উপকূলীয় অঞ্চলের নদ-নদীতে নির্বিচারে চলছে চিংড়ি পোনা আহরণ

এবিসি বাংলা ডেস্কএবিসি বাংলা ডেস্ক
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  09:55 PM, 31 July 2021

>>লোনা পানি কেন্দ্রের গবেষণা বলছে ধ্বংস হচ্ছে দেড়’শ প্রজাতির জলজ প্রাণী
পাইকগাছা প্রতিনিধি:পাইকগাছা তথা সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয় অঞ্চলের নদ-নদী থেকে নির্বিচারে আহরণ করা হচ্ছে চিংড়িসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনা। সরকারি নিষেধাজ্ঞা সত্বেও প্রতিদিন শত শত পোনা আহরণকারী শিবসা, কপোতাক্ষসহ অন্যান্য নদ-নদীতে নেট-জালসহ অন্যান্য জাল দিয়ে এসব পোনা আহরণ করছে। আহরণকারীরা চিংড়ি পোনা সংগ্রহ করার পর উৎসৃষ্ট অংশ ডাঙ্গায় ফেলে দেয়ার ফলে বিনষ্ট হচ্ছে অন্যান্য পোনাসহ গুরুত্বপূর্ণ জলজ প্রাণী। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট লোনাপানি কেন্দ্রের গবেষণা তথ্য অনুযায়ী একটি চিংড়ি পোনা আহরণ করতে গিয়ে নষ্ট হচ্ছে চিংড়িসহ দেড়’শ প্রজাতির জলজ প্রাণী। এভাবে প্রতিনিয়ত নির্বিচারে পোনা আহরণ করায় হুমকির মুখে পড়েছে উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক উৎসের জীববৈচিত্র।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের বাগদা চিংড়ির চাষ এক সময় প্রায় পুরোপুরিভাবে প্রাকৃতিক উৎসের পোনার উপর নির্ভরশীল ছিল। গভীর সমুদ্রে ডিম থেকে বের হয়ে নিশ্চল চিংড়ির লার্ভিগুলো ঢেউ ও জোয়ারের প্রভাবে নদীর মোহনা ও ম্যানগ্রোভ অঞ্চলে চলে আসে। যোগ্য পরিবেশ ও বিভিন্ন ধরণের খাদ্যের সমন্বয়ে উর্বর এসব অঞ্চল চিংড়ির লার্ভির দ্রুত বর্ধনের জন্য খুবই উত্তম স্থান। শুরুর দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে চিংড়ির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় চিংড়ি চাষের এলাকা ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটে। চিংড়ি চাষ দিন দিন বেড়ে চলায় পোনার চাহিদাও বেড়ে যায়। প্রথম দিকে সম্পুর্ণ প্রাকৃতিক উৎসের উপর নির্ভরশীল ছিল চিংড়ি চাষ। যদিও পরবর্তীতে হ্যাচারীতে চিংড়ি পোনা উৎপাদন শুরু হওয়ায় ধীরে ধীরে প্রাকৃতিক উৎসের পোনার প্রয়োজনীয়তা কমে আসে। কিন্তু অধিক চাহিদা, বিনিয়োগ কম কিন্তু আয় বেশি এমন কর্ম উপকূলীয় অঞ্চলের অশিক্ষিত ও বেকার যুবকসহ বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ জীবিকা নির্বাহের সহজ সরল পন্থা হওয়ায় তারা নির্বিচারে জলজ পরিবেশ হতে বিভিন্ন ধরণের জাল ব্যবহার করে বাগদাসহ অন্যান্য পোনা আহরণ শুরু করেন। এতে প্রাকৃতিক উৎসে মারাত্বকভাবে চিংড়িসহ অন্যান্য পোনা হ্রাস পায়। অন্যদিকে চাহিদার শতভাগ পোনা হ্যাচারীতে উৎপাদিত হওয়ায় সরকার প্রাকৃতিক উৎস থেকে চিংড়িসহ সবধরণের পোনা আহরণ বন্ধ করে দেয়। সরকারি এই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে এলাকার শত শত নারী-পুরুষ শিবসা, কপোতাক্ষসহ অন্যান্য নদ-নদী থেকে প্রতিদিন নির্বিচারে পোনা আহরণ করছেন।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট লোনাপানি কেন্দ্রের ১৯৯১ থেকে ১৯৯৭ সনের ‘বাংলাদেশ চিংড়ি পোনা সম্পদের জরীপ, প্রাপ্যতা নির্ণয় ও জীব-বৈচিত্র সংরক্ষণের প্রভাব’ সংক্রান্ত এক গবেষণার সমীক্ষায় দেখা গেছে আহরণকারীরা বাগদা চিংড়ির পোনা সংগ্রহ করারপর অন্যান্য অতীব মূল্যবান প্রাণীগুলো প্রতিদিন শুস্ক/উত্তপ্ত ডাঙ্গায় ছুড়ে ফেলে দিয়ে নির্দয়ভাবে হত্যা করছে। যা জীব-বৈচিত্র সংরক্ষণে মারাত্বক হুমকি সৃষ্টি করছে। সমীক্ষায় ১৯৯২ সালের খুলনার নদ-নদীর একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। যেখানে দেখা গেছে একটি চিংড়ি পোনা আহরণ করতে গিয়ে আহরণকারীরা ধ্বংস করছে ২৫টি অন্যান্য চিংড়ি প্রজাতি, ১১৫টি ম্যাক্রোজুপ্ল্যাংকটন ও ১৬টি সাদা মাছের পোনা। অন্যান্য চিংড়ি প্রজাতির মধ্যে যেগুলো রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, বাগতারা, চাপদা/চাকা, হরিণা, হন্নি, গোসা, রশনাই, ছটকা ও গলদা। সাদা মাছের মধ্যে রয়েছে, পাইসা, খরকুনো, ভাংগন, ভেটকী, পাংগাস, ইলিশ, পুটি, টেংরা, লইটা ও বাইলা। প্ল্যাংকটনের মধ্যে রয়েছে-এসিটিস, মাইসিটস, কপিপড, আইসোপড, অ্যালিমা ও কাঁকড়া লার্ভি। প্রাকৃতিক উৎসের এসব পোনা আহরণ বন্ধ করতে প্রশাসনও যেন হিমশিম খাচ্ছে। প্রশাসন, মৎস্য দপ্তর ও নৌ-পুলিশ যৌথভাবে বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে এদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলেও থামছে না পোনা আহরণ।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবিএম খালিদ হোসেন সিদ্দিকী জানান, এলাকার নদ-নদী থেকে অবাধে পোনা আহরণ বন্ধে আমরা সম্মিলিত পদক্ষেপ নিয়েছি। কখনো সরাসরি নদীতে, আবার কখনো বিক্রয় কেন্দ্র, আবার কখনো সরবরাহ করার সময় পোনা আহরণকারী এবং সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে জরিমানাসহ আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি। এরপরও প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে অনেক সময় অনেকেই পোনা আহরণ করছে। শুধু আইন প্রয়োগ করে উপকূলীয় প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং জীব-বৈচিত্র সংরক্ষণ সম্ভব নয়। এখানে সচেতনতা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য এ কাজে উপকূলীয় অঞ্চলের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

খুলনা বিভাগ

আপনার মতামত লিখুন :