মজুরি বৃদ্ধির বিনিময়ে প্রণোদনার আবদার গার্মেন্ট মালিকদের

315

তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি প্রস্তাবনার চেয়ে বেশি হলে সক্ষমতা হারানোর যুক্তি দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে প্রণোদনার আবদার জানাতে নেতাদের পরামর্শ দিয়েছেন কারখানা মালিকরা।

রোববার কারওয়ান বাজারে বিজিএমইএ ভবনে এই খাতের দুই শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর যৌথ সাধারণ সভা থেকে এমন প্রস্তাবনা দেন বেশ কয়েকজন মালিক।

সভায় মালিকদের সবাই শ্রমিক সংগঠনগুলোর ১৬ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির প্রস্তাবের তীব্র সমালোচনা করেন।

ড্রেসআপ লিমিটেডের এমডি গোলাম মোস্তফা বলেন, “সামনে জাতীয় নির্বাচন। একদিকে ৪০ লাখ ভোটার অন্যদিকে মালিক পক্ষ। সেই ক্ষেত্রে বেতন বৃদ্ধি নিয়ে হয়তো মালিকদেরকেই বলির পাঠা হতে হবে। তাই বেতন বৃদ্ধির এই উদ্যোগকে দুই মাস পিছিয়ে দিতে পারলে ভালো হতো।

নতুন বেতন কাঠামোয় মজুরি ৬ হাজার তিনশ টাকার বেশি বাড়ানো হলে মধ্যম সারির কারখানাগুলো অচল হয়ে যাবে যুক্তি দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়ে বিভিন্ন প্রণোদনা আদায় করার দাবি জানান তিনি।

নতুন বেতন কাঠামো ঠিক করতে মজুরি বোর্ডে মালিক পক্ষের প্রতিনিধি হিসাবে আছেন বিজিএমইএর সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান। সাধারণ সভায় মজুরি নিয়ে দর কষাকষি করতে তাকে পূর্ণ সমর্থন দেন মালিকরা।

গত ১৬ জুলাই মজুরি বোর্ডের তৃতীয় সভায় নিম্নতম মজুরি ছয় হাজার ৩৬০ টাকা প্রস্তাব করেন সিদ্দিকুর রহমান। বোর্ডে শ্রমিক পক্ষের প্রতিনিধি জাতীয় শ্রমিক লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক শামসুন্নাহার ভূঁইয়া ন্যূনতম মজুরি বাড়িয়ে ১২ হাজার ২০ টাকা করার প্রস্তাব দেন।

তবে বামপন্থি শ্রমিক সংগঠনগুলো ন্যূনতম মজুরি ১৬ হাজার টাকা করার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে রাজপথে আন্দোলন করে আসছে। দাবি মানা না হলে কঠোর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলেও হুমকি দিচ্ছে তারা।

সভায় নিউএইজ গ্রুপের ভাইস প্রেসিডেন্ট আসিফ ইব্রাহীম বলেন, বিজিএমইএর সভাপতি ন্যূনতম মজুরি ৬ হাজার ৩৬০ টাকা করার যে প্রস্তাবনা দিয়েছেন তা খুবই যুক্তিসঙ্গত। আলাপ আলোচনার পর বেতন এর চেয়ে বেশি বাড়ানো হলে তা সবার পক্ষে বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। ফলে পুরো সেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যদি এর চেয়ে বেশি বাড়াতে হয় তাহলে সরকারের কাছ থেকে সমপরিমান প্রণোদনা আদায় করতে হবে।

বিকেএমইএর সভাপতি সেলিম ওসমান বলেন, “পোশাক খাতের সর্বনিম্ন মজুরি নিয়ে বাইরের লোকদের কথা মাথায় আনা যাবে না। বাইরের যারা এসব বিষয়ে মত দিচ্ছেন তারা পোশাক খাতের মুনাফা কমে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিচ্ছেন না। বিভিন্ন কারণে আমাদেরকে মালের দাম কমাতে হয়েছে। তবুও নতুন মজুরি কাঠামোর বিষয়ে সরকারকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।”

