বাসক পাতা বদলে দিচ্ছে ভাগ্যের চাকা

835


সাতক্ষীরা সংবাদদাতা ॥ বাড়িতে বাড়িতে ঘেরা বেড়া দেয়ার কাজে বেশ জনপ্রিয় বাসক গাছ। গ্রাম জুড়ে এর ছড়াছড়ি। এক ধরণের দুর্গন্ধের জন্য এর পাতায় গবাদি পশু মুখ দেয় না। ফলে সহজেই জমি ও বাড়ি ঘেরার কাজ চলে। অথচ এই বাসক পাতা যে ঔষধি গুনসম্পন্ন তা আগে জানা ছিল না। গ্রামাঞ্চলে বাসক পাতার কদর রয়েছে বেশ। সর্দি কাশি সারাতে সবুজ বাসক পাতা রস করে খেলে উপকার পাওয়া যায় এ বিশ্বাস রয়েছে এখনও। কিন্তু এই পাতা যে মানুষের অর্থনৈতিক চাকা ঘুরিয়ে দিতে পারে তা ছিল ধারণার বাইরে।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ফিংড়ি এলাকার আমিরুন বেগম, হাফিজুর রহমান জানান, আগে মনে করতাম আবর্জনা। এখন তা সংগ্রহ করে বিক্রি করছি। প্রতি কেজি কাঁচা পাতা কিনি ৫ টাকা কেজি দরে। শুকিয়ে বিক্রি করি ৩৫ টাকা কেজি দরে। বাসক পাতা এখন ওষুধ কোস্পানী গুলো কিনে নিয়ে যাচ্ছে। এর ঔষধিগুণ এতো বেশি যে এই পাতা দিয়ে তৈরি হচ্ছে কাশির সিরাপ। বাসক পাতার নির্যাস, রস বা সিরাপ শেষ্মা তরল করে নির্গমে সুবিধা করে বলে সর্দি, কাশি এবং শ্বাসনালীর প্রদাহ নিরাময়ে বেশ উপকারী।
সাতক্ষীরা অঞ্চলে বাসক উদ্ভিদ জন্মায় প্রচুর। ঘেরা বেড়ায় ব্যবহার করা এর পাতা ছিড়লে গাছ মরে যায় না। আবারও নতুন নতুন পাতা গজায়। সারাবছর চলে নতুন পাতা গজানো ডাল কেটে মাটিতে পুতে দিলে হয়ে ওঠে নতুন গাছ। আর্দ্র ও সমতল ভূমিতে এই উদ্ভিদ জন্মায়। বিকট গন্ধের কারণে এতে ছত্রাক জন্মায় না। এমনকি পোকা মাকড়ও ধরে না।
গৃহিনী বিউটি বেগম জানান, আমরা কাঁচা পাতা রস করে খাই। আগে গুরুত্ব দিতাম না। এখন সংগ্রহ করে বিক্রি করি। বাড়ির বেড়ার গায়ে থাকে। এখন তা তুলে এনে শুকিয়ে বিক্রি করছি। কাশি সারতে রস করে খেতাম। সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ফিংড়ি ইউনিয়নের কাঁচাপাকা রাস্তার ৬ কিলোমিটার এলাকা বরাবর রয়েছে বিপুল পরিমাণ বাসক উদ্ভিদ। এখানকার কমপক্ষে ১০ হাজার বাসক গাছ ব্যবহৃত হচ্ছে জমির চারধারে কিংবা বাড়ির ঘেরা বেড়ায়। প্রতিবছর একশ’ টন সবুজ পাতা সংগ্রহ হচ্ছে এখানে। এ থেকে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ২৬ টন শুকনো পাতা। দেশের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে বাসক উদ্ভিদের চাষ শুরু হয়েছে। ভারতেও রয়েছে এর ব্যাপক চাষ।
পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রতিনিধি শামীম আলম জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প ব্লু গোল্ডের আওতায় ২৮৫ জন নারী এখানে বাসক পাতা সংগ্রহ করছেন। আর এই পাতা কিনে নিচ্ছে ওষুধ কোম্পানী গুলো। বাসক পাতা যেমন আনতে পারে অর্থনৈতিক বিপ্লব, তেমনি বিজ্ঞান সম্মত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই পাতা দেশের ওষুধ শিল্পে গুরুত্বপুর্ণ অবদান রাখতে পারছে।
স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড এর প্রতিনিধি আনোয়ারুল ইসলাম জানান, আমরা শুকনো বাসক পাতা কিনে নিচ্ছি। জার্মান প্রযুক্তির মাধ্যমে বিজ্ঞান সম্মত পদ্ধতিতে বাসক পাতা কাশির সিরাপ তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সাতক্ষীরার গ্রামে এরই মধ্যে বেশ সাড়া পড়ে গেছে বাসক পাতা নিয়ে। গ্রামবাসী নিজ নিজ বাড়ির চারপাশে বাসক গাছ লাগাচ্ছেন। গ্রামের দরিদ্র নারীরা প্রতিদিনই সংগ্রহ করছেন বাসক পাতা। পরিচ্ছন্নভাবে রোদে শুকিয়ে তা বিক্রি করছেন ওষুধ কোম্পানীর কাছে। এতে তারা অর্থনৈতিক সুবিধা লাভ করছেন।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ফিংড়ি ইউনিয়ন চেয়ারম্যান সামছুর রহমান, এ এলাকায় প্রচুর জন্মায় বাসক পাতা। বাণিজিক ভাবে শুরু হয়েছে বাসক গাছ চাষ। এই গাছ চাষ করে মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। এই গাছের পাতা বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকা কেজি দরে। ইতিমধ্যে ফিংড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় রাস্তার ও বাড়ির বেড়া তৈরিতে এই গাছ চাষ শুরু করছে। আর এই গাছের পাতা ক্রয় করছে বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানী। বাসক পাতার নির্যাস, রস বা সিরাপ শেষ্মা তরল করে নির্গমে সুবিধা করে বলে সর্দি, কাশি এবং শ্বাসনালীর প্রদাহ নিরাময়ে বেশ উপকারী। দিন দিন ব্যাপক ভাবে বাসক গাছ চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে ।
সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. নাসরিন আক্তার, বাসক এর বৈজ্ঞানিক নাম আঢাটোডা বাসিকা (অফযধঃড়ফধ ঠধংরপধ)।ঔষধিগুন সম্পন্ন। ভারতীয় উপমহাদেশের একটি উদ্ভিদ। গুনের কারণে বানিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে বাংলাদেশেও। বাসক উদ্ভিদের জন্ম ও বৃদ্ধিতে সাতক্ষীরার মাটি অনুকূল। বেশি বেশি করে বাসক গাছ লাগালে এর পাতা দেশের ওষুধ শিল্পে অবদান রাখা ছাড়াও গ্রামীন অর্থনীতির চাকা ঘুরিয়ে দিতে পারে।