উগ্রবাদী ঠেকাতে কঠোর অবস্থানে কওমী মাদাসা কর্তৃৃপক্ষ

22

উগ্রপন্থী ভাবাদর্শে বিশ্বাসী ছাত্রদের নতুন করে ভর্তির ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নিয়েছে দেশের কওমি মাদ্রাসাগুলো। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ মাদ্রাসাগুলোতে ভর্তির ক্ষেত্রে কোনও অবস্থাতেই রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক এমনকি কোনও সংগঠনে সক্রিয় থাকলে ভর্তি না নেওয়ার কথা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো। আরও খবর>>বিতর্কিত ইসলামি বক্তা আমির হামজা কুষ্টিয়ায় গ্রেফতার

 

ঢাকা ও ঢাকার বাইরের বিভিন্ন কওমি মাদ্রাসার শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েকবছরে কওমি মাদ্রাসাগুলোতে সশস্ত্র জিহাদি মতাদর্শের প্রতি কিছু শিক্ষার্থী ঝুঁকে পড়েছে। এরমধ্যে, গত ২৫, ২৬ ও ২৭ মার্চ দেশের বিভিন্ন এলাকায় হেফাজতের বিক্ষোভ ও হরতাল কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ঢাল, তলোয়ার, ঘোড়ার ব্যবহার করেছে কিছু শিক্ষার্থী। কওমি মাদ্রাসায় এই মতাদর্শের অনুসারীদের ‘মানহাজি’ নামে আখ্যা দেওয়া হয়। তারা বলছেন, মানহাজি মতাদর্শের ছাত্র-শিক্ষকরা প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্ষতিকারক।

মাদ্রাসার শিক্ষকরা জানান, মানহাজিদের ঠেকাতে এবার কওমি মাদ্রাসায় ভর্তির ক্ষেত্রে কয়েকটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে দাওরায়ে হাদিস ক্লাসে ভর্তির ক্ষেত্রে অবারিত না করে আবাসিক আসন সাপেক্ষে ছাত্রভর্তি নেওয়া হবে। যে ছাত্ররা উগ্রপন্থী আচরণ দেখিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কট্টরপন্থা অবলম্বন করেছে, তাদের ভর্তি নেওয়া হবে না। এছাড়া, এক মাদ্রাসা থেকে অন্য মাদ্রাসায় ভর্তির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের আবশ্যিকভাবে ছাড়পত্র বা কোনও শিক্ষকের প্রত্যয়নপত্র জমা দিতে হবে।

তরুণ একজন ইসলামি চিন্তক জানান, বাংলাদেশে যারা আল কায়েদার মতাদর্শী, তারা নিজেদের মানহাজি বলে আখ্যায়িত করে থাকে। কওমি মাদ্রাসায় তারাই মানহাজি হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশে মানহাজিরা হলো— ‘মাদখালি’দের বিপরীত। মাদখালি হলো— যারা সৌদি সরকার বা আরবের সরকারের সকল কার্যক্রমের নিরঙ্কুশ বৈধতা দেয়। মাদখালিরা সৌদি সরকারকে খলিফা আখ্যা দেয় এবং তারা মনে করে, খলিফার বিরুদ্ধে লড়াই করা কুফুরি।

গত বছরের ২৭ অক্টোবর হেফাজতের বিক্ষোভে আইএসের অনুকরণে পতাকার ব্যবহার
গত ১৮ মে দেশের বৃহৎ কওমি প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসার ভর্তি বিজ্ঞপ্তিতে সাতটি শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য— প্রচলিত রাজনৈতিক, অরাজনৈতিক কোনও সংগঠন ও আইনশৃঙ্খলাবিরোধী কোনও কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা যাবে না, কোনও ছাত্র ফেসবুকসহ সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট দিলে শাস্তিযোগ্য হবে, সর্বাবস্থায় মাদ্রাসা ক্যাম্পাসে অবস্থান করতে হবে। আগামী ৩০ মে থেকে হাটহাজারী মাদ্রাসায় ভর্তি শুরু হবে।

কওমি মাদ্রাসার একজন প্রিন্সিপাল সোমবার (২৪ মে) দুপুরে বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, উগ্রপন্থী মানহাজিদের ঠেকাতে ঢাকার ফরিদাবাদ, যাত্রাবাড়ীসহ কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানে দাওরায়ে হাদিসে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ ছাড়া ভর্তি নিতে অনুৎসাহিত করা হয়েছে। ভর্তি পরীক্ষাও কড়াকড়ি করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠানে দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স) ক্লাসে এক থেকে দেড় হাজার ছাত্র ভর্তি করা হতো, সেসব প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ ছাড়া ভর্তিতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। এছাড়া, ছাত্রদের চরিত্র ও আমলের বিষয়টিও এখন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে ভর্তির ক্ষেত্রে।

