মানুষ-এআই বিতর্ক, ফলাফল ড্র

272

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবস্থার সঙ্গে হলো মানুষের প্রথম বিতর্ক। আর সরাসরি এই বিতর্কের ফলাফলে ১-১ ড্র নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে উভয়পক্ষকে।মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইবিএম-এর স্যান ফ্রানসিসকো কার্যালয়ে একটি মঞ্চে এই বিতর্কের আয়োজন করা হয়। প্রজেক্ট ডিবেটার নামের এআই সিস্টেমের বিপক্ষে বিতর্কে অংশ নেন নোয়া ওভাডিয়া এবং ড্যান জাফরির নামের দুইজন। ছয় ফুট লম্বা কালো একটি প্যানেলে আনা হয় এআই সিস্টেমটি, এর উপরে ছিল নীল রঙের একটি অ্যানিমেটেড ‘মুখ’। দুই মানব বিতার্কিক চিরাচরিত বিতর্কের মতো একটি পোডিয়াম-এর পেছনে দাঁড়ান।

অনেক ক্ষেত্রে এআই সিস্টেমটি জবাব দিতে আটকে যায়। তারপরও নজিরবিহীন এই আয়োজনের মাধ্যমে কম্পিউটার কীভাবে মানুষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার এলোমেলো ও কাঠামোহীন জগতের সঙ্গে লড়াই করে তার একটি ঝলক দেখা গিয়েছে, এমনটাই বলা হয়েছে ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে।

দুটি সংক্ষিপ্ত বিতর্কের প্রতিটিতে অংশগ্রহণকারীদেরকে সূচনা বক্তব্য তৈরি করতে চার মিনিট করে সময় দেওয়া হয়। তারপর যুক্তিখণ্ডনের জন্য চার মিনিট আর সারাংশ বলার জন্য দু মিনিট সময় দেওয়া হয়েছে। বিতর্ক প্রতিযোগিতায় শুরুর বিষয় ছিল “মহাকাশ গবেষণায় আমাদের ভর্তুকি দেওয়া প্রয়োজন”, পরের পর্বের বিষয় ছিল “আমাদের টেলিমেডিসিন-এর ব্যবহার বাড়ানো উচিৎ”।

দুই পর্বের ক্ষেত্রেই বক্তব্য প্রদানের জন্য দর্শকরা প্রজেক্ট ডিবেটার-কে বাজে বলেছেন কিন্তু বেশি তথ্য দেওয়ার দিক থেকে একে এগিয়ে রেখেছেন তারা। আর দ্বিতীয় পর্বে এটি তার বিপক্ষের থাকা মানব বিতার্কিক জাফরির-এর চেয়ে বেশি ভালো প্ররোচনা করেছে (দর্শকদের অবস্থান পরিবর্তনের দিক থেকে)।

এই এআই সিস্টেম ছিল বড় ডেটা সেট প্রক্রিয়াজাত করতে আইবিএম-এর সক্ষমতা প্রদর্শনের উপায়। এই ডেটা সেটগুলোতে কয়েক ডজন বিষয়ে লাখ লাখ সংবাদ প্রতিবেদন রয়েছে।

আত্মবিশ্বাসী নারীকণ্ঠে কথা বলা এআই সিস্টেমটির ভাষা আর যুক্তি উপস্থাপনে ত্রুটি দেখা গিয়েছে, ছিল স্পষ্টতার অভাবও। যেমন মহাকাশবিষয়ক বিতর্ক পর্বে অর্থনীতির জন্য যে মহাকাশ গবেষণা উপকারী তা কয়েকবার কিছুটা ভিন্নার্থক শব্দ ব্যবহার করে বলেছে সিস্টেমটি। এমনকি কিছু কিছু সময়ের বাক্যের শেষাংশ ও তার আগের অংশের মধ্যে মিল ছিল না। কিছু সময়ে এটি এমনভাবে উদ্ধৃতি তুলে ধরেছে যে তা একেবারেই স্বাভাবিক মনে হয়নি।

এক জায়গায় এআই সিস্টেমটি নভোচারী স্কট কেলির উদ্ধৃতি তুলে ধরে। এ সময় “ভয়েসওভার” কথাটি উল্লেখ করে সে, যার মানে হচ্ছে ওই অংশটুকু একটি ভিডিও থেকে নেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে কোনো মুখ বা হাতের কোনো অঙ্গভঙ্গি না থাকায় (যেহেতু হাত নেই) দর্শকদের জন্য বুঝে উঠা কঠিন হয়েছে।

প্রজেক্ট ডিবেটার-এর সক্ষমতাগুলো বানাতে প্রতিষ্ঠানটিকে ছয় বছর ব্যয় করতে হয়েছে। এর মধ্যে ডেটা থেকে বক্তব্য তৈরি ও তা উপস্থাপন, কোনো বক্তব্যের মূল অংশ শনাক্তকরণ, মূল যুক্তি তৈরি রয়েছে। আইবিএম-এর সুপারকম্পিউটার ওয়াটসন-এর সক্ষমতার উপর নির্ভর করে এই সিস্টেমের সক্ষমতা বাড়ে।

এর আগে মানুষের বিপক্ষে যন্ত্রকে মুখোমুখি হওয়ার আরও কিছু নজির মেলে। আইবিএম-এর ডিপ ব্লু প্রোগ্রাম-এ দাবায় যন্ত্রের কাছে হেরে যান দাবা চ্যাম্পিয়ন গ্যারি কাসপারভ। গুগলের এআই প্রোগ্রাম আলফাগো কৌশলভিত্তিক বোর্ড গেইম ‘গো’-তে বিশ্বসেরা খেলোয়াড়দের হারিয়েছে। এছাড়াও, লিবরাটাস নামের এক প্রোগ্রাম টেক্সাস হোল্ড’এম-এ বিশ্বসেরা চার পোকার খেলোয়াড়কে হারিয়ে দেয়।

ভাষা আর যুক্তি ব্যবহার করে বিতর্ক করা গেইমের চেয়ে আরও জটিল কাজ।

আইবিএম রিসার্চ-এর পরিচালক আরভিন্দ কৃষ্ণা বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারে বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে যে, এটি মানুষকে বুঝতে পারবে।” হয়তো এটি করপোরেট সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এআই মানুষকে সহায়তা করতে পারবে, যেখানে অনেক ধরনের সাংঘর্ষিক ধারণা থাকে। এআই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আবেগ বাদ দিয়ে আলাপচারিতা, প্রমাণাদি আর অন্যান্য যুক্তি কাজে লাগিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।

“এর মাধ্যমে প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাত্রা বাড়বে”- এমনটাই মন্তব্য ইউনিভার্স অফ ডান্ডি-এর সেন্টার ফর আরগুমেন্ট টেকনোলজি’র অধ্যাপক ক্রিস রিড-এর। তিনি বিতর্কে উপস্থিত ছিলেন। তার মতে, এই ব্যবস্থা সন্ত্রাসবিরোধী গোয়েন্দা বিশ্লেষণায় ব্যবহার করা যেতে পারে।