আ’লীগ নেতা বিপুকে হেলিকপ্টারে করে পাঠানো হয়েছে ঢাকায়

24

>>পুলিশের দাবি তাকে নির্যাতনের অভিযোগ ঠিক না
>>রাতে বাড়ি বাড়ি ঢুকে পুলিশী তান্ডবের ঘটনাও ভিত্তিহীন-তবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে-এসপি
>>অপহরণের পর মারপিটের অভিযোগে থানায় পুলিশের মামলা
এবিসি ডেস্ক:
পুলিশ হেফাজত থেকে মুক্ত হওয়ার পর যশোর আড়াইশ বেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয় যশোর শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহামুদ হাসান বিপুকে। কিন্তু সেখানে অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় হেলিকপ্টারে পাঠানো হয়েছে ঢাকায় । আজ বুধবার (১৩ জানুয়ারি) বিকালে হেলিকপ্টারে তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হয়েছে-জানানো হয়েছে দলটির পক্ষ থেকে।
এদিকে পুলিশ কনস্টেবল ইমরান নিজে বাদী হয়ে কোতয়ালি থানায় মামলা করেছেন। তিনি মামলার এজাহারে দাবি করেছেন তাকে কাঠালতলায় একটি ঘরে আটকে রেখে আ’লীগ নেতাদের সামনে ফের মারপিট করা হয়। মামলার এক আসামি আ’লীগ নেতা বিপুর ভগ্নীপতি। আসামিদের আদালতে পাঠিয়ে ৭দিনের রিমান্ডের আবেদন করেছে পুলিশ। আরও খবর>>

এরআগে, সোমবার (১১ জানুয়ারি) পুলিশ কনস্টেবলকে মারধর ও তুলে নিয়ে অন্যত্রে আটকে রেখে ফের নির্যাতনের অভিযোগে তাকেসহ ৪জনকে আটক করে পুলিশ। মঙ্গলবার দিনভর জেলার উপজেলায় দলীয় নেতাকর্মীদের বিক্ষোভ সমাবেশে উত্তাল হয়ে ওঠে যশোর। এক পর্যায়ে ১৯ ঘন্টার পর হেফাজতে থাকা বিপুকে থানা থেকে ছাড়িয়ে আনে সদর উপজেলা আ’লীগের সভাপতি মোহিত কুমার নাথ। থানা থেকে সরাসরি তিনি গাড়ীখানায় আ’লীগ অফিসে এসে সহকর্মীদের ভুমিকার প্রশংসা করেন। তিনি শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে বলে জানান। রাতে তাকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

মাহামুদ হাসান বিপু অভিযোগ করেন, পুলিশ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে তাকে কয়েক দফা নির্মমভাবে পেটানো হয়েছে। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। অবশ্য, পুলিশ সুপার দাবি করেছেন, পুলিশের হেফাজতে কোনও মারপিটের ঘটনা ঘটেনি।

এছাড়া রাতে আওয়ামীলীগ ও যুবলীগ নেতাদের বাড়িঘরে হামলা ভাংচুর ও গালিগলাজ করার অভিযোগ খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

জানা গেছে, সোমবার রাত ৮টার দিকে যশোর শহরের পুরাতন কসবায় নতুন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় সাদা পোশাকে থাকা কয়েকজন পুলিশ সদস্যের সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের গোলযোগ হয়। তবে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ একটি মেয়ের সাথে খোশ গল্প করছিল পুলিশ সদস্য ইমরান। যা দেখতে দৃষ্টিকটু। এনিয়ে কয়েকজনের বাকবিতন্ডা হয়। এ ঘটনার সময় আ’লীগ নেতা বিপু ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ সদস্য ইমরানকে রক্ষার চেষ্টা করেন।