বিজিএমইএর সহ-সভাপতি এসএম মান্নান কচি বলেন, কিছু রাজনীতিক ও এনজিও মিলে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি নিয়ে লাগামহীন কথাবার্তা বলছেন। কেউ বলছেন ১৮ হাজার কেউ বলছেন ২০ হাজার টাকা করতে হবে। বেতন কত হবে তা মজুরি বোর্ড পর্যালোচনা করে ঠিক করবে। এ বিষয়ে অনভিজ্ঞ কারও মতামত দেওয়া উচিত নয়।

সংগঠনটির জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, বেতন কত হওয়া উচিত তা ঠিক করার জন্য মজুরি বোর্ড রয়েছে। নতুন বেতন কাঠামো ঠিক করার আগে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, ব্যবসা পরিচালনায় খরচ বেড়ে যাওয়া, আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের দাম কমে যাওয়ার বিষয়গুলো বিবেচনায় আনতে হবে।

সিদ্দিকুর রহমান বলেন, “আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলোতে শ্রমিকদের বেতন কিছুটা বেশি আছে। তবে ওইসব দেশের শ্রমিকদের দক্ষতা ও তাদের উৎপাদন সক্ষমতা আমাদের চেয়ে বেশি। আমাদের সেক্টরের সক্ষমতা ও প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে বাস্তবতার নিরিখে বেতন ধরতে হবে।

“আমরা বাইরের লোকদের কথায় গুরুত্ব দিতে চাই না। এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না যা বাস্তবায়ন অসম্ভব। যাদের এই সেক্টরের বিষয়ে অভিজ্ঞতা নেই তারা যেন এটা নিয়ে কথা না বলে।

বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আতিকুল ইসলাম বলেন, ব্যবসা পরিচালনায় নানামুখী চাপে মালিকদের রক্তক্ষরণ হচ্ছে। মালিকরা উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। বিজিএমইএর সভাপতি সম্প্রতি হার্টের ব্লক নিয়ে সিঙ্গাপুর থেকে চিকিৎসা করিয়ে এসেছেন। পোশাক খাতের মালিকদের বর্তমান পরিস্থিতির এটি একটি চিত্র।

সাবেক সভাপতি টিপু মুনসী বলেন, নির্বাচনের আগে বেতন বৃদ্ধির এই উদ্যোগ সরকারের জন্য একটা চাপ। তাই বার বার বেতন বাড়ানোর ঝামেলায় না গিয়ে বেতন বৃদ্ধির একটি স্থায়ী নীতিমালা ঠিক করে দেওয়া প্রয়োজন।

শ্রমিক নেতাদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, টকশোতে সুশীল সমাজ বেতন বৃদ্ধি নিয়ে এমনভাবে কথা বলেন- যেন তারাই সব বুঝেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্য নিয়ে তারা কথা বলেন না।

ন্যূনতম মজুরি নিয়ে মজুরি বোর্ডে দর কষাকষির বিষয়টি বিজিএমএইর বর্তমান সভাপতি সিদ্দিকুর রহমানের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত বলে মত দেন তিনি। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে আসা অধিকাংশ মালিকই সিদ্দিকুর রহমানের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা জ্ঞাপন করেন।

এফবিসিসিআই সভাপতি শফিউল ইসলাম বলেন, পোশাক মালিকরা নির্যাতনের মধ্যে রয়েছে। বর্তমান সময়টা মোটেও মালিকদের অনুকূলে নয়। কারণ সামনে রয়েছে জাতীয় নির্বাচন।

“বেতন বৃদ্ধি নিয়ে মালিকদের চেয়ে যারা বেশি শ্রমিকপ্রীতি দেখায় তারা মূলত এই সেক্টরে উস্কানি দেওয়ার কাজটি করছে।”

কোনো পরিস্থিতিতে মালিকদের প্রস্তাবিত ন্যূনতম মজুরির চেয়ে আরও বাড়াতে হলে প্রয়োজনে অন্যদিক থেকে প্রণোদনা আদায় করতে হবে বলে বর্তমান নেতৃত্বকে পরামর্শ দেন এফবিসিসিআই সভাপতি।

“একদিকে ছাড় দিলে আরেক দিকে আদায় করে নিতে হবে। যদি বেতন বাড়াতে হয় তাহলে টেক্স কমাতে হবে।“

বিকেএমইএর সহ সভাপতি ফজলে শামীম এহসান, স্টাইলিস গার্মেন্টের চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন চৌধুরী, আরেক গার্মেন্টেস মালিক সেলিম খানসহ বেশ কয়েকজন মালিক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন।