একজন কোহিনুর বেগমের জীবনের গল্প

473

 

যশোরের অভয়নগরে কোহিনুরের খেসারি চাষে সাফল্য

সুনীল দাস, নওয়াপাড়া থেকে ॥ দিন মজুরের স্ত্রী কোহিনুর (৩৫) ডাল চাষ করে ভাগ্য বদলে ফেলেছেন। তিনি বাগেরহাট জেলার কচুয়া উপজেলার চরসোনাপুর গ্রামের দিনমজুর আবজাল শেখের স্ত্রী। কোহিনুর দম্পতির ১ মেয়ে ও ১ ছেলে নিয়ে সংসার। জায়গা জমি কম থাকার কারণে খুব কষ্টে চলতো কোহিনুর বেগমের সংসার। দারিদ্রের কারণে ছেলে-মেয়েদের ঠিকমতো লেখাপড়া করাতে পারছিলেন না।
অভাবের সংসারে সংগ্রাম করেই কোহিনুর বেগমকে সংসারের হাল ধরতে হয়েছে। এদিকে বিগত কয়েক বছর জলবায়ু পরিবর্তন জনিত সমস্যার কারণে জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা, অসময়ে খরা-বন্যা-বৃষ্টিপাতের ফলে জমিতে আমন ধান ছাড়া অন্য কোন ফসল ফলানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে আমন ধান উঠার পরে জমি পতিত থাকে। জলবায়ু পরিবর্তন জনিত অভিঘাতে কোহিনুর বেগমের সংসারে দরিদ্রতা প্রকট আকার ধারণ করে। কোহিনুর বেগম নিজের সামান্য জমি চাষাবাদ করতো পাশাপাশি তার স্বামী অন্যের জমিতে কৃষি শ্রমিক হিসেবে কাজ করে কোন মতে সংসার চালাতে থাকেন। অনেকদিন অর্ধাহারে-অনাহারে কাটাতে হয় তাদের। এমন সময় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার আর্থিক সহযোগিতায় কচুয়া উপজেলায় পতিত জমিতে ডাল চাষের প্রকল্প শুরু করে।কোহিনুর বেগমকে প্রকল্পের উপকারভোগী নির্বাচন করা হয়্। প্রকল্পের আওতায় কোহিনুর বেগম কে পতিতজমিতে আধুনিকজাতের খেসারী ডাল চাষের উপর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।
প্রশিক্ষণে খেসারী ডালের উন্নতজাত ও আধুনিক চাষাবাদের বিভিন্ন কলাকৌশল যেমন, জমি প্রস্তুত, জাতনির্বাচন, বীজসংগ্রহ ও শোধন, ফসলের পরিচর্যা ও বালাই দমন, সার প্রয়োগ বিশেষ করে জৈব সার তৈরি ও ব্যবহার, ফসল সংগ্রহ, মাড়াই ও সংরক্ষণ, বীজ সংগ্রহ প্রভৃতি বিষয় সম্পর্কে ধারণা প্রদান করা হয়। প্রশিক্ষণ শেষে কোহিনুর বেগমকে উন্নত খেসারী ডালের বীজ (বারি খেসারী-৩) ও সার বিনামূল্যে প্রদান করা হয়। বিভা-র মাঠকর্মী ও স্থানীয় উপ-সহকারী কৃষিকর্মকর্তার সহযোগীতায় কোহিনুর বেগম নিজের ১ বিঘা জমি ও অন্যদের কাছ থেকে ২ বিঘা লিজি নিয়ে ৩ বিঘা জমিতে বারি খেসারি-৩ জাতের ডাল চাষ করেন। বিলে আমনধান কাটার ১ মাস পূর্বে জমিতে রস থাকা অবস্থায় কোহিনুর বেগম বীজ ছিটিয়ে বপন করেন। ফলে তার জমি চাষে তেমন কোন খরচ হয়নি। কোহিনুর বেগম জমিতে বিঘাপ্রতি ৫ কেজি হারে খেসারী ডালের বীজ, ২ কেজি হারে ইউরিয়া ও ৫ কেজি হারে টিএসপি প্রয়োগ করেন।
এবছর কোহিনুর বেগমকে ডালচাষের জন্য সেচ প্রদান করার দরকার হয়নি। রোগ ও পোকা মাকড়ের আক্রমনও কম ছিল। সে কারণে ঔষধ খরচ খুব কম হয়েছে। বীজ, সার, কীটনাশক ও শ্রমিক বাবদ সকল খরচ মিলিয়ে কোহিনুর বেগমের খেসারী চাষ করতে প্রতিবিঘায় খরচ হয়েছে ৫,৫০০ টাকা, বিঘা প্রতিফলন হয়েছে ৪০০ কেজি। মোট ফলন হয়েছে ১২০০ কেজি। ৪৫০ কেজি উন্নত মানের খেসাড়ি বীজ হিসেবে গ্রামীন বীজ ভান্ডারে সংরক্ষণ করেছে। যার আনুমানিক বাজার মূল্য ৩৩,৭৫০ টাকা। ৮০ কেজি খেসারি সারাবছর খাবার জন্য রেখেছে এবং ৬৭০ কেজি ৪০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। যার মূল্য হয়েছে ৩০,০০০ টাকা। কোহিনুর বেগমের ৩ বিঘা ১৬,৫০০ টাকা। ২ বিঘা জমির লিজ বাবদ জমির মালিককে দিতে হয়েছে ২১,০০০ টাকা। ডালের ভুষি ও খড় বিক্রি করে আয় হয়েছে ৪,৫০০টাকা। অতএব কোহিনুর বেগমের নীট লাভ হয়েছে ৩০,৭৫০ টাকা । এত কম সময়ে এত বেশি লাভ এরআগে কোনদিন কোন ফসল চাষ করে কোহিনুর বেগম পাননি। কোহিনুর বেগমের সংসারে এখন সুখের হাসি। কোহিনুর বেগম তার লাভের টাকা থেকে কিছু টাকা দিয়ে বসত ঘর মেরামত করেছেন এবং বাকি টাকা সংসারের কাজে ব্যয় করেছে। কোহিনুর বেগম আগামী বছর আরো বেশি পরিমাণ জমিতে খেসারী লাগানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। তাকে স্থানীয় কৃষি অফিস ও বিভা উন্নত বীজ (বারী-৩), প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ ও পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করবে। ডালচাষে কোহিনুর বেগমের সাফল্যে গ্রামের অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করেছে।