এবিষয়ে পুলিশে দাবি, মেয়ের সাথে গল্প করার অভিযোগটি সঠিক না। ডিসি অফিসে কর্মরত ইমরান ও জান্নাত বাইরে থেকে খাবার খেয়ে কর্মস্থলে ফিরছিলেন। এ সময় আওয়ামী লীগ কর্মীরা ইমরানকে মারপিট ও তুলে নিয়ে যায় পাশের আবু নাসের স্মৃতি সংসদ ক্লাবে। ঘটনার সময় সেখানে শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদ হাসান বিপুও ছিলেন। ক্লাবে নিয়ে ফের মারপিট করা হয় ইমরানকে। খবর পেয়ে পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা ইমরানকে উদ্ধার ও আওয়ামী লীগ নেতা মাহমুদ হাসান বিপুসহ চার জনকে হেফাজতে নেয়। প্রায় ১৯ ঘণ্টা পর ১২ জানুয়ারি দুপুরের পর মাহমুদ হাসান বিপুকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর রাতেই গুরুতর অবস্থায় যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি।

মাহামুদ হাসান বিপুর অভিযোগ, ‘পুলিশ হেফাজতে নিয়ে তাকে নির্মমভাবে মারপিট করা হয়েছে। তিনি বলেন, ঘটনার সময় আমি আবু নাসের স্মৃতি সংসদের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তখন শহর আওয়ামী লীগের এক প্রবীণ নেতা এসে বলেন, “শহীদ মিনারের সামনে মারামারি হচ্ছে, পারলে ঠেকাও।” এগিয়ে গিয়ে দেখি একটি ছেলেকে কয়েকজন মিলে মারধর করছে। আমি ছেলেটাকে সেভ করি। অন্যদের বলি, কেন মারছো, চলে যাও সবাই। ওরা বলে আমাদের মেরেছে এজন্য মারছি। পরে আমি তাদের চলে যেতে বলি। তখন দেখি আরও অনেকে দৌঁড়ে আসছে। তখন ছেলেটাকে রক্ষা করতে একটি মোটরসাইকেল দাঁড় করিয়ে বলি ছেলেটাকে একটু কাঁঠালতলা অফিসে পৌঁছে দিতে। ওই অফিসটি জেলা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি শাহীন চাকলাদারের ব্যক্তিগত কার্যালয়। ভেবেছিলাম, ওখানে পাঠালে কেউ আর ছেলেটাকে মারতে পারবে না এবং ওসি সাহেবকে খবর দিয়ে ছেলেটাকে তাদের হাতে দিয়ে দেবো। ওসি সাহেবকে ফোন দিতে দিতে পুলিশ চলে আসে। পুলিশকে বিষয়টি বর্ণনা করি। এরপর ওই ছেলেটাকে কাঁঠালতলা অফিস থেকে ফিরিয়ে এনে পুলিশের কাছে দিয়ে দিই। এরপর ওসি ঘটনাস্থলে আসেন। তিনি এসে কে পুলিশের ওপর হাত দিয়েছে জানতে চান। তখন আমি জানতে পারি আক্রান্ত ছেলেটি পুলিশ সদস্য। এরপর হঠাৎ আমার ঘাড়ে লাঠি দিয়ে আঘাত করে পুলিশ। আমি জিজ্ঞাসা করছি, এমন পরিস্থিতি কেন তৈরি করছেন। এরপর আমাকে ধরে পুলিশ প্রথমে থানায় ও পরে ডিবি অফিসে নিয়ে যায়। সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাব্বানী গালিগালাজ করেন এবং অস্ত্র বের গুলি করার হুমকি দেন। আমি বলি, আমার পরিবারে ৭ জন মুক্তিযোদ্ধা, পরিবারের সবাই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আমি ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিয়ে আজকে শহর আওয়ামী লীগের নেতা। আমাকে কাউয়া লীগ বলবেন না। এরপর ৭/৮জন মিলে মৌমাছির মতো ২০-২৫ মিনিট ধরে আমাকে নির্মমভাবে মারপিট করেন।’

