আগস্টে ভয়ংকররুপ নিতে পারে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট

এবিসি বাংলা ডেস্কএবিসি বাংলা ডেস্ক
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  07:23 PM, 31 July 2021

এবিসি ডেস্ক:বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টিকারী ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের দাপটে বাংলাদেশেও দৈনিক রোগী শনাক্ত ও মৃত্যু বেড়েছে কয়েকগুণ। করোনার ঊর্ধ্বগতিতে চলতি মাসের শুরুতে দেশে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে সরকার। পরে ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে লকডাউন শিথিল করা হয়। এই সুযোগে ঢাকা ছেড়ে গ্রামমুখী হয়েছে মানুষ। প্রাইভেট কার, মাইক্রো, বাসে, লঞ্চে কিংবা ফেরিতে গাদাগাদি করে গ্রামে গিয়েছেন ঈদ উদযাপন করতে। আবার ঈদের পরের কয়েকদিনে কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যেই একভাবে ঢাকায় ফিরেছে মানুষ। আরও খবর>>করোনায় ২৪ ঘন্টায় প্রাণ গেছে আরও ২১৮ জনের

কঠোর বিধিনিষেধ শিথিল ঘোষণার পরেই কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্যরা বলছেন, শিথিলতার এ নির্দেশনায় তাদের ‘সায়’ ছিল না। তারা বলছেন, সরকারের শিথিল বিধিনিষেধের এ ঘোষণা তাদের পরামর্শের উল্টো চিত্র। এ সময় এ ধরনের শিথিলতা বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ারই শামিল। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছিল, স্বাস্থ্য অধিদফতর যেখানে বারবার ভিড় এড়িয়ে চলার কথা বলছে, সেখানে সংক্রমণের ‘পিক টাইম’-এ এ ধরনের ঘোষণা আমাদের আরও খারাপ অবস্থায় নিয়ে যাবে।

সে আশঙ্কাকে সত্যি করে দেশে ঈদের পর থেকে দৈনিক রোগী শনাক্ত ও মৃত্যুর একের পর এক রেকর্ড দেখতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। আর এতে করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার করা তালিকায় বিশ্বে এখন যেসব দেশে দৈনিক রোগী শনাক্ত ও মৃত্যু সবচেয়ে বেশি হচ্ছে, সেই তালিকায় অষ্টম অবস্থানে বাংলাদেশ।

এদিকে কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যেই আগামীকাল রবিবার (১ আগস্ট) থেকে পোশাক কারখানা খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে সরকার। ঈদের পরও যেসব পোশাক কর্মী গ্রামে অবস্থান করছিলেন এমন খবরে তারা এরই মধ্যে ঢাকায় আসতে শুরু করেছেন। গণপরিবহন চলাচল বন্ধ থাকায় শ্রমিকরা পিকআপ, ট্রাক ও ইঞ্জিনচালিত ভ্যান ও রিকশায় বাড়ি থেকে রওয়া হয়েছেন। যানবাহন না পেয়ে অনেকে হেঁটে ছুটছেন গন্তব্যের পথে। আবার অনেকে গাড়ি পাওয়ার আশায় বিভিন্ন স্ট্যান্ডে ও সড়কের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে মোড়ে জড়ো হয়ে অপেক্ষা করছেন দীর্ঘক্ষণ। করোনাভাইরাস সংক্রমণের মারাত্মক ঝুঁকি থাকলেও এসব শ্রমিকের কাছে চাকরি রক্ষা করাটা বেশি প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেছেন তারা।

বিধিনিষেধে ফেরিতে যাত্রী পারাপার নিষিদ্ধ হলেও যাত্রীরা তা মানছেন না বলে জানিয়েছেন বিআইডব্লিউটিসির আরিচা কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) মো. জিল্লুর রহমান। গতকাল শুক্রবার ( ৩০ জুলাই) তিনি বলেন, বিধিনিষেধের আওতাভুক্ত যানবাহন পারাপারে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌপথে মাত্র ছয়টি ফেরি চালু রাখা হয়েছে। জরুরি পরিষেবায় নিয়োজিত যানবাহন পারাপারের সময় যাত্রীরা ফেরিতে ওঠে পড়েন। চেষ্টা করেও তাদের ফেরি থেকে নামানো যাচ্ছে না।

