটে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করতাম। এখন অনলাইন ব্যবসায়ীদের কাছে বাগানেই আম বিক্রি করি।

”দাম ভালো পাওয়া যায়। আবার হাটের খাজনা দিতে হয় না। বাগান থেকে আম পেড়ে হাটে নিয়ে যাওয়ার পরিবহন খরচও বেচে যায়” বললেন তিনি।

অনলাইনে আম কিনেছেন চট্টগ্রামের ইমতিয়াজ হোসেন। তিনি পেশায় ব্যান্ডমিন্টন খেলোয়াড়। তিনি জানান, আমার পরিচিত একজনের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জে। তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জে একেকজনের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট দিয়ে যোগাযোগ করতে বলেন। তার সঙ্গে মেসেঞ্জারে যোগাযোগ করি। প্রথমে ২০ কেজি খিরসাপাত আম কিনি। ভালো পাওয়ায় পরে আবার ২৫ কেজি খিরসাপাত আম কিনেছি। দাম কিছুটা বেশি হলেও টাটকা আম পেয়েছি।

ডা. শিখা কর্মস্থল বগুড়ায়। রেইনবো ম্যাঙ্গো স্টেশন নামে একটি ফেসবুক পেজে অর্ডার দিয়ে কিনেছেন গোপালভোগ আম। তিনি জানান, অনেকগুলো পেজ দেখে রেইনবো ম্যাঙ্গো স্টেশন পেজটা ভালো লেগে যায়। সেখান থেকে নাম্বার নিয়ে যোগাযোগ করে আম কিনেছি। বাগানের টাটকা আমই পেয়েছি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাজশাহী অঞ্চল সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী অঞ্চলে আমচাষি ও বাগান মালিক রয়েছেন দুই লাখ ৫৯ হাজার ৪৬৫ জন। আর আম ব্যবসা থেকে শুরু করে বেচাকেনা, বিপণন ও বাজারজাতকরণসহ বিভিন্ন পর্যায়ে এক লাখ ৩১ হাজার মানুষ জড়িত আছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে চলতি বছর মোট ৮০ হাজার ৩৬০ হেক্টর জমিতে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে নয় লাখ ৩৮ হাজার ৭৭০ টন। গতবছর চার জেলায় ৭২ হাজার ৯০৯ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছে মোট আট লাখ ৩১ হাজার ৯৪০ মেট্রিক টন আম।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. শামসুল হক জানান, এ বছর আম্পানে ১৫ শতাংশ আম ঝরে গেলেও আমের দাম ভালো রয়েছে। ফলে আম ঝরে যাওয়ার পরও কৃষকরা খুব একটা লোকসানে পড়বেন না। বরং লাভবান হওয়ার সম্ভাবনায় বেশি আছে।