বিপু আরও বলেন, ‘পরে আক্রান্ত পুলিশ সদস্যকে নিয়ে আসা হয়। সে কর্মকর্তাদের সামনে জানায়, আমি তাকে সেভ করেছি। এর আধঘণ্টা পর আবার আমার চোখ বেঁধে মারপিট করা হয়। আমার কোনও অপরাধ ছিল না। আমি আওয়ামী লীগের কর্মী অথচ আমাকে চোরের মতো মারপিট করা হয়েছে। একপর্যায়ে আমি বললাম, আমার মাথায় বাড়ি মারেন। পরে ওরা চলে গেলো। আমার চোখ বাঁধা, হাত পিছমোড়া করে হ্যান্ডকাফ লাগানো। পা দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল। আধঘণ্টা পরে পানি খেতে চাইলে দেওয়া হয়। কিন্তু চোখ খোলেনি। রাত পৌনে ৩টার দিকে আবার একটি টিম এসে বলে, “পুলিশের গায়ে হাত দিস।” আমি বললাম, পুলিশের হাবিলদার থেকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমার সুসম্পর্ক। আমার সঙ্গে কারও কোনও দ্বন্দ্ব নেই। এরপর তারা বলে, “তোর বাহিনী মেরেছে।” এরপর আবার মারপিট শুরু হয়। তাদের বলি, আমি কোনও অপরাধ করিনি, তারপরও যদি আপনাদের মনে হয় তাহলে মাথায় বাড়ি দিয়ে মেরে ফেলেন। তবু এভাবে নির্যাতন করেন না। বিএনপি আমলে আমাকে ধরে এনে মাত্র চারটা বাড়ি মারছিল আর আপনারা যা করছেন তার থেকে আমারে মেরে ফেলেন। আমি পুলিশ ভাইটিকে সেভ করেছি। এটাই আমার কাল হলো।’

এদিকে, বিপুকে চিকিৎসা প্রদানকারী অর্থোপেডিক সার্জন আব্দুর রউফ জানান, বিপুর শরীরের একাধিক স্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এছাড়া তার ডায়াবেটিস ধরা পড়েছে। তার সুস্থ হতে সময় লাগবে।

জানতে চাইলে শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট মোহাম্মাদ আসাদুজ্জামান বলেন, ‘বিপুকে নির্মম নির্যাতন করে পুলিশ থামেনি। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সোমবার রাতে শহরের অনেক আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করেছে পুলিশ।’ এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত করে বিচার দাবি করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘বিপুর অবস্থা খুবই গুরুতর। চিকিৎসকরা তাকে উন্নত চিকিৎসার পরামর্শ দিয়েছেন। এজন্য তাকে হেলিকপ্টারযোগে ঢাকায় বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে।’

পুলিশ সুপার মুহাম্মাদ আশরাফ হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ‘পুলিশ সদস্য মারপিট ও আটকে রাখার ঘটনায় মামলা হয়েছে। এ অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের ধরতে ওই রাতে (সোমবার) অভিযান চালানো হয়েছে। তবে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে যে অভিযোগ করা হচ্ছে, তা সত্য নয়। কোনও আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে ভাঙচুর চালানো হয়নি। সিসিটিভির ফুটেজ দেখেছি। সেখানে পুলিশের টিম কেবল যাচ্ছে। তারা বেআইনিভাবে ভাঙচুর করেছে, এমন কোনও ছবি নেই। এমনকি পুলিশ হেফাজতে বিপুকে কোনও মারপিটের ঘটনাও ঘটেনি। তিনি একজন সম্মানিত লোক, জিজ্ঞাসাবাদের কিছু নিয়ম আছে; সেগুলো মেনেই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তারপরও অভিযোগ যেহেতু আসছে, সে কারণে সিনিয়র কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে একটি তদন্ত টিম করে দেওয়া হয়েছে। ফলে কোনও ব্যত্যয় হলে তা তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পরই বলা সম্ভব হবে।’

এদিকে, পুলিশ সদস্যকে মারপিটের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় বিপুর সঙ্গে আটক শাহিনুজ্জামান তপু ও ইমামুল হককে আসামি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার। এছাড়া অন্যরা নিরপরাধ হওয়ায় তাদের আসামি করা হয়নি।

সবমিলিয়ে যশোরে চরম অস্থির পরিবেশ বিরাজ করছে।