অন্যদিকে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় চলমান কঠোর লকডাউন আরও বাড়াতে চেয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশিদ আলম জানিয়েছে, তারা চান লকডাউন ‘কন্টিনিউ’ হোক। যদিও এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। তিনি বলেন, চলমান করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় আমাদের সুপারিশ এটা কনটিনিউ করার। কেবল অতি জরুরি সেবা ছাড়া যেভাবেই হোক সবকিছু সীমিত রাখতে হবে। এগুলো মনিটর করতে হবে। সব খুলে দিলে করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাবে, অবশ্যই বেড়ে যাবে।

গত ২৫ জুলাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় কনভেনশন সেন্টারে ফিল্ড হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে জাহিদ মালেক বলেন, যেভাবে রোগী বাড়ছে, হাসপাতালে বেড সংকট দেখা দিতে পারে। ইতোমধ্যে ৮০ শতাংশ বেড রোগীতে ভর্তি হয়ে গেছে। দেশে ঈদুল আজহার ছুটিতে গ্রামে যাওয়া আসার কারণে নভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) সংক্রমণ বেড়েছে পাঁচ থেকে ছয় গুণ। এছাড়া শহরের হাসপাতালে ভর্তি করোনা রোগীর ৭৫ শতাংশই গ্রাম থেকে আসা।

‘দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ আবারও বাড়তে শুরু করেছে। যেভাবে রোগী বাড়ছে তাতে হাসপাতালের বেড সংকট দেখা দিতে পারে। ইতোমধ্যে ৮০ শতাংশ বেড রোগীতে ভর্তি হয়ে গেছে, বলেন তিনি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, ঈদের সময়ের শিথিল লকডাউনের প্রভাব দেখা যাবে আরও দুই সপ্তাহ পর। এখন যে সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি এবং মৃত্যু সংখ্যা দেখা যাচ্ছে সেটা আগের শিথিল লকডাউনের প্রভাব। সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বগতির জন্য মানুষের স্বাস্থ্যবিধি না মানার সঙ্গে সঙ্গে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টকেও দায়ী করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

কেবল বাংলাদেশ নয়, বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসের ঊর্ধ্বগতির জন্য প্রধানতম কারণ হিসেবে মনে করা হচ্ছে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলেছে, গত বছরের শেষ দিকে যুক্তরাজ্যে প্রথম শনাক্ত হয় করোনার আলফা ধরন। এই ধরনকে অতি সংক্রামক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ভারতে করোনার ডেলটা ধরন শনাক্তের পর তা দ্রুত দেশটিতে ছড়িয়ে পড়ে।

ব্রিটেনে করোনাভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স উদ্যোগের প্রধান মাইক্রোবায়োলজিস্ট শ্যারক পিকক বলেন, এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ডেল্টা। এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দ্রুততম ও সবল ভ্যারিয়েন্ট। চীনের একটি গবেষণায় উঠে এসেছে, ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত ব্যক্তির নাকে করোনার মূল ভ্যারিয়েন্টের চেয়ে ১ হাজার গুণ বেশি ভাইরাস থাকে।

দ্রুত সংক্রামন এই ভ্যারিয়েন্ট সক্রিয় থাকাকালে লকডাউন শিথিল হওয়ায় আগস্ট মাস পর্যন্ত অবস্থা আরও খারাপ হবে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কঠোর লকডাউন যদি সঠিকভাবে পালন হয়, তাহলে হয়তো একটা ভালো সুফল আগস্টের শেষের দিকে পাবো।

বর্তমান পরিস্থিতি বর্ণনা করে তিনি বলেন, হাসপাতালগুলোর একটা ক্যাপাসিটি রয়েছে, এত রোগী যদি সংক্রমিত হতে থাকে তাহলে সে ক্যাপাসিটি শেষ হয়ে যাবে। হাসপাতালের সক্ষমতা রয়েছে ১৫ হাজার বেডের মতো, কিন্তু আর কত বাড়ানো যাবে, কিন্তু ১৫ হাজারের বেশি রোগী হতে বেশি সময় লাগবে না। যে হারে সংক্রমণ চলছে।