জামেয়া কোরআনিয়া আরাবিয়া লালবাগ মাদ্রাসার তাকমিল ক্লাসের ভর্তির দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক মাওলানা মাকসুদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানে প্রকাশ্যে কোনও ছাত্র উগ্রপন্থায় যুক্ত নেই। তবে কেউ-কেউ ভেতরে-ভেতরে থাকলেও বুঝা অনেক কঠিন। দাওরায়ে হাদিসে আবাসিক জায়গা সাপেক্ষে আমাদের এখানে ৮০ থেকে ৯০ জন ভর্তি নেওয়া হবে।’

ঢাকার মতো চট্টগ্রামের বৃহৎ কওমি প্রতিষ্ঠান আল জামিয়া আল ইসলামিয়া-পটিয়া মাদ্রাসায়ও রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সংগঠনে যুক্ত ছাত্রদের ভর্তি না নেওয়ার ব্যাপারে কঠোর নীতিমালা করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের ভাইস প্রিন্সিপাল মাওলানা উবায়দুল্লাহ হামজা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দুয়েকদিনের মধ্যেই আমাদের নতুন, পুরাতন ছাত্রদের ভর্তির প্রক্রিয়া শুরু হবে। আমরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই নীতিমালা করেছি। শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু গাইডলাইন আছে। সেটি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে যাবে, ছাত্রদের কাছে পৌঁছানো হবে।’

মাদ্রাসার শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত এপ্রিল থেকে হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচি ও নাশকতাকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গ্রেফতার অভিযান ও সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে মৌলিক সংকটে পড়ে কওমি মাদ্রাসাগুলো। পরে ২৫ এপ্রিল কওমি মাদ্রাসাগুলোর সর্বোচ্চ সংস্থা আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি’আতিল কওমিয়ার স্থায়ী কমিটির সভায় কয়েকটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য— কওমি মাদরাসার ছাত্র ও শিক্ষকরা প্রচলিত সবধরনের রাজনীতি থেকে মুক্ত থাকবে।

ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বড় কওমি প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রভর্তির ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম আরোপ করা হয়েছে। বিশেষ করে, উগ্রপন্থী মানহাজিদের ভর্তি ঠেকাতে শহরের জামিয়া ইউনুছিয়া, দারুল আরকাম আল ইসলামিয়া, জামিয়া সিরাজিয়া দারুল উলুমসহ বেশকিছু প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

দারুল আরকাম আল ইসলামিয়া মাদ্রাসায় ছাত্র ভর্তির নোটিশেও হাটহাজারী মাদ্রাসার নির্দেশনাকে সামনে রেখে রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলাবিরোধী কোনও কার্যক্রমে যুক্ত ছাত্রদের ভর্তি না নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা সচিব মাওলানা শামসুল হকের সই করা জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসার ভর্তি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, জামিয়ায় অধ্যয়নরত অবস্থায় কোনও ছাত্রই রাজনৈতিক, অরাজনৈতিক বা কোনও সংগঠনেই যুক্ত থাকতে পারবে না। এছাড়া, দেশের আইনশৃঙ্খলাবিরোধী কোনও কর্মকাণ্ডেও যুক্ত থাকতে পারবে না ছাত্ররা।

জানতে চাইলে দারুণ আরকাম মাদ্রাসার একজন সিনিয়র শিক্ষক নাম প্রকাশ না করে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানই কেবল নয়, দেশের অন্য কওমি মাদ্রাসাগুলোতও ছাত্র ভর্তির বিষয়ে কঠোরতা অবলম্বন করা হয়েছে। দেশের জাতীয় সংস্কৃতিসমৃদ্ধ জাতীয় দিবসগুলো পালন করা হচ্ছে নিয়মিত। জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হচ্ছে নিয়মিত। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবসসহ জাতীয় দিবসগুলোতে নানা আয়োজন করা দারুল আরকামের প্রচেষ্টা দীর্ঘদিনের। ভবিষ্যতেও এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা হবে।’

