এখন ‘ওরা’ আত্মগোপনে

রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা সহস্রাধিক অপরাধী গেল কোথায়-প্রশ্ন সচেতন মহলের

বিশেষ প্রতিবেদকবিশেষ প্রতিবেদক
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  07:10 PM, 19 November 2022
ফাইল ছবি

যশোরের রাজনৈতিক সশস্ত্র ক্যাডার, শীর্ষ সন্ত্রাসী, খুন-গুম হত্যাসহ বহু মামলার আসামি, মাদক ও অস্ত্র কারবারী এবং দাগী-চিহিৃত চাঁদাবাজ চক্রের উৎপাত কমেছে। সারা শহর যারা মোটরসাইকেলে দাপিয়ে বেড়াতো তাদের দেখা মিলছে না। গ্রেফতার এড়াতে বিভিন্ন ক্যাটাগরির সহস্রাধিক অপরাধী জেলা ও উপজেলাসহ জেলার গুরুত্বপূর্ণ শহর ছেড়ে  আত্মগোপনে চলে গেছে। তবে এখন পর্যন্ত কিছু চিহিৃত মাদক ও অস্ত্রকারবারী কথিত ‘বড়ভাই’দের ডেরায় অবস্থান করছে বলে সূত্রে দাবি করা হয়েছে। এসব অপরাধীরা কথিত ‘বড়ভাই’র দেহরক্ষীর দায়িত্ব পালন করে। এদিকে অধিকাংশ অপরাধী গা ঢাকা দেয়ায় শহরে মোটরসাইকেলের চলাচল একদমই কমে গেছে।

ফাইল ছবি

 

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ২৪ নভেম্বর যশোরে প্রধানমন্ত্রীর জনসভা ঘিরে পুলিশ, র‌্যাব ও ডিবিসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো তৎপরতা জোরদার হয়েছে। তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী, খুন-গুম ও হত্যা মামলার আসামি, চিহিৃত চাঁদাবাজ এবং মাদক ও অস্ত্র কারবারীদের ধরতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালাচ্ছে। যশোরে নিñিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তুলতে গোটা জেলায় যখন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর, তখন কথিত ‘বড়ভাই’র পরামর্শে জেলা ছেড়ে পালিয়েছে অনেকে। কেউ আবার শহরতলীর আত্মীয়-স্বজনের বাড়িঘরে আশ্রয় নিয়েছে। এসব দাগী-চিহিৃত সন্ত্রাসী ক্ষমতাসীন দলের আশ্রয়-প্রশয়ে থেকে মাদক ব্যবসা থেকে শুরু করে চাঁদাবাজি, খুন-খারাপী, টেন্ডারবাজি ও ছিনতাই করে আসছিল।

 

সূত্রের দাবি, নিয়ন্ত্রণহীন আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে খোদ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সবুজ সংকেত পেয়ে থেকে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে আইন-প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। এই নির্দেশনা শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রীর জনসভা ঘিরে না, চলবে বছরজুড়ে। আগামী দ্বাদশ নির্বাচনের আগেই ক্ষমতাসীন দলের লবিং-গ্রুপিং নির্মূলের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সুত্রমতে, স্থানীয় শীর্ষ নেতৃবৃন্দ আধিপত্য বিস্তারে মাদক-অস্ত্র কারবারী, টেন্ডারবাজ, চাঁদাবাজ ও খুনিদের আশ্রয়-প্রশয় দিয়ে থাকে। এসব রাজনৈতিক অপরাধীদের গ্রেফতারে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যেও অহিনা কাজ করে। ফলে খুনোখুনি, টেন্ডারবাজি, মাদক ও অস্ত্র কারবারীরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। পরের সম্পত্তি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল-পাল্টা দখলের ঘটনাও ঘটে।

 

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণের পর যশোরে ক্ষমতাসীন দলে আধিপত্য বিস্তারের মহড়া শুরু হয়। এরফলে দলটির গুরুত্বপূর্ণ পদের অন্তত ৫০ নেতা দলীয় সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হয়েছেন। খুনের এই দীর্ঘ তালিকায় রয়েছেন-সদর উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন, উপজেলা ছাত্রলীগের আহবায়ক দাদা রিপন, শার্শা উপজেলা যুবলীগের ত্রাণ ও সমাজসেবা সম্পাদক কামরুজ্জামান রতন, চৌগাছা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ইউপি চেয়ারম্যান ইমামুল হাসান টুটুল, মণিরামপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের কৃষি বিষয়ক সম্পাদক আবু আবদুল্লাহ, গদখালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি রবিউল ইসলাম, পুটখালী ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক। ২০১৪ সালের ১৫ জানুয়ারি খুন হন যশোর শহর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম শিপন। তিনি নিজেও ভয়ংকর সন্ত্রাসী ছিলেন। পর্যায়ক্রমে জেলা তরুণ লীগের কামরুজ্জামান রিপন, যুবলীগ নেতা মজু, আব্দুল খালেক, নজরুল ইসলাম বাবু, আরব আলী, জামাল হোসেন, জাফর, তরিকুল ইসলাম, রুহুল আমীন, মনিরুল ইসলাম, আবদুল্লাহ ওরফে বাবু, শফিকুল ইসলাম ও মনিরুজ্জামান পিকুল। হত্যাকান্ডের শিকার এসব নেতা যশোর আওয়ামী লীগের দুই শীর্ষ নেতার অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
দলটির অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও আধিপত্য বিস্তারে বেপরোয়া হয়ে ওঠা আরও অনন্ত ৩শ উঠতি সন্ত্রাসী ও মাদক কারকারী দলীয় প্রতিপক্ষের হাতে, কেউ আবার কথিত ক্রসফায়ারে প্রাণ হারিয়েছে।

 

মোটরসাইকেল মিস্ত্রি রফিকুল ইসলাম জানান, দিনভর গ্যারেজ খুলে রেখে প্রায় শূন্য হাতে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে। মোটরসাইলে আসছে কম। যেকারণে কাজ-কর্ম হচ্ছে না।

বিভিন্ন সূত্রের দাবি- রাজনৈতিক সন্ত্রাসী, মাদক ও অস্ত্র ব্যবসায়ী, টেন্ডারবাজ ও চাঁদাবাজ ও দখলবাজসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরি অপরাধীদের তালিকা নেই যশোর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর যশোর থেকেও পাওয়া যায় না কোনো তথ্য। জানতে চাওয়া হলে পাওয়া যায় গতানুগতিক বক্তব্য। বলা হয় প্রতিনিয়ত আপডেট করা হচ্ছে। নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব না।

জানা যায়, সর্বশেষ ২০১৭ সালের ২৪ মে তৎসময়ের পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান জেলার শীর্ষ ১৪ মাদক ব্যবসায়ীর নামের তালিকা প্রকাশ করেন। তাদের ধরিয়ে দিতে ১০ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। তারপর যশোর পুলিশ আর কোনো সন্ত্রাসীদের নামের তালিকা প্রকাশ করেনি।

আপনার মতামত লিখুন :