দেশে রোগ এবং রোগের বিস্তার নিয়ে গবেষণা করে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। প্রতিষ্ঠানটির উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেনের আশংকা, আগস্ট মাসের মাঝামাঝি নাগাদ পরিস্থিতি ভয়ংকর হবে।

এখন যে ‘খারাপ পরিস্থিতিটা’ হচ্ছে তা দুই সপ্তাহ আগের পরিস্থিতি আর মৃত্যু যেটা হচ্ছে সেটা তিন সপ্তাহ আগের পরিস্থিতি উল্লেখ করে মহামারি বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ঈদের আগে যে এক সপ্তাহের কিছু বেশি সময় লকডাউন শিথিল ছিল তার প্রভাব দেখা যাবে আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে।

তিনি বলেন, সংক্রমণ ও শনাক্তে এখন যে প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তার কারণ জুলাইয়ের শুরুর দিকে লকডাউনের পরিস্থিতির সময় আমরা খুব একটা উন্নতি করতে পারিনি। আর শিথিল লকডাউনের দুই সপ্তাহ পূর্ণ হবে আগামী সপ্তাহে। তার প্রভাব দেখা যাবে আগস্টের প্রথম নাগাদ, তারও এক সপ্তাহ পর দেখা যাবে মৃত্যু পরিস্থিতি। তারপর হয়তো কমতে পারে, যদি কঠোর বিধিনিষেধ গ্রামাঞ্চলে কার্যকর করা যায়, তাহলে হয়তো দুই থেকে তিন সপ্তাহ নাগাদ পরিস্থিতির উন্নতি হতেও পারে, বলেন তিনি।

‘মার্চে সংক্রমণ বেড়েছে, জুনে পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে, জুলাইয়ে কঠিন হয়েছে আর আগস্টে আরও জটিল, আরও গুরুতর পরিস্থিতি হতে পারে বলেও আশঙ্কা এই বিশেষজ্ঞের। তার মতে, হাসপাতালে এখনই জায়গা নেই, একইসঙ্গে হাসপাতালের সক্ষমতাতে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যন্ত্রপাতি বাড়ালেও বিশেষজ্ঞ পাওয়া যাচ্ছে না।

এই অবস্থাতে স্বেচ্ছাসেবকদের স্বাস্থ্যসেবার প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, মেডিক্যাল শিক্ষার্থী-নার্সিং শিক্ষার্থী-মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টদের ভলান্টিয়ার করা যায়। তারা জনস্বাস্থ্যবিদ, বিশেষজ্ঞ অ্যানিস্থেসিওলজিস্টদের পরামর্শ মেনে কাজ করবেন। তাদের যদি কাজে লাগানো না হয়, তাহলে সামাল দেওয়া যাবে না। এগুলো না করা গেলে আত্মরক্ষাও হবে না।

‘যে সময়ের লকডাউনই ধরি না কেন, লকডাউনতো হয় নাই’ মন্তব্য করে স্বাস্থ্য অধিদফতরের গঠিত পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজারি কমিটির সদস্য আবু জামিল ফয়সাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এর প্রভাব দেখতেই পাচ্ছি। সংক্রমণ বাড়ছে-মৃত্যুও হচ্ছেই।

তিনি বলেন, এটা যে কোনটার প্রভাব কোনটা-সেটার খোঁজ করার দরকার নাই। গত ২৪ ঘণ্টায় ( ২৯ জুলাই থেকে ৩০ জুলাই) দৈনিক শনাক্তের হার ৩০ দশমিক ৭৭ শতাংশ। সংক্রমণ এবং সংক্রমণের উচ্চহার অব্যাহত রয়েছে।

মানুষকে ঈদের ভেতরে ছেড়ে দেওয়ার খেসারত দিতে হবে সামনে মন্তব্য করে আবু জামিল ফয়সাল বলেন, আর এটা যে কতদিন পর্যন্ত দিতে হবে কেউ জানে না।

সূত্র:বাংলাট্রিবিউন

ঢাকা বিভাগ

আপনার মতামত লিখুন :