শিক্ষকরা বলছেন, কওমি মাদ্রাসার অভ্যন্তরে কিছু শিক্ষক-ছাত্র উগ্রপন্থার দিকে ঝুঁকলেও এদের একটি বড় অংশ চিহ্নিত ও বিভিন্ন নাশকতার মামলায় কারাগারে আছে। তবে, গত বছরের সেপ্টেম্বরে আল্লামা আহমদ শফীর ইন্তেকালের পর হেফাজত নেতা মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরীকে ঘিরে একটি গোষ্ঠী আবারও সক্রিয় হয়। গত বছরের ২৭ অক্টোবর ফ্রান্সে ইসলামের শেষ নবী হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর ‘ব্যঙ্গচিত্র’ প্রদর্শনের প্রতিবাদে হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে হেফাজতের যে বিক্ষোভ হয়, ওই বিক্ষোভেও আইএস-ঘরানার তলোয়ার সংবলিত পতাকা ব্যবহার করা হয় প্রথম। এরপর ঢাকায় বায়তুল মোকাররম থেকে কাকরাইল হয়ে যে বিক্ষোভ মিছিল হয়, সেই মিছিলেও জিহাদের পক্ষে স্লোগান দেওয়া হয়।

কয়েকজন শিক্ষকরা জানান, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে চট্টগ্রামের নাজিরহাট মাদ্রাসার মুহতামিম নিয়োগকে কেন্দ্র করে উগ্রপন্থী মানহাজিদের বিপুল সক্রিয়তা দেখা যায়। আল্লামা শফীর অনুসারী খ্যাত মাওলানা ছলিম উল্লাহকে সরিয়ে জুনায়েদ বাবুনগরীর অনুসারী খ্যাত মুফতি হাবিবুর রহমান কাসেমীকে মুহতামিম বসাতে ওই সময় হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে একদল শিক্ষার্থী ওই প্রতিষ্ঠানের ইফতা বিভাগে ভর্তি হয়েছিল। ওই ঘটনার পর কওমি মাদ্রাসাগুলো সতর্ক হতে শুরু করে।

গত বছরের ২৭ অক্টোবর হাটহাজারীতে কওমি শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ
বিশেষ কোর্সগুলোতেও কড়াকড়ি আরোপ

কওমি মাদ্রাসায় সাধারণ ক্লাসগুলোতে ভর্তির মতো বিশেষ কোর্সগুলোতেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। ইফতা (উচ্চতর ইসলামি আইন ও গবেষণা বিভাগ), তাফসির (উচ্চতর কোরআন গবেষণা) ও আরবি সাহিত্য বিভাগে ভর্তির ক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণির ফলাফল করা ছাত্রদের বাইরে অন্যদের ভর্তির বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো।

সিলেটের একটি কওমি মাদ্রাসার মুহতামিম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, কওমি মাদ্রাসায় উগ্রপন্থীদের বড় অংশটি নিয়মিত পড়াশোনায় পিছিয়ে রয়েছে। এদের অধিকাংশ বড় মাদ্রাসায় পড়াশোনা করলেও নিয়মিত পড়াশুনা ও পরীক্ষায় অন্যদের চেয়ে পিছিয়ে আছে। সেক্ষেত্রে দাওরায়ে হাদিসসহ অন্যান্য ক্লাসে ভর্তির ক্ষেত্রে ভালো রেজাল্টের শর্ত দিয়েছে বিভিন্ন মাদ্রাসা।

দারুল আরকাম মাদ্রাসার গাইডলাইনে বলা হয়েছে, ইফতা, আরবি সাহিত্য বিভাগে দাওরায়ে হাদিস পরীক্ষায় ন্যূনতম মুমতাজ (স্টার মার্ক) ও জায়্যিদ জিদ্দান (প্রথম শ্রেণি) প্রাপ্তি সাপেক্ষে ছাত্র ভর্তি করা হবে।

চট্টগ্রামের একাধিক আলেম জানান, উগ্রপন্থী মানহাজিদের উপস্থিতি ঠেকাতে চট্টগ্রামের অন্যতম বৃহৎ প্রতিষ্ঠান পটিয়া মাদ্রাসায় ইফতা বিভাগে চলতি শিক্ষাবর্ষে ভর্তি কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানের ভাইস প্রিন্সিপাল মাওলানা মাওলানা উবায়দুল্লাহ হামজা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা আপাতত এক বছরের জন্য ইফতা বিভাগ বন্ধ রেখেছি। তবে ফতোয়া (ইসলামি আচারবিধি বিষয়ক বিধান ও সমাধান) কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। আগামী বছর আবারও নিয়মিত ভর্তি নেওয়া হবে।’